পদ্মা সেতু শুধু বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীকই নয়, এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি স্থাপনা। পদ্মা সেতু ঘিরে যে ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলার কথা, তার ঘাটতি দেখা গেছে সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায়। চলতি জুলাই মাসেই সেতুর খুঁটিতে তিন দফা ফেরির আঘাত লেগেছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার ফেরি শাহজালালের ধাক্কায় সেতুর ১৭ নম্বর খুঁটির সুরক্ষা বেষ্টনী বা পাইল ক্যাপের এক কোনার পলেস্তারা খসে পড়েছে। এর আগে ২ এবং ১৭ জুলাই দুটি খুঁটিতে ফেরির আঘাত লাগে। এমন অবস্থায় জাতীয় এই সম্পদ রক্ষায় আরও সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন সেতু-সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিরা।

সরেজমিন গতকাল রোববার মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর ৪২টি খুঁটির মধ্যে বসানো হয়েছে ৪১টি। গত শুক্রবার ফেরির ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ১৭ নম্বর খুঁটির অবস্থান মাওয়া প্রান্তের অদূরে মূল পদ্মায়। সেতুর ৬ থেকে ১২ নম্বর খুঁটির নিচ দিয়ে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটের ফেরিগুলো চলাচল করে। একেকটি খুঁটির দূরত্ব ১৫০ মিটার। এই দূরত্বের মাঝ দিয়ে ফেরিগুলো চলাচল করলেও সেখানে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার নেই। পদ্মা সেতু প্রকল্প-সংশ্নিষ্টদেরও প্রশ্ন- নির্ধারিত পথ রেখে ১২ নম্বর খুঁটি থেকে ৭৫০ মিটার দূরে থাকা ১৭ নম্বর খুঁটিতে ফেরিটির ধাক্কা লাগল কীভাবে? বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, সেতুর নিচ দিয়ে ফেরি চালানোর সময় যেসব নির্দেশনা রয়েছে, সেগুলো চালকসহ ফেরি-সংশ্নিষ্টরা মেনে চলছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে কয়েকটি খুঁটি ঘুরে দেখা গেছে, কোনো নৌযান দুর্ঘটনাক্রমে ধাক্কা দিলেও তা সেতুর মূল খুঁটিতে (পিলারে) লাগবে না। কারণ পানি থেকে কিছুটা ওপরে খুঁটির চারপাশে ৫০ ফুটের সুরক্ষা বেষ্টনী বা পাইল ক্যাপ রয়েছে। ষড়?ভুজ আকৃতির এই পাইল ক্যাপে শুক্রবার রো রো ফেরি শাহজালাল সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে পাইল ক্যাপের একটি স্থানের পলেস্তারা উঠে যায়।

বিআইডব্লিউটিসির একটি সূত্র বলেছে, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে যেসব ফেরি চলাচল করছে, তার বেশির ভাগই মান্ধাতা আমলের। ফেরিগুলো পদ্মার তীব্র স্রোত ও ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে পারে না। এ কারণে প্রায়ই ফেরিগুলো মূল পদ্মা পাড়ি দেওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। গত শুক্রবারের দুর্ঘটনা এ কারণেও হতে পারে।

দুর্ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য বিআইডব্লিউটিসির সহ-মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ আলী বলেন, নদীতে স্রোতের গতি, বাতাসের গতি, ফেরির যান্ত্রিক ত্রুটি এবং চালকের অদক্ষতা- তদন্তে এই চারটি বিষয় অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তাছাড়া রো রো ফেরি শাহজালাল চার দশকের পুরোনো। ১৯৮২ সালে ফেরিটি নৌরুটে যুক্ত হয়। এ বিষয়টিও রাখা হয়েছে তদন্তে।

সব ধরনের নিরাপত্তা মান মেনেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে জানিয়ে প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী বলেছেন, গত ২০০ বছরে এ পথে যত নৌযান চলেছে, ভবিষ্যতে যেসব নৌযান চলতে পারে- সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই সেতুর নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি পদ্মা সেতুতে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় ক্ষমতা রাখা হয়েছে। ছোটখাটো নৌ দুর্ঘটনা পদ্মা সেতুর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, প্রতি সেকেন্ডে পদ্মা নদীর স্রোতের গতি ৩ মিটার এবং ঘূর্ণি ৬২ মিটার গভীরে গিয়ে মাটি সরিয়ে দেওয়া, পুরো সেতুভর্তি যানবাহন, সেতুতে দ্রুতগতিতে ট্রেন চলমান- এসব একসঙ্গে হলে এবং এরপর চার হাজার টনের শক্তি দিয়ে খুঁটিতে আঘাত করলেই সেতুর ক্ষতি হতে পারে। শুক্রবার রো রো ফেরি শাহজালালের ধাক্কার ক্ষমতা ছিল এক হাজার টনের কম।

সেতু বিভাগের দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা বলেছেন, সাধারণত নদীতে সেতু তৈরিতে ৭৬ দশমিক ২২ মিটার হরাইজেন্টাল ক্লিয়ারেন্স থাকার কথা, সেখানে পদ্মা সেতুর আছে ১৫০ মিটার। আর ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স ১৮ দশমিক ৩০ মিটারের জায়গায় রয়েছে এর চেয়ে অনেক বেশি। তারপরেও পদ্মা সেতুর খুঁটিতে চলতি জুলাই মাসে তিন দফা তিনটি ফেরি আঘাত করার ঘটনায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- নৌ রুটের ফেরির সমস্যা, চালকদের অদক্ষতা নাকি নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।