সম্প্রতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকাশিত গবেষণা ও যুক্তিনির্ভর প্রবন্ধ সম্পর্কে বাংলাদেশের একাডেমিক অঙ্গনে তর্ক-বিতর্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বিশেষ করে ওই প্রবন্ধে কোনো ধরনের 'চৌর্যবৃত্তি'র আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে কিংবা হয়নি এ নিয়ে। এই বিতর্কে জাতীয় দৈনিক ও সামাজিক মাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত তুলে ধরা হচ্ছে। এই তর্ক-বিতর্কের অনেক বিষয়ের মধ্যে একটি বিষয় তুলে ধরতে চাই, বিশেষ করে তাদের জন্য যারা একাডেমিক অঙ্গনে নতুন কিংবা এখনও পা রাখেননি, অথবা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখনও প্রবন্ধ প্রকাশ করেননি। অক্সফোর্ড ডিকশনারির ভাষ্যমতে- চৌর্যবৃত্তি হলো অন্যের কাজ বা ধারণাকে তার অনুমতি বা কৃতজ্ঞতা ব্যতিরেকে নিজের কাজ বা ধারণা বলে প্রকাশ করা। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাদের একাডেমিক গাইডলাইনে চৌর্যবৃত্তি বলতে অন্যের কাজকে স্বীকৃতি না দিয়ে নিজের কাজ বলা বা নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ না করে ওই কাজ বা ধারণা বা বক্তব্যকে নিজের কাজ বা বক্তব্য বলে প্রকাশ করা। প্রশ্ন হলো সাম্প্রতিককালে সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও তথ্যগুলো কি উপরোক্ত পদ্ধতি মেনে লেখকের কাজ বা প্রবন্ধে চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে? নাকি বর্তমান বহুল প্রচলিত সফটওয়্যার 'টারনিটিন' যা কিনা বর্তমানে প্রকাশিত প্রবন্ধের লাইনের বা শব্দের সঙ্গে পূর্ববর্তী যেকোনো লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের লাইন বা শব্দের মিল খুঁজে বের করে এবং কত শতাংশ লেখা আগের প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মিল আছে তা-সহ বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে- এই তথ্যের ভিত্তিতে ওই প্রকাশিত প্রবন্ধে চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রকাশ করা হচ্ছে?

এখানে মনে রাখা উচিত, পাঠক যখন শোনেন বা জানেন ১৫% বা ২০% বা ২৫% মিল আছে বর্তমান প্রকাশিত প্রবন্ধের সঙ্গে আগের প্রকাশিত অন্য প্রবন্ধের, তখন তাদের মধ্যে এই বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয় যে, নিশ্চয়ই এই প্রবন্ধে চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে। এভাবে লেখকের ওপর এমনকি ওই লেখক যে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সেই প্রতিষ্ঠানের ওপরও পাঠকের নেতিবাচক ধারণার জন্ম হতে পারে। কিন্তু পাঠক বা শ্রোতারা বুঝতে পারে না প্রকাশিত গল্প বা প্রবন্ধের সঙ্গে নতুন গল্প বা প্রবন্ধের মিল থাকলেই তাকে চৌর্যবৃত্তি বলা যায় না, যদি না লেখক অন্য লেখকের কাজ বা ধ্যান-ধারণা বা যুক্তিকে সঠিকভাবে 'রেফারেন্স' বা কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে ওই কাজকে নিজের কাজ বলে অভিহিত করছেন। এর অর্থ হলো, লেখক যদি তার প্রবন্ধে অন্যের কাজের সঠিকভাবে রেফারেন্স প্রদান এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তাহলে ওই কাজের সঙ্গে পূর্ববর্তী লেখকের কাজের মিল থাকলেও একাডেমিক ক্ষেত্রে এটাকে চৌর্যবৃত্তি বলা যায় না।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, সঠিক রেফারেন্স এবং কৃতজ্ঞতা জানানোর পরও 'টারনিটিন'-এর কত শতাংশ মিলকে আমরা চৌর্যবৃত্তি হয়নি বলে গ্রহণ করব বা করব না? এক্ষেত্রে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্র-শিক্ষক এবং কর্মকর্তাদের জন্য তৈরি চৌর্যবৃত্তির গাইডলাইনের দিকে খেয়াল করলে আমরা দেখতে পাই, একটি কাজের বা প্রবন্ধের সঙ্গে পূর্বে প্রকাশিত অন্য কাজের বা প্রবন্ধের বা বইয়ের সঙ্গে ৫০ ভাগ বা তার অধিক মিল থাকলেই এটাকে চৌর্যবৃত্তি বলা যাবে বিষয়টি এত সহজ না। এক্ষেত্রে লেখক যদি যথাযথ পদ্ধতি অবলম্বন করে রেফারেন্স এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকেন তাহলে এটাকে আমরা চৌর্যবৃত্তি বলতে পারব না। অন্যদিকে পাঁচ ভাগ মিল থাকলেও আমরা ওটাকে চৌর্যবৃত্তি বলতে পারব যদি ওই লেখায় যথোপযুক্ত নিয়ম না মেনে রেফারেন্স না দেন কিংবা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করেন। তাহলে এটা পরিস্কার- একজন লেখকের লেখার সঙ্গে অন্য লেখকের লেখার মিল থাকলেই ঢালাওভাবে ওই লেখা চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় নিয়ে লেখা হয়েছে বলে মতামত দিতে পারি না যতক্ষণ পর্যন্ত ওই লেখা উপরোক্ত নিয়মকানুনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়। এই বিযয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই আমরা বলতে পারব, ওই লেখায় কোনো চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে কিনা।

সহকারী অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ঢাকা