সমাজে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতার কারণে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাইরের চাপ বাড়ছে। এই চাপ মোকাবিলা করে সৎ সাহস ও নীতিনৈতিকতা বজায় রেখেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিকতা এবং শুদ্ধাচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

মঙ্গলবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত 'করোনাকালে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়' শীর্ষক মুক্ত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ। প্রধান আলোচক ছিলেন গবেষক ও গণমাধ্যম বিশ্নেষক অধ্যাপক আফসান চৌধুরী ও অধ্যাপক ড. গীতিআরা নাসরিন। মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের নির্বাহী পরিচালক তালাত মামুন, বৈশাখী টিভির প্ল্যানিং কনসালট্যান্ট জুলফিকার আলি মানিক, এমআরডিআইর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সহায়তা ডেস্কের প্রধান বদরুদ্দোজা বাবু এবং টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মঞ্জুর-ই-আলম।

অধ্যাপক আফসান চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যম আর সাংবাদিকতা এক নয়। পেশার প্রতি সাংবাদিকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সাংবাদিকরা এখন আর নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন না। কভিড বিষয়ে সাংবাদিকতায় কোনো কাঠামোগত বিশ্নেষণ হচ্ছে না।

ড. গীতিআরা নাসরিন বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সব সময়ই চ্যালেঞ্জিং। কভিডে অনেক সাংবাদিক মারা গেছেন, অসুস্থ হয়েছেন এবং চাকরিচ্যুত হয়েছেন। অসুস্থতা, মৃত্যু ও অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি এ সময়ে সাংবাদিকদের ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনাও বেড়েছে। এখন দর্শক-পাঠকরাও প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন করছেন।

চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের নির্বাহী পরিচালক তালাত মামুন বলেন, সাংবাদিকতায় সবসময়ই চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাংবাদিক সংগঠনগুলো সাংবাদিকদের জন্য কী করছে? নানা কারণে স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে পারছি না। এ ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার প্রয়োজন।

জুলফিকার আলী মানিক বলেন, সাংবাদিকতায় বাইরের চাপ আমাদের নতজানু করে ফেললেও নীতিনৈতিকতা অনুসরণ করেই সাংবাদিকদের তথ্য ও সংবাদ সংগ্রহ করতে হবে।

আলোচনায় সমাপনী বক্তব্যে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিবেশ নির্ভর করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল বিষয় হলো 'জিততেই হবে বা ক্ষমতায় থাকতেই হবে'! এ জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হবে, তাকে ধরাশায়ী করতে হবে। গণমাধ্যমে যারা কথা বলেন, যারা লেখেন, যারা সরকারের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করেন, তাদের সহায়ক ভূমিকা পালনের প্রয়াসকে সরকারের একাংশ শত্রুতা হিসেবে দেখে।

মুক্ত আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু, একাত্তর টেলিভিশনের বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ, গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের রোভিং এশিয়া এডিটর মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, যশোরের দৈনিক গ্রামের কাগজ সম্পাদক মোবিনুল ইসলাম মবিন, চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদীর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক, সিলেটের দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক মুকতাবিস উন নুরসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিকরা।

পুরস্কার পেলেন তিনজন: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) কভিড-১৯ রেসপন্স পুরস্কার পেয়েছেন তিন সাংবাদিক। তারা হলেন চ্যানেল একাত্তরের পারভেজ নাজির রেজা, সারাবাংলা ডটনেটের সৈকত ভৌমিক ও দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিনের আবু রায়হান তানিন। মঙ্গলবার আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে 'অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার ২০২০' ঘোষণা করে টিআইবি।