বগুড়ার দক্ষিণ কাটনারপাড়ার বাসিন্দা সুমন রায় জ্বর ও সর্দি-কাশিতে ভুগছিলেন। একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ৮ জুলাই তাকে নগরীর মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়। মৃতের বড় ভাই দীপক রায় সমকালকে জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর সুমনের অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৫১-তে নেমে গিয়েছিল। তার ভাইয়ের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কথা চিকিৎসকরা মৌখিকভাবে জানালেও নমুনা পরীক্ষা করা হয়নি। এমনকি মৃত্যুর পরও নমুনা পরীক্ষা করা হয়নি। সুমনের মতো দেশের গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে করোনার উপসর্গ নিয়ে অনেকে মারা যাচ্ছেন।

আবার অনেকে করোনার উপসর্গ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমন হাজার হাজার মানুষের শনাক্ত ও মৃত্যু সরকারি হিসাবে আসছে না। সরকারি পরিসংখ্যানও বলছে, গ্রামে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। দেশে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর রাজধানী ঢাকার বাইরে ১৬ মাসে মোট শনাক্তের ৩৩ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং মৃত্যুর ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ হয়েছে গত এক মাসে। অর্থাৎ মোট শনাক্ত ও মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশ এক মাসে হয়েছে। পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, গ্রামে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস।

গ্রামে করোনার সংক্রমণ বিস্তারের পেছনে উদাসীনতা এবং অসচেতনতাকেই দায়ী করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করেন না। এমনকি তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। ঢাকা কিংবা বিভিন্ন নগরী থেকে গিয়ে আইসোলেশনে না থেকে অনায়াসে পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে মেলামেশা করছেন। আবার করোনার উপসর্গ থাকলেও পরীক্ষা না করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমন অসচেতনতার কারণে গ্রামাঞ্চলে করোনা সংক্রমণে বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনেকে মনে করেন, গ্রামে স্বাস্থ্যবিধি মানতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরীর মতো গ্রামও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। তখন পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার সূত্র ধরে অন্তত পাঁচ জেলার সিভিল সার্জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। এক শতাংশেরও কম মানুষ নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করছেন। হাট-বাজারে ভিড়ের মধ্যে চলছে কেনাকাটা। সামাজিক দূরত্ব একেবারেই মানা হয় না। এর মধ্যে ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরী থেকে যাওয়া ব্যক্তিও অনায়াসে তাদের সংস্পর্শে চলে যাচ্ছেন। করোনা আক্রান্ত অনেকে সাধারণ সর্দি-জ্বর মনে করে নমুনা পরীক্ষাও করান না। এসব কারণে গ্রামে করোনার সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের প্রকল্প বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির (বিপিএ) গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ৮ মার্চ থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে করোনার উপসর্গ নিয়ে ২ হাজার ৯৩৯ জন মারা গেছেন। প্রতিষ্ঠানটি ২৪টি সংবাদমাধ্যমে করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর তালিকা থেকে এই প্রতিবেদন তৈরি করে আসছে। জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর সমকালকে বলেন, গ্রামে সচেতনতার অভাব রয়েছে। রোগীর অবস্থা জটিল হওয়ার পর অনেক সময় হাসপাতালে আনা হয়। এরপর রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানোর পর রোগীর মৃত্যু হয়। রিপোর্ট পাওয়ার আগের মৃত্যুকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু উল্লেখ করে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন দিয়ে থাকে। আবার অন্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হলেও সেটিকে করোনায় উপসর্গ বলে চালানো হয়।

উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের সবাই করোনা সংক্রমিত ছিলেন- এমনটি বলা সঠিক হবে না বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। তিনি সমকালকে বলেন, মৃত ব্যক্তিদের কেউ করোনায় সংক্রমিত হতে পারেন, আবার কেউ নাও হতে পারেন। পরীক্ষা না করে কেউ এটি বলতে পারেন না। তবে গ্রামে নমুনা পরীক্ষা কম হয়। একই সঙ্গে মানুষের এ বিষয়ে আগ্রহও কম। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে মহাপরিচালক বলেন, ঈদের পর রাজধানীর তিনটি হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে দশজন রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, তাদের আটজনই গ্রামের। ঈদ উপলক্ষে গ্রামের বাড়ি গিয়েও মানুষের জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ করেছি। করোনার উপসর্গ থাকলেও অধিকাংশ মানুষ নমুনা পরীক্ষা করাতে অনাগ্রহী। স্বাস্থ্যবিধিও মানতে চান না। অথচ স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে। সচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে প্রচার ও প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু মানুষ সেটি আমলে নিচ্ছে না।

গ্রামে মোট শনাক্ত ও মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশই এক মাসে :গত ২৫ জুন থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত এক মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২৫ জুন পর্যন্ত ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় রোগী ছিল ১২ হাজার ৫৭৭ জন এবং মারা যান ২৯৬ জন। আর ২৪ জুলাই রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৬ জন এবং মৃত্যু ৪৮৪ জনে। মাত্র এক মাসে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৯ হাজার ৪২৯ জন এবং মারা গেছেন ১৮৮ জন।

একই সময়ে চট্টগ্রামের ১১ জেলায় রোগী ছিল এক লাখ ১৩ হাজার ১৯৪ জন এবং মারা গেছেন দুই হাজার ৬৫০ জন। ২৪ জুলাই রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫৮ হাজার ৪৪২ জন এবং মৃত্যু তিন হাজার ৪৭২ জন। অর্থাৎ গত এক মাসে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৪৫ হাজার ২৪৮ জন এবং মারা গেছেন ৮২২ জন।

২৫ জুন পর্যন্ত রাজশাহীতে রোগী ছিল ৫১ হাজার ২৫৮ জন এবং মারা গেছেন ৯৫২ জন। ২৪ জুলাই রোগী বেড়ে ৭৬ হাজার ৯৯২ জন এবং মৃত্যু বেড়ে এক হাজার ৪৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক মাসে রোগী শনাক্ত হয়েছে ২৫ হাজার ৭৩৪ জন এবং মারা গেছেন ৫১২ জন।

২৫ জুন পর্যন্ত রংপুরে রোগী ছিল ২৩ হাজার ৮২১ জন এবং মারা গেছেন ৫৬৫ জন। ২৪ জুলাই রোগী বেড়ে ৩৯ হাজার ১৬৯ জনে এবং মৃত্যু বেড়ে ৯৩০ জনে পৌঁছায়। এক মাসে রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৩৪৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৩৬৫ জনের।

২৫ জুন পর্যন্ত খুলনায় রোগী ছিল ৪৯ হাজার ৯৪৯ জন এবং মারা গেছেন এক হাজার ১১৪ জন। ২৪ জুলাই রোগী বেড়ে ৮৫ হাজার ৬১৬ জনে এবং মৃত্যু বেড়ে দুই হাজার ৪৬৫ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ এক মাসে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩৫ হাজার ৬৬৭ জন এবং মারা গেছেন এক হাজার ৩৫১ জন।

২৫ জুন পর্যন্ত বরিশালে রোগী ছিল ১৬ হাজার ৮৩৫ জন এবং মারা গেছেন ৪১৩ জন। ২৪ জুলাই রোগী বেড়ে ২৮ হাজার ১৮৬ জনে এবং মৃত্যু বেড়ে ৫৮১ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ এক মাসে রোগী শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৩৫১ জন এবং মারা গেছেন ১৬৮ জন।

২৫ জুন পর্যন্ত সিলেটে রোগী ছিল ২৪ হাজার ৩২১ জন এবং মারা গেছেন ৫১৪ জন। ২৪ জুলাই রোগী বেড়ে ৩৪ হাজার ৭২০ জনে এবং মৃত্যু বেড়ে ৬৭২ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ এক মাসে রোগী শনাক্ত হয়েছে ১০ হাজার ৩৯৯ জন এবং মারা গেছেন ১৫৮ জন।

একইভাবে ২৫ জুন রাজধানী ছাড়া ঢাকা বিভাগের ১২ জেলায় রোগী ছিল ৭৭ হাজার ৫৯৬ জন এবং মারা গেছেন দুই হাজার ৩৬ জন। ২৪ জুলাই রোগী বেড়ে এক লাখ ১২ হাজার ৩৫৯ জনে এবং মৃত্যু বেড়ে দুই হাজার ৮১০ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ এক মাসে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩৪ হাজার ৭৬৩ জন এবং মারা গেছেন ৭৭৪ জন।

রাজধানী ঢাকা ছাড়া সারাদেশে ২৫ জুন পর্যন্ত রোগী ছিল তিন লাখ ৬৯ হাজার ৫৫১ জন এবং মারা গেছেন আট হাজার ৫৪০ জন। ২৪ জুলাই রোগী বেড়ে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ৪৯০ জনে এবং মৃত্যু বেড়ে ১২ হাজার ৮৭৮ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ এক মাসে সারাদেশে রোগী শনাক্ত হয়েছে এক লাখ ৮৭ হাজার ৯৩৯ জন এবং মারা গেছেন চার হাজার ৩৩৮ জন।

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এ হিসাবে দেশে করোনা সংক্রমণের ১৬ মাস চলছে। এর মধ্যে গত ১৫ মাসে ঢাকার বাইরে যতসংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে তার মধ্যে ৩৩ দশমিক ৭২ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়েছে সর্বশেষ এক মাসে। একই সময়ে মারা গেছেন প্রায় সমসংখ্যক ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ শনাক্ত ও মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশ গত এক মাসে ঘটেছে।

'গ্রামে স্বাস্থ্যবিধি মানতে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন' :গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাজধানীসহ বিভিন্ন নগরীতে মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উদাসীনতা রয়েছে। তবে বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে সেটি কিছুটা কমে এসেছে। কিন্তু গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে শতভাগ মানুষ এ বিষয়ে উদাসীন। এ বিষয়ে কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট গ্রামেও পরিচালনা করতে হবে। এ ছাড়া সরকার গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত যে কমিটি গঠন করেছে, সেই কমিটিকে কাজে লাগাতে হবে। মাস্ক ব্যবহার না করলে তাকে শাস্তি ও জরিমানা করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, অসচেতনতায় গ্রামেও করোনার সংক্রমণ ছড়িয়েছে। এখন নগরীর মতো গ্রামেও প্রায় সমান হারে রোগী শনাক্ত হচ্ছে, বাড়ছে মৃত্যুও। এজন্য অসচেতনতা ও অসতর্কতা দায়ী। কারণ মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে গ্রামে উদাসীনতা শুরু থেকেই ছিল। সংক্রমণ বৃদ্ধির পরও তা বন্ধ হয়নি। সরকারকে দ্রুততম সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গ্রামে সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করলে চরম বিপর্যয়ে পড়তে হবে। সুতরাং স্বাস্থ্যবিধি মানতে কঠোর হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও মাস্ক ব্যবহারে সারাদেশেই উদাসীনতা রয়েছে। তবে গ্রামে এ প্রবণতা অনেকগুণ বেশি। শহরাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে জরিমানা ও শাস্তির আওতায় আনা হয়; কিন্তু গ্রামে সেটি সম্ভব হয়নি। তবে সারাদেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে যে সুরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেটি সক্রিয় করে গ্রামে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও মাস্ক ব্যবহারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সবার প্রতি আবারও আহ্বান থাকবে, মাস্ক ব্যবহার করুন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষিত রাখুন।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সমকালের বগুড়া ব্যুরো প্রধান মোহন আকন্দ)