করোনাকালেও এবার রাজশাহী অঞ্চলের আমে আসছে বৈদেশিক মুদ্রা। যদিও গত বছর আম রপ্তানি কমেছিল অনেক। করোনার কারণে তখন রাজশাহী থেকে কোনো আম রপ্তানি হয়নি। অবশ্য অন্যান্য জেলা থেকে রপ্তানি হয়েছিল ১০০ টন আম। তবে এবার আম উৎপাদনের মূল এলাকা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ করোনার হটস্পট হয়ে ওঠার পরও ইতোমধ্যে বিদেশে রপ্তানি হয়েছে ১৫০ টন আম। আশা করা হচ্ছে, এ বছর আরও ৬০০ টন আম রপ্তানি হবে।
কৃষকরা বলছেন, ইউরোপের বাজারে দেশের আমের চাহিদা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে গ্লোবাল গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসের বৈশ্বিক নীতিমালা অনুসরণ করে আম উৎপাদন করা গেলে শুধু আম থেকেই হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। রাজশাহীর বাঘা উপজেলা থেকে গত ১৭ জুন পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে ১৩ টন আম। এতে বাঘা উপজেলার আমচাষিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস। গত ২৮ মে ইংল্যান্ডে তিন টন ক্ষীরশাপাতি আমের প্রথম চালানটি যায় রাজশাহী থেকে। বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া থেকে ফুড অ্যান্ড ভেজিটেবল এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে এ আম ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। পরে ইংল্যান্ডসহ জার্মানি এবং ফ্রান্সেও ক্ষীরশাপাতি (হিমসাগর), আম্রপালি ও ফজলি আম পাঠানো হয়েছে।
কন্ট্র্রাক্ট ফার্মার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সফিকুল ইসলাম ছানা বলেন, এ দেশের আম রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে- এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে! চাষিদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে, দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে ২০ জন সফল আমচাষি
রয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে আম রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ বছর ৩৩৩ টন আম রপ্তানির টার্গেট দিয়েছিলাম। কিন্তু ঢাকায় যানজটের কারণে কিছুদিন যোগাযোগ ব্যাহত ছিল। এখন আবার অতিরিক্ত বৃষ্টি হওয়ায় আমের গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। তাই এ বছর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। তিনি জানান, ঢাকার শ্যামপুরে সেন্ট্রাল প্যাকিং হাউসে বিদেশে পাঠানোর জন্য আম প্যাকিং হয়। বাগান থেকে সেখানে আম পাঠাতে নানা সমস্যায় অনেক সময় চলে যায়। এলাকায় প্যাকিং হাউস হলে সহজেই আরও বেশি আম পাঠানো যেত।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, আম রপ্তানির জন্য বাঘা উপজেলার ২০ জন চাষিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সেরা কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাগানে উৎপাদিত ও ক্ষতিকর রাসায়নিকমুক্ত আম ঢাকায় বিএসটিআই ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এরপর বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল আওয়াল জানান, আমে পোকার আক্রমণ রোধে এলাকার আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা 'ফ্রুট ব্যাগিং' পদ্ধতির মাধ্যমে আম চাষ শুরু করেছেন। এতে খরচ বাড়লেও একদিকে আমের গুণগত মান বাড়ছে অন্যদিকে কীটনাশকমুক্ত আম দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের কাছে যাচ্ছে।
তিনি জানান, রাজশাহী জেলার ১৭ হাজার ৬৮৬ হেক্টর জমির আমবাগানের মধ্যে বাঘা ও চারঘাট উপজেলাতেই রয়েছে ১২ হাজার হেক্টর জমিতে বাগান। এখানকার চাষিরা বৈশ্বিক নীতিমালা অনুসরণ করে আম উৎপাদন করছেন। এ কারণেই এই আম বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল আওয়াল জানান, ২০১৫ সালে রাজশাহী থেকে ১৭ টন, ২০১৬ সালে ২৪ টন, ২০১৭ সালে ৩০ টন, ২০১৮ সালে ২৬ টন, ২০১৯ সালে ৩৬ দশমিক ৫ টন এবং চলতি বছর ১৭ জুন পর্যন্ত ১৩ টন আম রপ্তানি হয়েছে।
রাজশাহী অঞ্চলের আমের নতুন সম্ভাবনাময় এলাকা এখন নওগাঁ জেলা। এখানকার সাপাহার ও পোরশায় এখন হাজার হাজার একর জমিতে আমবাগানের সারি। এ জেলার ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে এবার আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে পৌনে চার লাখ টন।
সাপাহারের আমচাষি সোহেল রানা। ৫০ একর জমিতে আম চাষ করেছেন। এর মধ্যে ২৫ একরই আম্রপালি। অন্য জমিতে লাগিয়েছেন গৌড়মতি, বারি ৪ ও ব্যানানা ম্যাংগো। তিনি জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দীনের পরামর্শে তারা আম চাষ করছেন। তিনিই প্রথম চীন থেকে ফ্রুট ব্যাগ আনেন। রপ্তানিযোগ্য নিরাপদ আম উৎপাদনের পরামর্শ দেন। তার পরামর্শে সাপাহারে ৫০ লাখ আম ব্যাগিং করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘাসফড়িং নামের একটি এনজিও তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজ শিখিয়েছে।
সোহেল রানা জানান, গত ১৭ জুন ইংল্যান্ডে এক টন আম্রপালি পাঠিয়েছেন। রোববার যাচ্ছে এক হাজার ২৪০ কে.জি.। তিনি জানান, সব খরচ বাদে প্রতি কে.জি. আমের দাম পাচ্ছেন ৯০ টাকা। রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে এই আম। রপ্তানি আমে দেড় থেকে দুই গুণ বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে। ইউরোপের মার্কেটে বাংলাদেশি আমের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রাও আসছে। বিদেশে অন্যান্য ফল রপ্তানি করে বছরে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে, ভবিষ্যতে শুধু আম থেকেই তার চেয়ে বেশি আয় করা যাবে বলে আশা করেন তিনি।
নওগাঁর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামসুল ওয়াদুদ জানান, নওগাঁ থেকে ২০১৭ সালে দুই টন, ২০২০ সালে ১২ টন এবং চলতি বছর আড়াই টন আম বিদেশে গেছে। এ বছর আরও আম রপ্তানি হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের আমচাষি ইসমাইল খান শামীম জানান, বিভিন্ন রপ্তানিকারকের মাধ্যমে তিনি ২০ টন আম ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে পাঠিয়েছেন। সব খরচ বাদে ক্ষীরশাপাতি ও ল্যাংড়া আমের দাম পেয়েছেন কে. জি. প্রতি ৭৫ টাকা। ইতালিতে সরাসরি পাঁচ টন পাঠিয়েছেন তিনি। আগামী রোববার ইংল্যান্ডে এক টন ল্যাংড়া আম পাঠাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপপরিচালক নজরুল ইসলাম জানান, জেলায় ৩৪ হাজার ৭৩৮ হেক্টর জমিতে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৬০ হাজার টন। তিনি জানান, জেলায় প্রায় ১০ কোটি আম ব্যাগিং করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০০ টন আম বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতালি, সুইডেন, ইংল্যান্ড ও মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে এসব আম। তিনি আরও জানান, এক কে.জি. আম পাঠাতে কার্গো বিমানে ২৮০ টাকা খরচ হচ্ছে। মূল্য পাওয়া যাচ্ছে ৫০০ টাকার কাছাকাছি। সব খরচ বাদ দিয়েও লাভ হচ্ছে চাষিদের।
নজরুল ইসলাম বলেন, সবচেয়ে আনন্দের কথা এতে বৈদেশিক মুদ্রা আসার একটা পথ হয়েছে। ২০১৬ সালে ১০৪ টন, ২০১৭ সালে তিন টন, ২০১৮ সালে ৩৩ টন, ২০১৯ সালে ৬৫ দশমিক ৪৫ টন এবং গত বছর ২০২০ সালে ৬৫ দশমিক ৫ টন আম গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে। এ বছরও বেশ কিছু আম যাচ্ছে।
চাহিদা থাকলেও বাড়েনি রপ্তানি : বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দীন বলেন, আগে চাষিরা আম রপ্তানির কথা ভাবতেই পারতেন না। ২০১৫ সাল থেকে চাষিদের আম চাষে পরিবর্তন আনার চিন্তা করি। ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম চাষ শুরু করা হয়। সে বছরই ১৫৬ টন আম রপ্তানি হয়। এরপরের বছর ৬৬৫ টন, ২০১৭ সালে ২৩৪ টন, ২০১৮ সালে ২৩১ টন, ২০২০ সালে ১০০ টন এবং চলতি বছর ইতোমধ্যে ১৫০ টন চলে গেছে। এ বছর আরও অন্তত ৬০০ টন আম যাবে।
ড. শরফ উদ্দীন বলেন, রপ্তানি যে গতিতে শুরু হয়েছিল, তাতে এতদিন পর অন্তত ১০ হাজার টন আম রপ্তানি হতে পারত। কিন্তু তা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে চাষিদেরও কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে না। তাই চাষিরাও আগ্রহী হচ্ছেন না। কিন্তু সঠিক সময়ে পরিকল্পনা নিলে আরও বেশি আম রপ্তানি সম্ভব। এ জন্য চাষিদের সঙ্গে সরকার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও রপ্তানিকারককে একসঙ্গে সমন্বয় করে এগোতে হবে। তবেই রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হবে।

বিষয় : রাজশাহীর আম

মন্তব্য করুন