কেয়াজুপাড়া থেকে চম্পাঝিরি যাওয়ার পথে চার ধর্মের আর পাঁচ জাতির মানুষ একসঙ্গে জুটে গেলাম। জার্নিটা নানা কারণেই স্মরণীয় ছিল। জ্যোতিষীরা বলেছেন, দক্ষিণ-পুবে যাত্রা আমার জন্য সুখের। সুখ ছিল সফরে। তবে রাতের শীত অসহ্য হয়েছিল। বাঁশের ঘরে এমনিতেই বাতাস ঢোকে। তাতে আবার ফেব্রুয়ারি মাসের পাহাড়ি শীত। দিনে গরম, রাতে তীব্র শীত। রাত যত বাড়ে, শীত ততই বাড়ে।
সবার শেষে শেষরাতে ঘুমাতে গিয়ে জায়গা পেলাম দরজার সামনে। কেয়াজুপাড়া পর্যন্ত নবাবি হালেই গেলাম। পথে আপ্যায়ন পেয়েছিলাম ভালো। তখনও জানি না, ভোরের হাঁটা দলটার সঙ্গে গেলেই পারতাম। হাঁটার পরিশ্রম হতো। কিন্তু পাহাড়, জঙ্গল আর গাছেদের ছুঁয়ে যাওয়া শরীর-মনের প্রশান্তির কারণ হতে পারত। আমরা কয়েকজন পাহাড়ি পথে হাঁটার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে চান্দের গাড়িতে চড়ে বসলাম। চান্দের গাড়িতে নানা ধর্মের, নানা জাতির লোককে একসঙ্গে পেয়ে দুঃখ কিছুটা কমলো। একজন মারমা বাচ্চা, যে কিনা আবাসিক বিদ্যালয়ে পড়তে যাবে বলে আমাদের গাড়িতেই চড়েছিল। সে ঘুমের ঘোরে পরাগ রিছিলের জ্যাকেট ভিজিয়ে ফেলল লালা ফেলে। আমরা গাড়িতে ঘুমের কথা ভাবব কি? আছাড়ে-বিছাড়ে শরীরের ভেতরের সমস্ত হাড়-পাঁজর ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার উপক্রম। একবার হাতল ছাড়তেই মাথায় ভীষণ জোরে আঘাত পেল কে যেন। খাড়া হয়ে গাড়ি যখন উঠছে, খাদে পড়ার ভয়ে তখন স্রষ্টাকে স্মরণ করছি। তিন ঘণ্টা এভাবে লন্ডভন্ড হতে হতে চারদিকে এমন পাহাড়-জঙ্গলেই কোথাও নামতে বলা হলো। আমরা স্কুলটিতে পৌঁছে গিয়েছি ততক্ষণে।
দু-তিনটা ছোট টিলা মিলে স্কুলটা করা হয়েছে। আগে সরকারি-বেসরকারি যৌথ একটা প্রকল্পের স্কুল ছিল এটি। প্রজেক্টের শিক্ষক এখানে পড়াতে আসতেন না। রিংকু দাদাকে গ্রামের লোকেরা অনুরোধ করেছিলেন ছেলেমেয়েদের পড়াতে। আমাদের বন্ধু রূপা দত্ত নিজের কাজে চম্পাঝিরি গিয়ে যুক্ত হলো এর সঙ্গে। স্কুল করার বাতিক রূপার আছে। বন্ধুদের নিয়ে এই স্কুলটাকেও সে তাজা করতে চেষ্টা করল ২০১৩ সালে। তখন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন রিংকু দাদা, যার পুরো নাম অং সাই চিং চাক। রিংকু দাদা ওই এলাকার ক্রামা, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ- সব সম্প্রদায়ের যৌথ অনুরোধে এবং এলাকাবাসীর অর্থায়নে বাচ্চাদের পড়াচ্ছিলেন। রূপাদের উদ্যোগে স্কুলটি স্থায়ী চরিত্র নিতে শুরু করে। তখন মেনরং ম্রোও এই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে আসেন। রূপার কথা অনুযায়ী, রিংকু দাদা আর মেনরংয়ের ঐকান্তিক অংশগ্রহণ ছাড়া শুধু বাইরের চেষ্টা দিয়ে স্কুলটি বাঁচানো যেত না। যেমন বাঁচানো যায়নি একই সময়ে গড়ে ওঠা ওদের অন্য স্কুলগুলোকে। মেনরং একবার বাচ্চাদের বুনো হাতির আক্রমণ থেকে বাঁচিয়েছেন।
পাহাড়ের এই স্কুলটির নাম পাওমাং। পাওমাং অর্থ ফুলবাগান। পাহাড়ের এই পাওমাং স্কুলে সরকারি কারিকুলামকে বাস্তবভিত্তিক চর্চার মধ্য দিয়ে অভ্যাস করানো হয়। আর শিশুদের স্বনির্ভর করার চেষ্টা করা হয়। যেমন- তৃতীয় শ্রেণির বাচ্চারা প্রথম শ্রেণির বাচ্চাদের গোসল করতে সাহায্য করে। তারা নিজেদের পোশাক তৈরি করে। নিজেরা খাবার পরিবেশন করে। এমনই অনেক কিছু। তারা ঐতিহ্য অনুসরণ করে জুম চাষ শিখেছে। যাদের পড়াশোনা বেশি ভালো লাগে, তারা ওটাই বেশি করে। পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকার বিদ্যা তারা স্কুল থেকেও শেখে। ওই স্কুলে মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা এবং বাঙালি মিলে শিক্ষার্থী আছে শতকরা ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশ ম্রো। তাই মাতৃভাষায় পড়ানোর জন্য ম্রোদের মাতৃভাষাকে ভিত্তি ধরে নেওয়া হয়। কারণ, সবার ভাষায় শিক্ষক পাওয়া কঠিন। যারা শিক্ষক হয়েছেন, তারা স্কুলে মাতৃভাষা শিখতে পারেননি। তাই পাঠদানের জন্য চাক, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা জানেন, এমন শিক্ষক খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
পাওমাং স্কুলকে একটা মাদার স্কুল বলা যায়। স্কুলের অর্থ সরবরাহের ব্যবস্থা খুব অনিশ্চিত হলেও এখানকার শিক্ষক এবং শিক্ষাপদ্ধতি যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য। তাই আশপাশের আরও কিছু স্কুল এখানে আসে নানা বিষয়ে সহযোগিতা নিতে। এখানকার ছাত্ররা পড়া শেষ করে আরও স্কুল বানিয়েছে এর চেয়ে দুর্গম এলাকায় গিয়ে। দুর্গম পাহাড়ে থাকা ওদের স্কুলগুলো দেখা হয়নি। মেনরং লামাতেই শুরু করেছেন আরেকটি স্কুল পাওমুম। গত বছর শুরু হয়েছে নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারীর দুর্গম এলাকায় পাওমাংয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক, বর্তমান সমন্বয়ক রিংকু দাদার পাওলেং স্কুল। ওটা রিংকু দাদাদের গ্রাম। তিনটি গ্রামে চালু আছে প্রাক্‌-প্রাথমিক স্কুলব্যবস্থা। বড় হয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েরা পাওমাং স্কুলের ব্যবস্থাপনাতেই শহরের হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে।
পাহাড়ের চূড়ায়, পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী ঘরের মতো করে বানানো স্কুল এবং স্কুলের হোস্টেলটি দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। কয়েকটি টিলার মিলেমিশে থাকার ধরনটা অক্ষুণ্ণ রেখেই স্থাপনাগুলো করা হয়েছে। স্কুলটা দেখে তোত্তোচানের স্কুলের কথা মনে এলো। তেৎসুকো কুরোয়ানাগি জাপানের বিখ্যাত টেলিভিশন উপস্থাপক এবং জাতিসংঘের সাবেক শান্তিদূত। তার ডাকনাম তোত্তোচান। শৈশবের বিদ্যালয়কে ঘিরে স্মৃতিকথা লিখেছেন তিনি। 'তোত্তোচান :জানালার ধারে ছোট্ট মেয়েটি' নামে বাংলায় অনূদিত হয়েছে বইটি। রূপাদের স্কুল বাঁশ-শন দিয়ে বানানো। তেৎসুকো চান বা তোত্তোচানদের ক্লাসরুমগুলো করা হয়েছিল পুরোনো রেল কামরা দিয়ে। তাদের টিফিনে থাকত একটা পাহাড়ের খাবার, আর একটা সাগরের খাবার। মানে একটা সবজি জাতীয় আর একটা মাছ জাতীয় খাবার। সেখানে শিক্ষক সব বিষয়ের প্রশ্ন লিখে দিতেন বোর্ডে। সবাই ক্রমান্বয়ে প্রিয় থেকে কম প্রিয় বিষয়গুলোর উত্তর দিত। শিক্ষার্থীর পছন্দ যাচাই হয়ে যেত প্রাথমিক বিদ্যালয়েই। খুব বেশি কথা বলতে ভালোবাসতেন বলে তোত্তোচান বড় হয়ে টিভি উপস্থাপক হয়েছিলেন। আত্মবিশ্বাস এবং আত্মশক্তি বিকশিত হলে যে কোনো শিশু যে কোনো কাজেই সফল হতে পারে- সেই ধারণা দেওয়ার জন্য ওই বইটিই যথেষ্ট। তোত্তোচানদের স্কুলের সবাই ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত মানুষ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বোমা হামলায় স্কুলটি ধ্বংস হয়ে যায়।
ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী চিয়াচটপ্লাই বা গো হত্যা উৎসবের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলাম আমরা। গ্রামটা যদিও স্কুল থেকে দূরে নতুন পাড়ায় সরে গিয়েছে পানির অভাবে। পানির অভাব বড় অভাব। কেবল অনাবৃষ্টিতেই নাকি সিন্ধুসভ্যতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের পাহাড়গুলোতেও এখন পানির অভাব। বড় গাছ কেটে ফেলায় আর পাথর তুলে ফেলার কারণে মাটি এখন আর পানি ধরে রাখতে পারছে না। রূপাদের স্কুলপাড়াতেও পানির অভাব। বাচ্চারা স্কুলেই থাকে। সকালে-বিকেলে দু'বার দূরের কোনো একটা ঝিরি থেকে তারা নিজ নিজ ব্যবহারের জন্য দুই কনটেইনার পানি টেনে আনে। স্কুলের চাপকল থেকে রান্নাবান্না চলে। অমর্ত্য সেনেরও নাকি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ঝগড়া লেগেছিল। তিনি বলেছেন, জীবনের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের মধ্য দিয়েই উন্নয়ন পথে যাত্রা শুরু করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের মনে হয়েছে, টাকা হলে অন্যসব প্রয়োজন আপনাআপনি মিটবে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদেরও বোধ হয় একই মত। পাহাড় কেটে টাকা হয়। কিন্তু টাকা খরচ করে পাহাড় বানানো যায় না। তিন পার্বত্য জেলায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা গেছে গড়ে ৫০ শতাংশ মানুষের জন্য। বাকিদের জন্য প্রাকৃতিক ঝরনাই ভরসা। কিন্তু ঝরনা বানানো তো সম্ভব নয়। অথচ পানির উৎসগুলো নষ্ট করা হচ্ছে বিবেচনা ছাড়াই।
ঢুকতেই অতিথিদের একটা দল পাওয়া গেল ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী খোলা মাচাং ঘরে। থাকার ঘরে যাওয়ার সময়, স্থানীয় রীতিতে কাঠের টুকরো কেটে বানানো সিঁড়ি দিয়ে খানিক উঠে ওপরে লাফ দেওয়া খুব আরামের ছিল না। গোড়াতেই সবাইকে বলা হলো সিগারেটের ফিল্টার যেন কাঠের ডালে ঝোলানো বস্তার ডাস্টবিনে ফেলা হয়। পুরো পরিবেশবান্ধব স্থানিক কাঠামো দেওয়া হয়েছে স্কুলটিকে। বাচ্চারা দোতলার হোস্টেলে থাকে। নিচের তলাতে শ্রেণিকক্ষ। এত বেশি পরিবেশবান্ধব নাগরিকদের উদ্যোগ যেখানে, স্কুলের পড়াশোনা সেখানে জীবনবান্ধব হচ্ছে আশা করছি। তা ছাড়া নিজের কাজ ও জুম চাষ শেখানোর সঙ্গে আত্মমর্যাদা তৈরি এবং স্বনির্ভর করে তোলার চেষ্টা আছে নিশ্চয়ই। লুকিয়ে থাকা সত্ত্বেও রূপা কিছুদিন আগে 'আনসাং ওমেন বাংলাদেশ' থেকে একটা পুরস্কার পেল। নিজের ছেলেমেয়ে পড়াই বলে বুঝি, ছেলেমেয়েদের কোনো কাজের জন্য মেশিন বানিয়ে দিতে চাইলে, ওই কাজটা শিখিয়ে দিতে হবে এবং কাজটা মুখস্থ করাতে হবে। আর যদি আমরা বিকশিত ব্যক্তিত্বের পূর্ণ মানুষ গড়তে চাই, তাহলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবারই যথেষ্ট শারীরিক, মানসিক প্রস্তুতি দরকার। মনকে যোগ করার কথা বলছি। চিন্তাকে সংযত আর সুস্থির করার কথা বলছি। প্রাচ্যের পাঠপদ্ধতিতে চিন্তা এবং মনঃসংযোগকে মূল্য দেওয়া হতো একসময়ে। সে কারণেই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বসবাসের ব্যবস্থা ছিল। গভীর পাঠ সব সময় জীবনাভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত। গুরুগৃহে থেকে বা বিহারগুলোতে অবস্থান করে পড়াশোনা করার কথাও আমরা জানি। যে শিক্ষা অন্তরকে বিকশিত করতে পারে না, জীবনের গভীরতম উপলব্ধি দেয় না, তাকে শুধু দক্ষতা বলা যেতে পারে। রূপাদের স্কুল রবীন্দ্রনাথের স্কুলের মাত্রায় চিন্তাশীল কিনা আমি জানি না। তবে তাদের পরিবেশ, প্রতিবেশপ্রীতি সেখানকার ম্রো জনগোষ্ঠীর সম্মান রাখে। শিশুদের তারা হাতেকলমে তত্ত্ব শেখাচ্ছে। নিজের কাজ নিজে করতে শেখাচ্ছে।
স্কুলের পাশেই ম্রোদের গ্রাম চম্পাঝিরি। চম্পাঝিরি নামে পরিচিত এই গ্রামটি বান্দরবানের লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের একটি ম্রোপাড়া। ইউনিয়নটি সর্বসাধারণের কাছে কেয়াজুপাড়া নামে পরিচিত। একটি বাজারও আছে এই নামে। যে বাজার থেকে পাহাড়ি পথে আমাদের নিয়ে যাত্রা করেছিল চান্দের গাড়ি। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, বান্দরবান সদর ও লামা উপজেলার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত সরই ইউনিয়ন। এটি ম্রো অধ্যুষিত একটি এলাকা বলে পরিচিত ছিল, এখন আর তা বলা যাবে না। চম্পাঝিরিতে সাকল্যে পনেরোটি ম্রো পরিবার আছে এখন।