পি কে হালদারের অর্থ লোপাটের ঘটনায় আদালতের নির্দেশে গঠিত কমিটির কাছে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়মে নিজে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী। তিনি বলেছেন, তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা। দায়িত্ব পালনেও তার কোনো গাফিলতি ছিল না। সাবেক আরেক ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমানও বলেছেন, নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতির ক্ষেত্রে দায়ীদের চিহ্নিত করতে আদালতের নির্দেশে গঠিত 'ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি'র জিজ্ঞাসাবাদে তারা এমন উত্তর দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক এমডি প্রশান্ত কুমার হালদারের নানা জালিয়াতির মাধ্যমে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার বিষয়টি তদন্ত করছে দুদক। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অনেকে আদালতে জবানবন্দি দিচ্ছেন। এ বিষয়ে শুনানির এক পর্যায়ে একটি কমিটি গঠনের আদেশ দেন আদালত।

মঙ্গলবার কমিটির মুখোমুখি হন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর একেএম সাজেদুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি আলাদাভাবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। সবচেয়ে বেশি সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় সুর চৌধুরীকে। সকাল ১১টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত তার বক্তব্য শোনেন কমিটির সদস্যরা। বেলা ২টার দিকে বের হয়ে সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসার মুখে পড়েন তিনি। এ সময় তাকে বেশ বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। সাংবাদিকরা নানা প্রশ্ন করলেও তিনি বেশিরভাগ সময় চুপ ছিলেন। এক পর্যায়ে বলেন, 'আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ মিথ্যা। আমার যা বলার কমিটির কাছে বলেছি।' এ পর্যায়ে জানতে চাওয়া হয়, আদালতে আপনার বিরুদ্ধে যে ঘুষের অভিযোগ এসেছে, তা কি মিথ্যা? তিনি বলেন, 'অবশ্যই'। এর পর একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকারে উঠে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক চত্বর ছেড়ে যান।

কমিটিতে সাক্ষাৎ শেষে আরেক সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ নেই। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ দেখভালের দায়িত্বের কারণে তাকে ডাকা হয়েছিল। আর সাবেক নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত অবস্থায় এক পর্যায়ে তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দায়িত্বে থাকায় তাকে ডাকা হয়। সূত্র জানায়, কমিটির পক্ষ থেকে তিনজনের কাছেই আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের আজকের দুরবস্থা, অনেক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীরা অর্থ ফেরত না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। প্রত্যেকেই দাবি করেন- সঠিকভাবে তারা দায়িত্ব পালন করেছেন।

পি কে হালদারের অনিয়মের সহযোগী হিসেবে আটক ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক এমডি রাশেদুল হক গত ২ ফেব্রুয়ারি আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, পি কে হালদারের ক্ষমতার অন্যতম উৎস ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী। তাকে ঘুষ দিয়ে পি কে হালদার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম চাপা দিতেন। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক ও বর্তমানে নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলমকে প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা দেওয়া হতো। এ ছাড়া পরিদর্শন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। এর পর গত ৪ ফেব্রুয়ারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দায়িত্ব থেকে নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর আদালতের নির্দেশে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে। কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডির সঙ্গেও কথা বলেছে। শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের মাধ্যমে আদালতে রিপোর্ট দেওয়া হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রধান একেএম সাজেদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে কথা বলবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র। মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আদালতের নির্দেশে গঠিতি একটি কমিটি। এ বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার তার নেই।

এদিকে বুধবার এ কমিটিতে ডাকা হয়েছে সমস্যাগ্রস্ত বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) সাবেক চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান এমপি ও তার স্ত্রী উম্মে কুলসুম মান্নানকে। গত বছর ১৭ ডিসেম্বর আদালত থেকে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে তাদের বাদ দেওয়া হয়। বিআইএফসি থেকে বেনামে বিপুল অংকের অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।