শুক্রবার রাতে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের কোভিড ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গণসঙ্গীতশিল্পী ফকির আলমগীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উপলক্ষে ৭ জুলাই সমকাল মুদ্রণ সংস্করণে তার এ লেখাটি ছাপা হয়। সমকাল পাঠকদের জন্য লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো।

দেশ বিভাগের পর থেকে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রশ্নে যে সংঘাত দেখা দেয় এবং তা থেকে যে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সৃষ্টি, তার মধ্যেই বাংলাদেশ আন্দোলনের বীজ সুপ্ত ছিল। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের জন্য সূচিত আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এ অঞ্চলের মানুষ স্বদেশকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। যে স্বদেশ আর মাতৃভূমির নাম বাংলাদেশ। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা অংশত প্রগতিশীল ভাবধারায় প্রভাবিত ছিলেন। অসাম্প্রদায়িক ও আন্তর্জাতিক চেতনাবোধ এ আন্দোলনের বড় উপাদান।

যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এ দেশের শিল্পী-সাহিত্যিকদের উতলা করে তোলে। সৃষ্টি হয় নতুন দায়িত্ববোধ। ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনে অগ্রসর হন শিল্পী-সাহিত্যিকরা। শুরু হয় চল্লিশ দশকে সংঘবদ্ধ সমাজ-সচেতন সাংস্কৃতিক আন্দোলন। বিভাগউত্তর পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক আন্দোলন এই প্রগতিশীল আন্দোলনেরই উত্তরাধিকার। এ ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্রছাত্রীরা গঠন করেন 'সংস্কৃতি সংসদ'। এ সংসদ গঠনে অনুপ্রেরণা জোগান অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও খান সারওয়ার মুরশিদ। সংস্কৃতি সংসদ ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের আগে-পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীল সংস্কৃতি চেতনা সৃষ্টিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৫১ সালে মঞ্চস্থ 'জবানবন্দি' নাটকের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি সংসদই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সহঅভিনয় প্রথার প্রচলন করে।

৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ করে শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল। একুশে ফেব্রুয়ারিতে মাতৃভাষার জন্য প্রাণদান আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সবচেয়ে প্রবল ও গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। একুশের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অজিত কুমার গুহ, মোজাফ্‌ফর আহমদ চৌধুরী এবং পুলিন দে'কে ২৬ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয়। মুনীর চৌধুরী একুশের শহীদদের নিয়ে কারাগারে বসেই রচনা করেন তার বিখ্যাত নাটিকা 'কবর'। হাসান হাফিজুর রহমানের 'একুশে ফেব্রুয়ারী' এবং আলাউদ্দিন আল আজাদের 'স্মৃতির মিনার' একুশের ওপর রচিত উল্লেখযোগ্য কবিতা। গানের মধ্যে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখা 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' এবং আবদুল লতিফের 'ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়' ১৯৫৩ সালের একুশে রচিত। তাই একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের শিল্প-সাহিত্য তথ্য সামগ্রিক সাংস্কৃতিক চেতনা পর্বের সবচেয়ে বড় ঘটনা।

পূর্ববঙ্গের ছাত্র সমাজ ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর পড়ালেখার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম বিশেষ করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুরু করে। তৎকালীন ঢাকা হল ও জগন্নাথ হল ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ১৯২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হয়। এর পর থেকে ওই দুটি হলেই নিয়মিতভাবে সাংস্কৃতিক চর্চা লক্ষ্য করা যায়। প্রথমদিকে মুসলিম হলে কোনো নাটক করা সম্ভব হয়নি। তবে পরবর্তী পর্যায়ে হল ইউনিয়নের উদ্যোগে পূর্ণাঙ্গ নাটক মঞ্চস্থ হলেও নাটকের নারী চরিত্রে পুরুষরাই অভিনয় করেছিল। তৎকালীন ইংরেজ উপাচার্য ড. ডব্লিউ জেনকিংসের অনুমোদন নিয়ে ১৯৫৪-৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী চরিত্রে নারীদের অভিনয় শুরু হয়। সংস্কৃতিচর্চায় ওই সময় সংস্কৃতি সংসদের ভূমিকা ছিল অসামান্য।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সংগীতচর্চায় মূলত মুসলমান ছাত্রীদের আগমন লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ১৯৪৯-পরবর্তী সময়ে লায়লা আরজুমান্দ বানু, হুসনা বানু খানম, মালেকা আজিম খান, ফরিদা বারি মালিক, খালেদা ফ্যান্সি খানম (মঞ্জুরে খোদা), নীরু শামসুন্নাহার, বিলকিছ নাসিরুদ্দিন, মাহবুব আরা, জাহানারা লাইজু, সন্‌জীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন ও আখতার জাহান। পঞ্চাশের দশকে ফেরদৌসী রহমান, আঞ্জুমান আরা বেগম, নাজমুন্নাহার ফওজিয়া খান, রওশন আরা মাসুদ, রওশন আরা মুস্তাফিজ, রেবেকা সুলতানা, জিনাত রেহানা, শামীমা বেগম ও কাজী সুরাইয়া। মধ্য পঞ্চাশে আধুনিক গানের ক্ষেত্রে আবু বকর খানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। এ ছাড়া মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, খান আতা, নাজমুল হুদা সংগীত রচনা ও চর্চায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এর পর ষাটের দশকে নাসরীন শামসু, নীলুফার ইয়াসমীন, শবনম মুস্তারী ও সাবিহা মাহবুব। ষাট থেকে সত্তরের দশকে টিএসসি মিলনায়তন ও হল মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে এবং হলগুলো নিজস্ব উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা ও নাটক মঞ্চস্থ করত।

পঞ্চাশের দশকে আবৃত্তিচর্চায় ছাত্রীদের মধ্যে ছিলেন নাজমা চৌধুরী, সালমা চৌধুরী; ষাটের দশকে সৈয়দা ফিরোজা বেগম, সত্তর-পরবর্তী সময়ে প্রজ্ঞা লাবণী। স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ঢাকা নিয়ে আসার পর জাতীয় পর্যায়ে উদযাপিত নজরুলজয়ন্তী অনুষ্ঠানে কবিপুত্র কাজী সব্যসাচীর সঙ্গে দ্বৈত আবৃত্তি করেন অধ্যাপক সৈয়দা ফিরোজা বেগম।

১৯৩৩ সালে এসএম হলে ছাত্রদের উদ্যোগে 'মহুয়া' নাটকে মহুয়া চরিত্রে প্রথম নাচ সংযোজিত হয়েছিল। নৃত্য পরিচালনা করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সাধনা সেন। পঞ্চাশ দশক-পরবর্তী সময়ে নৃত্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই সময় থেকে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত নৃত্যচর্চা করছেন তারা হলেন- খালেদা বানু শারমীন, নীলু, জিন্নাত বরকতউল্লাহ, লায়লা হাসান ও তুলি। আশির দশকে সোহেল আহমদ, আসমা খানম এ্যানী, নাসরীন জাহান খান উল্ক্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত নৃত্যচর্চা করতেন। ১৯৯৭ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক দল তুরস্কের ইস্তাম্বুলে 'গোল্ডেন হর্ন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ ফোক ড্যান্স ফেস্টিভ্যাল' প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। দলটি বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যদলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পঞ্চম স্থান অধিকারসহ নৃত্যের পোশাকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার লাভ করে।