এক সিট আড়াইশ! দুই সিট পাঁচশ! শুক্রবার বিকেলে মহাখালী টার্মিনালে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে এভাবেই হাঁকডাক দিয়ে যাত্রী তুলছিলেন ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের সৌখিন পরিবহনের একটি বাসের কর্মীরা। লকডাউন উঠলেও বাসের অর্ধেক আসন খালি রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সৌখিন পরিবহনের মতো আরও অনেকেই এ নিয়ম মানছে না।

ওই বাসটিতে (ঢাকা-মেট্রো-ব-১২-০৪৪০) যাত্রী তোলার কাজ করছিলেন হেলপার মোজাম্মেল হোসেন। তিনি জানান, কোনো যাত্রী পাশের আসন খালি রেখে যেতে চাইলে ৫০০ টাকা ভাড়া নিচ্ছেন। আর পাশাপাশি দুই আসনে যাত্রী গেলে ভাড়া জনপ্রতি আড়াইশ' টাকা।

নিয়ম অনুযায়ী অর্ধেক আসন খালি রাখার কথা থাকলেও কেন বাস ভরে যাত্রী তোলা হচ্ছে- এ বিষয়ে মোজাম্মেলের বক্তব্য, ময়মনসিংহ থেকে খালি ফিরেছেন। শুক্রবার সারাদিনেও ট্রিপ হয়নি যাত্রীর অভাবে। তাই লোকসান পোষাতে সব আসনে যাত্রী নিতে হচ্ছে।

শুক্রবার মহাখালী টার্মিনালে দেখা যায়, ঈদের আগের শেষ শুক্রবার হলেও যাত্রী একেবারেই কম। অধিকাংশ বাসই যাত্রীর অপেক্ষায় ছিল। অথচ অন্যান্য বছর ঈদের সপ্তাহখানেক আগে থেকেই বাস টার্মিনালে আসামাত্র যাত্রী পূর্ণ হয়ে যেত। তবে রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রী কম দেখা গেলেও মহাসড়কে ছিল গাড়ির ব্যাপক চাপ। ফলে দীর্ঘ যানজটে পড়ে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এদিকে দেশের বিভিন্ন নৌঘাটেও যাত্রী ও যানবাহনের চাপ দেখা গেছে।

এবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাস চলাচল নিশ্চিতে বিআরটিএ এবং পুলিশ ছাড়াও মালিক-শ্রমিক নেতাদের কমিটি রয়েছে। তবে মহাখালী শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাদিকুর রহমান হিরু সমকালকে বলেছেন, বাধ্য হয়েই কিছু বাস আসনের অর্ধেকের বেশি যাত্রী নিচ্ছে। ৪০ আসনের বাসে স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী ২০ জন যাত্রী পরিবহনের কথা; কিন্তু বাড়তি ১০ জন নিতে হচ্ছে লোকসান পোষাতে।

এর ব্যাখ্যা দিয়ে সাদিকুর বলেন, ঢাকা-ময়মনসিংহের ভাড়া যাত্রীপ্রতি ২২০ টাকা। করোনাকালে অর্ধেক আসন খালি রাখায় তা ৩৫০ টাকা হয়েছে। এত ভাড়া দিয়ে সাধারণ মানুষ উঠতে চায় না। আবার ফেরার সময় বাস খালি আসছে। এ কারণে ঢাকা থেকে যাওয়ার সময় আট-দশজন যাত্রী বাড়তি নিচ্ছে। এরই মধ্যে সরকার ও বিআরটিএকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়ে একটু ছাড় দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার অবশ্য বলেছেন, সরকারি নির্দেশনা শিথিল করার সুযোগ নেই। আসনের অর্ধেক যাত্রীই নিয়ে চলতে হবে। কেউ তা ভঙ্গ করলে শাস্তি পেতে হবে।

মহাখালী থেকে চলাচল করা 'ইমাম', 'শাহ জালাল'সহ বিভিন্ন পরিবহনে একই চিত্র দেখা গেছে। বাসের চালক ও শ্রমিকরা জানান, করোনাকালে যাত্রীদের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। ঢাকা-জামালপুরের ভাড়া ৩৫০ থেকে বেড়ে ৫৬০ টাকা হয়েছে। যাত্রীরাই অনুরোধ করছেন, আগের ভাড়াতেই আসন পূর্ণ করে যাত্রী তুলতে। যারা সপরিবারে যাচ্ছেন, তারা আসন খালি রাখতে চান না। তবে 'এনা পরিবহন' আসনের অর্ধেক নিয়ে চলছে।

লকডাউন শিথিলের দ্বিতীয় দিনে শুক্রবার রাজধানী ঢাকার পথঘাট আগের দিনের তুলনায় ফাঁকা ছিল। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় সকাল ও দুপুরে রাস্তায় খুব একটা যানবাহন ছিল না। বিকেলে ধানমন্ডি, শেরেবাংলা নগর, বনানী, মহাখালী ও তেজগাঁও এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রধান সড়কের সিগন্যালগুলোতে গাড়ির চাপ থাকলেও যানজট ছিল না।

তবে নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, গুলিস্তান, পান্থপথসহ মার্কেট এলাকায় বিকেলে উপচেপড়া ভিড় ছিল। লকডাউনে বন্ধ থাকার পর বৃহস্পতিবার থেকে শপিংমল ও মার্কেট খুললেও সেদিন ক্রেতার ভিড় ছিল না। গতকাল বিকেলে তা বেড়েছে।

রাজধানীর সড়কে কোরবানির পশুবাহী গাড়ির চলাচল বেড়েছে। সাধারণ মানুষ হাট ও বাস-ট্রেন-লঞ্চ টার্মিনালমুখী। টার্মিনাল থেকে নির্বিঘ্নে বাস বেরুলেও ঢাকা পেরিয়ে মহাসড়কগুলোতে যানজটে ভুগতে হচ্ছে। বাসচালকরা জানিয়েছেন, মহাসড়কে নির্মাণকাজ এবং পথে পথে পশুবাহী গাড়ি থামিয়ে চাঁদাবাজির কারণে যানজট হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু সেতুতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৭ হাজার ১৩০টি যানবাহন পারাপার হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের দ্বিগুণ।

রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত বাস র‌্যাপিট ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজ চলছে। এ কারণে গত কয়েক বছর ধরেই দেশের ব্যস্ততম এই সড়ক করিডোরের অবস্থা বেহাল। বর্ষা শুরুর পর দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। গত মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশ আসে সড়কটি যান চলাচল উপযোগী করতে। সড়ক পরিবহন এবং সেতু সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে মেরামতের আশ্বাস দিয়েছিলেন। লকডাউনের ২৩ দিনে গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকলেও মেরামতে অগ্রগতি হয়েছে সামান্যই। ফলে গতকাল গাড়ির চাপ বাড়ার পর যানজটের ভোগান্তি হচ্ছে বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর অংশে। চালকরা জানিয়েছেন, এই ১৫ কিলোমিটার পথ পার হতে চার ঘণ্টা পর্যন্ত লাগছে।

কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শুক্রবার সকাল থেকে চন্দ্রা মোড় থেকে নবীনগর বাইপল এবং চন্দ্রা কোনাবাড়ি পর্যন্ত যানজট ছিল। দিনভরই গাড়ি চলেছে থেমে থেমে। সালনা কোনাবাড়ী হাইওয়ে থানার ওসি মীর মো. গোলাম ফারুক জানান, ঢাকাগামী সব যানবাহন এ যানজটে পড়েছে। লকডাউন তুলে দেওয়া এবং কোরবানির ঈদ থাকায় সড়কে যানবহন বেড়ে গেছে। থেমে থেমে যান চলাচল করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসের চালক ফজল হক বলেন, থেমে থেমে যানজটে পড়ছি। সময় একটু বেশি লাগছে।

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রাপ্ত থেকে শহরের বাইপাস পর্যন্ত সড়কে দিনভর যানজট ছিল। সেতুর পশ্চিম প্রান্তে মাহসড়ক চার লেনে উন্নীত করার নির্মাণকাজ এবং পশুবাহীর গাড়ি চলাচল বাড়ায় এই দুর্ভোগ হচ্ছে।

এলেঙ্গা হাইওয়ে পুলিশের ওসি ইয়াসির আরাফাত বলেন, আগের দিনের চেয়ে যান চলাচল দ্বিগুণ হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পশুবাহী গাড়ি। মাঝেমধ্যেই লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি মহাসড়কে বিকল হচ্ছে। সেগুলো রেকার দিয়ে সরাতে সময় লাগে। ফলে যানজট তৈরি হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড় সিরাজগঞ্জের ঢাকা-টাঙ্গাইল, বগুড়া-নগরবাড়ী ও হাটিকুমরুল-রাজশাহী মহাসড়কে থেমে থেমে যানজট ছিল। যানজট ও তীব্র গরমে দুর্ভোগ হয়েছে যাত্রীদের। হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ওসি শাহজাহান আলী বলেন, সেতুর পশ্চিমপাড়ের কড্ডার মোড়ে মহাসড়কে নির্মাণকাজ এবং নলকা সেতুর কারণে এ যানজট। প্রতিবছরই ঈদের সময় নলকা সেতুর দুই পাড়ে বিড়ম্বনা হয়।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী বাপ্পি আহাম্মেদ বলেন, যানজট নির্মাণকাজের জন্য নয়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অতিরিক্ত যান চলাচলের কারণে যানজট হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু সেতুতে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সেতুর পূর্বপাড়ে ১৬ হাজার ৫৫ এবং পশ্চিমপাড়ে ৩১ হাজার ২৫৫ যানবাহন পারাপার হয়েছে।

আসনের অর্ধেক যাত্রী এবং স্বাভাবিক সময়ের এক-তৃতীয়াংশ আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করায় রেলের যাত্রীরা আগের দিনের মতো গতকালও নির্বিঘ্নে গন্তব্যে গিয়েছেন। কমলাপুর স্টেশনে ভিড় ছিল না। ট্রেনে ওঠানামাতে দুর্ভোগ ছিল না। তবে আগের দিনের মতো গতকালও অনলাইনে ২০ জুলাইয়ের টিকিট পেতে দুর্ভোগ হয়েছে। লোকাল ও মেইল ট্রেনের টিকিট কাউন্টার থেকে দেওয়া হচ্ছে। এসব ট্রেনের যাত্রীদেরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে ধরে টিকিট পাওয়ার দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। লোকাল ও মেইল ট্রেনে স্বাস্থ্যবিধিরও বালাই নেই।

লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শিমুলিয়া ঘাটে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বেড়েছে। লকডাউন উঠে যাওয়ায় লঞ্চ চালু হয়েছে। ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহনে কড়াকড়ি রয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাউসার আহমেদ ও নৌপুলিশ ফাঁড়ির সিরাজুল কবির জানান, অর্ধেক যাত্রী পূর্ণ হলেই লঞ্চ ছাড়া হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার দুটি ফেরি বাড়লেও যানবাহনের চাপ বাড়ায় পারাপারের লাইন লেগেই রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসির উপমহাব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম জানান, ১৩টি ফেরি চললেও শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে পাঁচ শতাধিক পণ্য ও যাত্রীবাহী গাড়ি পদ্মা পারাপারের অপেক্ষায় ছিল।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে উঠতে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ গাড়ির সারি ছিল গতকাল। অপচনশীল পণ্যবাহী গাড়ি আটকে দিয়ে যাত্রী, পশুবাহী ও পচনশীল পণ্যবাহী গাড়ি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার করা হচ্ছে।