প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এ সমাজেরই অংশ। তাদের বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নয়নের মূল স্রোতে তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের দক্ষতা বাড়িয়ে, তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের জীবন-জীবিকার পথ সম্প্রসারিত করতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্মানের সঙ্গে সমাজে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি সবাইকে সমন্বিতভাবে চেষ্টা চালাতে হবে। তাহলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাসও বাড়বে।
গতকাল বুধবার ভার্চুয়ালি ব্র্যাক, এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, সেন্স ইন্টারন্যাশনাল, লাইট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড, সিডিডি ও দৈনিক সমকালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত 'ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ ভোকেশনাল ট্রেনিং অ্যান্ড ইয়ুথ এমপ্লয়মেন্ট' শীর্ষক প্রকল্পের পরিচিতি ও আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
প্রসঙ্গত, ব্রিটিশ সরকারের ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ ডেভেলপমেন্ট অফিসের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন জেলায় এক হাজার ১৫০ জন যুব প্রতিবন্ধী নারী ও পুরুষকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সিলেবাস অনুযায়ী প্রিভোক-১ ও ২-এর প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে আয়মূলক উৎপাদনের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উপযুক্ত কর্মপরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারকে প্রয়োজনীয় নীতিগত পরামর্শ দেওয়া হবে।
এতে সভাপতিত্ব করেন এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. শফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) দুলাল কৃষ্ণ সাহা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. হামিদুল হক ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ডেপুটি ডিরেক্টর (কোর্স অ্যাক্রিডিটেশন) এস এম শাহজাহান।
আলোচনায় দুলাল কৃষ্ণ সাহা বলেন, প্রকল্পটিতে ভোকেশনাল ট্রেনিং অ্যান্ড ইয়ুথ এমপ্লয়মেন্টের বিষয় এসেছে। দুটি বিষয়ই বেশ প্রাসঙ্গিক। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামাজিক ও পারিবারিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বের করে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নতুন প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক কাজ করার মধ্য দিয়ে আমরা এগোনোর চেষ্টা করছি। ১৬০টি প্রতিষ্ঠানকে রেজিস্ট্রেশন দিয়েছি। এ দেশে সরকারি-বেসরকারি অনেক সংস্থা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছে। কিন্তু কাজটি সমন্বিতভাবে হচ্ছে না। আমাদের কাজ হচ্ছে সমন্বয় করা। আমরা গুণগত মান নিশ্চিত করব। শিল্প সংযোগ প্রতিষ্ঠা করব।
ওয়েবিনারে মো. হামিদুল হক বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জরিপে ইতোমধ্যে ২৩ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে। এ বিপুল জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল স্রোতে সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধু সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের সম্মানের সঙ্গে এ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। কেবলমাত্র কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আয়-রোজগারের পথকে সম্প্রসারিত করেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্মানের সঙ্গে সমাজে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব। সে জন্য ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ ভোকেশনাল ট্রেনিং অ্যান্ড ইয়ুথ এমপ্লয়মেন্ট প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এস এম শাহজাহান বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ অর্থাৎ এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ প্রতিবন্ধী। তাদের বাদ দিয়ে এ দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাদের নিয়েই চলতে হবে, তাদের উৎপাদক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ও সংযোগের প্রচেষ্টা ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ ভোকেশনাল অ্যান্ড ইয়ুথ এমপ্লয়মেন্ট প্রকল্পের মাধ্যমে চলছে। আশা করি, এটি বাস্তবায়ন হলে দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে আরও যারা কাজ করছেন, তারাও বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করবেন। তিনি বলেন, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও ধ্যানধারণা পরিবর্তন করা জরুরি। আশা করি, এ ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে সামনে আরও বড় পথ খুঁজে পাব। এ প্রকল্পে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শুধু প্রশিক্ষণ কিংবা চাকরির দক্ষতা অর্জন করবেন না- ব্যবসা, কারিগরি, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির এবং নিজেকে প্রতিনিধিত্ব করার দক্ষতাও অর্জন করবে।
মুস্তাফিজ শফি বলেন, প্রতিটি মানুষের ভেতরেই অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে। প্রতিবন্ধীরাও তার বাইরে নয়। তাদের ভেতরের সেই শক্তিকে বের করে আনতে হবে। তাদের জন্য কর্মপরিবেশ তৈরি করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বর্তমান সরকার অত্যন্ত প্রতিবন্ধীবান্ধব। সরকার যথেষ্ট কাজ করছে। তার সঙ্গে সামাজিক উদ্যোগগুলো যুক্ত হয়েছে। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় আমরা এগিয়ে যাব। সবার সমন্বিত উদ্যোগে প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজের পরিবেশ ও দক্ষতা তৈরি হবে।
আলোচনায় বাংলাদেশ বিজনেস ডিজঅ্যাবিলিটি নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুরতেজা খান বলেন, আমরা প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি শ্রমবাজার গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছি। প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা ছাড়া কর্মবাজারে আসা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।
উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন্নাহার মিষ্টি বলেন, আমাদের মাধ্যমিক স্কুলের ভোকেশনাল শাখায় প্রতিবন্ধী শিশুরা যুক্ত হতে পারে না। তাদের নিরুৎসাহিত করা হয়। এ প্রথা ভাঙতে হবে।
লাইট ফর দ্য ওয়ার্ল্ডের ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুশন অ্যাডভাইজার মুরালি পদমানাভান বলেন, এখনও প্রতিবন্ধীদের কাছে পৌঁছাতে আমাদের অনেক প্রতিকূলতা, বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয়। পরিবেশ, নীতি বা প্রতিবন্ধীদের প্রতি লোকজনের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এ রকম হতে পারে। আমরা চেষ্টা করছি বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তাদের পরামর্শ বা অন্য সহায়তা দিতে, যাতে তারা বাধা অতিক্রম করতে পারে।
সেন্স ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডিয়ার নির্বাহী পরিচালক অখিল পাল বলেন, প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে প্রধান বাধা আসে আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি থেকে। আমরা বেশিরভাগই প্রতিবন্ধীদের জীবনযাপনকে সম্মান করি না। একইভাবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকেও সম্মান করতে পারি না। তাই এ প্রজেক্টের লক্ষ্য হওয়া উচিত 'কাউকে পেছনে ছেড়ে না আসা'।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের অধ্যাপক ড. এম তারিক আহসান বলেন, কী শিখব, কেন শিখব, কোথায় শিখবসহ পাঁচটি শিক্ষণীয় বিষয়কে যদি আমরা অন্তর্ভুক্ত করতে পারি, তাহলে কাজগুলো অনেক সহজ হয়ে যাবে। আমরা যে কোনো প্রশিক্ষণার্থীকে অভিযোজন সক্ষমতা ও চাহিদার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ দিতে পারব।
এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পলিসি অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর দেওয়ান মাহফুজ এ মওলা বলেন, আমরা ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যাক্টিভিস্টদেরও গতিশীল করতে চাই। আমরা চেষ্টা করব অনানুষ্ঠানিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোতে যুক্ত হওয়া বা পরামর্শ দিয়ে অংশ নেওয়ার।
সিডিডির নির্বাহী পরিচালক এ এইচ এম নোমান খান বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষদের মধ্যে আমরা অনেক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। তারা অনেক কিছুতেই অংশ নিচ্ছে এবং যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছে।
সেন্টার ফর সার্ভিস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবিলিটির নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম বলেন, দেশে এক লাখের বেশি প্রতিবন্ধী এসএসসি থেকে শুরু করে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়েছেন। কিন্তু আমরা সবাই তাদের স্বাভাবিকভাবে কর্মক্ষেত্রে গ্রহণ করতে পারি না। এ বাধা দূর করতে হবে।
রজনীগন্ধা প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি আসাদুজ্জামান চৌধুরী রাসেল বলেন, শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না। প্রশিক্ষণের পর তাকে ব্যাংক কিংবা সমবায় অধিদপ্তর থেকে পুঁজির ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির ডেপুটি ম্যানেজার মাহফুজ আলী প্রকল্পের পরিচিতি তুলে ধরে বলেন, প্রজেক্টে ব্র্যাক, এডিডি ইন্টারন্যাশনাল, সেন্স ইন্টারন্যাশনাল (এসআই), সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট (সিডিডি) এবং লাইট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড কাজ করছে। এই পাঁচটি সংগঠন মিলে 'ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ ভোকেশনাল ট্রেনিং অ্যান্ড ইয়ুথ এমপ্লয়মেন্ট' প্রজেক্টের বাস্তবায়ন শুরু করেছি। ব্র্যাক ২০১২ সাল থেকে স্টার মডেল বাস্তবায়ন করে আসছে। এ প্রজেক্টে ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে বর্তমানে চালু হওয়া প্রজেক্টের মাধ্যমে ব্র্যাক শতভাগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিয়ে কাজ করবে এবং এক হাজার ৫০ জনকে দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে কাজ করবে।
ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির ডে অব অপারেশন জয়দেব সিনহা রায় বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাকরির বাজারে নিয়ে আসায় সরকারের যে লক্ষ্য আছে, এ ধরনের প্রজেক্ট তাতে অনেক বড় ভূমিকা রাখবে।