বিশ্বে এখন তথ্যপ্রযুক্তির নতুন উপনিবেশ চলছে। কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেম থেকে সার্চ ইঞ্জিন হয়ে আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-কমার্স সবকিছুতে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি, বদলে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির ধারায় আমরা সবাই ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছি। পাশাপাশি দারুণভাবে নিয়ন্ত্রিতও হয়ে পড়েছি।


চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সময়ে এসে চোখের সামনের মাটির পৃথিবীর বাইরে নতুন এক মহাশক্তিধর বিশ্বের জন্ম হয়েছে, যার নাম 'ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড'। এই জগতে আমরা শুধু ব্যবহারকারী। গুগল কিংবা এর মতো সার্চ ইঞ্জিনে যা সার্চ করি, ই-মেইলে যে বার্তা পাঠাই, ফেসবুকে যে পোস্ট দিই- তার কোনো কিছুতেই উন্নয়নশীল কিংবা স্বল্পোন্নত দেশের নিয়ন্ত্রণ নেই। কারণ এই সেবাগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য যে বিনিয়োগ দরকার, সেই সামর্থ্য তৃতীয় বিশ্বের নেই।
বর্তমানে কিবোর্ডে টাইপ করা প্রতিটি শব্দের প্রতি চোখ রাখছে ক্লাউডের নানা লিঙ্কের আড়ালে ভেসে বেড়ানো শত-সহস্র ভার্চুয়াল চোখ। এমন অনেক চোখ হয়তো ভার্চুয়াল জগতে ভ্রমণকে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার কাজেই নিয়োজিত। কিন্তু সরষের মধ্যেও ভূত থাকে। তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় ভূতটি আবিস্কার হয়েছে কয়েকদিন আগে, নাম 'পেগাসাস'। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় ১৬টি সংবাদমাধ্যমের গবেষণা অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে সেই ভয়ংকর দানবের নাম।


এটি সাধারণ 'স্পাইওয়্যার' নয়। কানাডার সিটিজেন ল্যাব জানাচ্ছে, পেগাসাস আসলে ভার্চুয়াল জগতে সম্পূর্ণ একটি স্পাইং সিস্টেম, যেটি নিজস্ব অপারেটর, নেটওয়ার্ক এবং ক্লাউড সিস্টেমের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এটা এতটাই ব্যয়বহুল এবং সংবেদনশীল যে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বাইরে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এটির ব্যবহার সম্ভব নয়। ১৬টি সংবাদমাধ্যমের গবেষণা অনুসন্ধান থেকে বের হয়ে এসেছে, পেগাসাস প্রকৃতপক্ষে ব্যবহৃত হচ্ছে ৪৫টি রাষ্ট্রে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাতেই। তবে যেসব দেশে পেগাসাস ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো সর্বক্ষেত্রে সেই দেশই যে করছে তা নয়, অন্য দেশ থেকেও আর এক দেশের ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ওপর নজর রাখা হচ্ছে পেগাসাসের মাধ্যমে। বিশ্বের ১৪টি দেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধানও পেগাসাসের মায়াজালের ভেতরে আছেন, সেটিও উঠে এসেছে পেগাসাস গবেষণায়।


পেগাসাস মূলত ব্যক্তির স্মার্টফোন দখল করে নেয়। সাধারণভাবে যেসব হ্যাকিং টুলস আছে, সেগুলো সাধারণত গ্যালারি, মেসেজ অ্যাপ, কল কনট্যাক্টস রেকর্ডস চুরি করে। মেসেঞ্জার থেকে অন্যদের অযাচিত মেসেজ পাঠিয়ে বিপদে ফেলে। কিন্তু পেগাসাসের চরিত্র ভিন্ন। অন্যান্য হ্যাকিং টুল একটি ফিশিং লিঙ্ক বা প্যাসেট ফাইলের মাধ্যমে ডিভাইসে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু পেগাসাসের নিজস্ব নেটওয়ার্কের কারণে 'ওটিএ' কিংবা অন দ্য এয়ার প্রযুক্তির মাধ্যমে ফ্ল্যাশ মেসেজ হিসেবেও প্রবেশের ক্ষমতা রাখে। কারও স্মার্টফোনে কোনো ফ্ল্যাশ মেসেজ এলে সেটি ওকে না করা পর্যন্ত স্ট্ক্রিনে আর কোনো কাজ করা যায় না। এ কারণে অন্যান্য হ্যাকিং টুলের মতো পেগাসাসকে উপেক্ষা করা যে কোনো স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর পক্ষে সহজ নয়। এটি একটি স্মার্টফোনে প্রবেশের পর তার মাইক্রোফোন, স্পিকার, ক্যামেরার দখল নিয়ে নেয়। পাশাপাশি গ্যালারি, কনট্যাক্টস, মেসেজের দখল তো নেয়ই ক্যামেরা, স্পিকার এবং মাইক্রোফোনের দখল নেওয়ার কারণে পেগাসাস দখল করা স্মার্টফোনের যে কোনো ধরনের কথোপকথন রেকর্ড করতে পারে। ক্যামেরা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তের ভিডিওচিত্র ধারণ করতে পারে। পাশাপাশি অপারেটিং সিস্টেম দখলে থাকার কারণে স্ট্ক্রিনশটও নিতে পারে। কেউ যদি হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক মেসেঞ্জারের মতো এন্ড টু এন্ড এনক্রিপটেড অ্যাপও ব্যবহার করেন, সেই এনক্রিপশন না ভেঙেও পেগাসাস মাইক্রোফোন ও স্পিকার ব্যবহার করে কথোপকথন রেকর্ড করতে পারে, স্ট্ক্রিনশট নিয়ে মেসেজের সবকিছু দেখে ফেলতে পারে। যেহেতু পেগাসাস একটি স্বতন্ত্র নেটওয়ার্ক, অপারেটিং সিস্টেম এবং ক্লাউড সার্ভিসের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, সে কারণে দখল করা স্মার্টফোনের কল রেকর্ড, ভিডিওসহ সব তথ্য সেই অপারেটরের নেটওয়ার্ক দিয়ে সোজা নিজস্ব ক্লাউড সার্ভারে জমা হচ্ছে। পেগাসাস পরিচালনায় থাকা একাধিক অপারেটর নিজেদের মধ্যে সেই ক্লাউড সার্ভার অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ভাগাভাগি করছে। ফলে যে কোনো মুহূর্তেই দখল করা স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য দুনিয়ার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ারও আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।


মূলত সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং বিরোধী মতের রাজনৈতিক দলকে ঘায়েল করার জন্য কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো পেগাসাসের পেছনে অর্থ ঢেলেছে। কিন্তু তারা সম্ভবত বুঝতে পারেননি, এর মধ্য দিয়ে অপেক্ষাকৃত সবল রাষ্ট্রও তাকে নজদারিতে রাখছে। যতই ক্ষমতাধর রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধান হোন না কেন, যে কোনো মুহূর্তে পেগাসাসের দখলে চলে যাওয়া বিচিত্র কিছুই নয়। বাস্তবেও দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের ১৪ জন রাষ্ট্র এবং সরকারপ্রধান পেগাসাসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন বলে কানাডার সিটিজেন ল্যাবের তথ্য।

এই পেগাসাস তৈরি করেছে ইসরায়েলের কোম্পানি এনএসও গ্রুপ। এর ব্যবহারকারী ৪৫ দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্সও রয়েছে। যদিও চীন নেই। চীন যেহেতু পশ্চিমা দুনিয়ার মোড়লদের প্রতিপক্ষ বিবেচিত হয়, সে কারণেই সম্ভবত চীনকে অংশ করা হয়নি। আরও বড় বিষয় হচ্ছে, এর আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে পশ্চিমা মোড়লরা চীনের তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বারবার তথ্য চুরির অভিযোগ করেছেন। এখন দেখা যাচ্ছে চীন নয়, তথ্য চুরির সবচেয়ে বড় প্রকল্প পশ্চিমাদেরই। হয়তো চীনেরও তথ্য চুরির পৃথক প্রকল্প আছে। কিন্তু চীন তো আর পশ্চিমাদের মতো মুক্তচিন্তায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। ফলে সেখানে কী হয় আমরা জানতে পারি না। পশ্চিমারা অন্যায় করলেও সেটা পশ্চিমা অনেক মাধ্যমই প্রকাশ করতে পারে, চীনে সেটা কেউ পারে না। এখন পশ্চিমাদের দেখাদেখি এর আগে চীন যেমন উইচ্যাট তৈরি করেছে, তেমনি পেগাসাসের আরও একটি বিকল্প নেটওয়ার্ক তৈরি করলেই কেল্লা ফতে।

তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় মোড়ল রাষ্ট্রগুলোর এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বড় হোঁচট খেতেই পারে। কারণ পরিস্থিতি এমন হচ্ছে, যেখানে সাধারণ মানুষ ইন্টারনেট আর স্মার্টফোনের বিপজ্জনক অসভ্যতার হাত থেকে বাঁচতে এগুলোর ব্যবহার একেবারেই বন্ধ করে আবারও 'আনস্মার্ট' জীবনকেই বেছে নিতে পারে। পেগাসাসের মতো বিধ্বংসী স্পাইং নেটওয়ার্কের হাত থেকে বাঁচতে আনস্মার্ট জীবনে ফিরে যাওয়ার বিকল্প একটাই- পেগাসাস জাতীয় প্রকল্প বিলুপ্ত করতে হবে। মোড়ল রাষ্ট্রগুলো কি পারস্পরিক আস্থাহীনতা থেকে বের হয়ে সেই নিরাপদ ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড গড়তে সক্ষম?
 

সাংবাদিক