আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পশু বিক্রেতা ও ক্রেতারা দুশ্চিন্তায় আছেন। সাধারণ খামারিরা বলছেন, যেভাবে করোনার ঢেউ চলছে, তাতে কীভাবে পশুগুলো বিক্রি করবেন তা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। কারণ লকডাউনের কারণে পশু পরিবহন থেকে শুরু করে হাটে তোলা ও বিক্রির ক্ষেত্রে বহুবিধ সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার হাটে তুললেও পশুগুলো ঠিকমতো বিক্রি হবে কিনা তা নিয়ে তারা চিন্তিত। আর ক্রেতারা বলছেন, এমন অবস্থা হলে তারা কীভাবে পশু কিনতে হাটে যাবেন?
সংকট ঘনীভূত হয়েছে চলমান লকডাউন আরও এক সপ্তাহ বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের পর। চলমান লকডাউন আরও বাড়বে কিনা সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় হাটেও কি পর্যাপ্ত পশু উঠবে? হাটে পর্যাপ্ত পশু না থাকলে দাম হবে ঊর্ধ্বমুখী। এ ছাড়া বিদেশ থেকে পশু আমদানি বন্ধ। অথচ প্রায় দেড় বছর ধরে চলা করোনাভাইরাসের কারণে অনেকেরই আর্থিক অবস্থা খারাপ। এ অবস্থায় পশুর দাম বেড়ে গেলে পশু কেনা অনেকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে।
তবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন রাজধানী ও আশপাশের নামিদামি খামারিরা। তারা ইতোমধ্যে অনলাইনে অনেক পশু বিক্রি করে ফেলেছেন। অনলাইনের ক্রেতারা তুলনামূলক বেশি দামেই পশু কিনেছেন বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।
বাংলাদেশ ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরান হোসেন সমকালকে বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি পশু উপাদন হয় দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে। সেখানে করোনার মহামারি চলছে। তারা পশু আনতে না পারলে একটা সংকট তৈরি হবে। এ জন্য তাদের আবেদন, ৭ জুলাইয়ের পর পশু পরিবহন ও কেনাকাটায় লকডাউনে যেন কিছু শিথিলতা আনা হয়। পাশাপাশি হাটের সংখ্যা বাড়ানো হোক, যাতে ক্রেতারাও স্বাচ্ছন্দ্যে পশু কিনতে পারবেন। তাহলে দামেরও ভারসাম্য থাকবে।
অনলাইনে পশু বিক্রি সম্পর্কে তিনি বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার অনলাইনে বেশি সাড়া পাওয়া গেলেও গত বছর অনলাইনে ২৭ হাজার পশু বিক্রি হয়েছিল। এই সংখ্যা মোট বিক্রি হওয়া পশুর ২ শতাংশও নয়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে গবাদিপশুর সংখ্যা ৪১ কোটি ২২ লাখ ৪৪ হাজার। এর মধ্যে কোরবানিযোগ্য পশু আছে এক কোটি ১৯ লাখ। ৪৫ লাখ ৪৭ হাজার গরু-মহিষ, ৭৩ লাখ ৬৫ হাজার ছাগল ও ভেড়া এবং চার হাজার ৭৬৫টি উট-দুম্বা। গত বছর দেশে ৯৫ লাখের মতো পশু কোরবানি হয়েছিল, যদিও প্রাক্কলন ছিল এক কোটি ১০ লাখ। বিপরীতে বাজারে আনার মতো পশুর সংখ্যা ছিল এক কোটি ১৮ লাখ। এবার কোরবানির পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে এক কোটি ১০ লাখ। তারপরও ৯ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম সমকালকে বলেন, সরকারের উদ্যোগের ফলেই দেশে এখন চাহিদার তুলনায় বেশি পশু উৎপাদন হচ্ছে। এতে খামারিরা দামও পাচ্ছেন। এবারও আমরা চাই খামরিরা যেন লাভবান হয়।
ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, দেশে ১০টির বেশি গরু থাকা খামারের সংখ্যা ১৪ লাখ। এর মধ্যে কোরবানির জন্য পশু উৎপাদন করেন সাড়ে তিন লাখ খামারি। এসব খামারে মাঝারি আকারের গরুই বেশি উৎপাদন করা হয়। এবার এসব গরুর চাহিদা বেশি থাকবে।
লকডাউনের সঙ্গে দুশ্চিন্তাও বাড়ল :এবার গাবতলী স্থায়ী পশুহাটসহ ২১টি স্থানে কোরবানির পশুহাট বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) রয়েছে ১৩টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) রয়েছে আটটি। কিন্তু চলমান লকডাউন আরও বাড়লে হাট বসবে কীভাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আর না বাড়লেও ১৫ জুলাইয়ের আগে হাটে পশু তোলা সম্ভব নয়। আবার কোনোভাবে পশু তুললেও পরে যদি হাটই বাতিল করা হয়, তাহলে খামারি ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের দুর্গতি আরও বাড়বে।
ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে এখন পর্যন্ত হাট বসার সিদ্ধান্ত আছে। নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটা জানানো হবে।
প্রায় একই কথা জানিয়েছে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের জানান, ২১ বা ২২ জুলাই ঈদ হতে পারে। আগামী ১৪ জুলাই পর্যন্ত লকডাউনের সরকারি ঘোষণা আছে। এরপর বৃদ্ধি করা না হলে ১৫ জুলাই থেকে হাট বসতে বাধা নেই। এখন সবই নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর।
একই স্থানে দুই হাট বসানোয় শঙ্কা :আফতাবনগরে একই স্থানে কোরবানির পশুহাটের ইজারা দিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। পৃথক দরপত্রের মাধ্যমে এক হাট দুই ইজারাদারকে দেওয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এই হাটটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বরাবরই সন্ত্রাসী চক্র সক্রিয় থাকে। হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই ২০১৪ সালে এক কোটি টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় সন্ত্রাসীরা হাটের ইজারাদার স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মাহবুবুর রহমান গামাসহ চারজনকে গুলি করে হত্যা করেছিল। এরপর থেকে প্রতি বছরই হাটটি নিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। এবারও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় একটি হাট বাতিলের জন্য ইসলাম উদ্দিন নামের একজন স্থানীয় বাসিন্দা আদালতে রিট করেছেন।
এ ব্যাপারে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন বলেন, রিটের শুনানিতে আদালত যে নির্দেশনা দেবেন, সেটি বাস্তবায়ন করা হবে।
খামারগুলোর চিত্র :সম্প্রতি রাজধানীর গাবতলী থেকে বসিলা পর্যন্ত সড়কের পাশের বেশ কয়েকটি খামারে গিয়ে দেখা যায় সেগুলো গরু-ছাগলে ভরা। জানা গেল, বেশিরভাগ পশুই বিক্রি হয়ে গেছে। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার সাদেক এগ্রো ঘুরে দেখা গেছে, খামারটিতে বিশাল আকারের অনেকগুলো গরু আছে। এর মধ্যে যেগুলো বিক্রি হয়ে গেছে, সেগুলোর গায়ে বিক্রি হয়েছে বলে উল্লেখ করা। বিশাল আকৃতির একটি আমেরিকান ব্রাহমা ষাঁড় বিক্রি হয়েছে ৩৮ লাখ টাকায়। ধূসর রঙের গরুটির ওজন ৩৫ মণ। পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ী গরুটি কিনেছেন। খামারটিতে ছাগল ও দুম্বা আছে দুই শতাধিক। প্রতিটি গরুর দাম এক লাখ থেকে শুরু করে ৪০ লাখ টাকা। ছাগলের দাম হাঁকা হচ্ছে ১২ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। দুম্বার দাম চাওয়া হচ্ছে দুই থেকে চার লাখ টাকা।
বছিলারই খামার র‌্যাঞ্চ লিমিটেড ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতার বসার জন্য সুন্দর জায়াগা রাখা হয়েছে। সামনে রয়েছে পার্কিং। বেশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। সেলস সেন্টারের ইনচার্জ ফজলুল হক বাচ্চু সমকালকে বলেন, অনেক ক্রেতা অগ্রিম বুকিং দিয়ে রেখেছেন। এ ছাড়া ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-ভ্যালিতে তারা গরু সরবরাহ করছেন।
সামারাই ক্যাটল ফার্মে গিয়ে দেখা যায়, বেশ রাজকীয়ভাবেই বিশ্রাম নিচ্ছে 'ফালাক' নামের একটি ষাঁড়। ব্রাহমা জাতের এই গরুর গায়ের রং ধূসর-সাদা। গলায় কালো ছোপ। সাড়ে চার বছরের ফালাকের উচ্চতা পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি। ওজন প্রায় এক হাজার ৩০০ কেজি। এটি এই খামারের সবচেয়ে বড় গরু। ফালাকের দাম হাঁকা হয়েছে ৪৫ লাখ টাকা। খামারের বেশিরভাগ পশুর গায়েই 'সোল্ড আউট' ট্যাগ লাগানো। খামারটির প্রায় ৭০ শতাংশ পশু বিক্রি হয়েছে। বিভিন্ন আকারের গরুর দাম ৬০ হাজার থেকে শুরু করে ১৫ লাখ টাকা। এক হাজার কেজি ওজনের গরুগুলোর দাম চাওয়া হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। খামারটিতে বিদেশি উন্নত জাতের ভেড়াও রয়েছে। এগুলোর দাম ১২ হাজার থেকে শুরু। এরই মধ্যে ৬০টির বেশি বিক্রি হয়েছে। তবে বরাবরের মতো এবারও দেশি ছোট গরুর চাহিদা বেশি বলে জানালেন খামারের ইনচার্জ শাহেদ হোসেন।