আওয়ামী লীগ থেকে পদ হারানো বহুল আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী নেত্রী হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা হচ্ছে। শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানিয়েছেন, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং টেলিযোগাযোগ আইনে মামলাগুলো দায়ের করা হবে।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। রাত ৮টা থেকে হেলেনার গুলশানের বাসায় অভিযান শুরু হয়। সেই অভিযান চলে রাত সোয়া ১২টা পর্যন্ত। এরপর তাকে আটক করে নিয়ে যান র‌্যাব সদস্যরা। অভিযানে তার বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ, ক্যাসিনো খেলার সরঞ্জাম, ওয়াকিটকি, বিদেশি চাকু এবং হরিণ ও ক্যাঙারুর চামড়া জব্দ করা হয় বলে জানায় র‌্যাব।

দেশের করোনা সংকটের মধ্যেও হেলেনা জাহাঙ্গীরই এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। ব্যবসায়িক ও হালে রাজনৈতিক অঙ্গণের এক রহস্যময় চরিত্র হেলেনা জাহাঙ্গীরের কেন এমন পরিণতি হল, সেটাও এ মৃর্হূতে তুমুল আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কল্যাণে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও প্রবাসীদের মাঝে এটি আলোচিত ইস্যু।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামে ভুঁইফোড় একটি সংগঠনের সভাপতি হিসেবে নাম আসার পর থেকেই এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক ও জয়যাত্রা গ্রুপের কর্ণধার হেলেনা জাহাঙ্গীর বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসেন। গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে গড়ে তোলা ভুঁইফোড় ওই সংগঠনের সভাপতি হিসেবে হেলেনা জাহাঙ্গীর এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মাহবুব মনিরের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে এ সংগঠনে জেলা-উপজেলা ও বিদেশ শাখায় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্টারও ছাপা হয়।

ভুঁইফোড় এ সংগঠনের কথা চাউর হওয়ার পরই মূলত নড়েচড়ে বসেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধাকরা। গত ২৫ জুলাই দলীয় প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় হেলেনা জাহাঙ্গীরকে। আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য সচিব মেহের আফরোজ চুমকি স্বাক্ষরিত ওই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সংগঠনের নীতিবহির্ভুত হওয়ার কারণে দলের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য পদ থেকে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এর আগে নানা অভিযোগে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগও তাদের কমিটিতে উপদেষ্টা পদে থাকা হেলেনা জাহাঙ্গীরকে অব্যাহতি দিয়েছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ম. রুহুল আমিন বলেছেন, হেলেনা জাহাঙ্গীরকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গত ১৮ জুন এ সংক্রান্ত চিঠি ডাকযোগে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরেও পাঠানো হয়।

জানা যায়, দলের পদ হারানোর পরও হেলেনা জাহাঙ্গীরের দম্ভ ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ থেমে ছিল না। বিভিন্ন টেলিভিশনের টকশো, ফেসবুক লাইভ এবং নিজের প্রতিষ্ঠিত আইপি টেলিভিশন ‘জয়যাত্রার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এবং সরকারের মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের বিরুদ্ধে অনেকটা প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি উল্টাপাল্টা কথাবার্তা, কান্নাকাটির অভিনয়সহ নানা নাটকীয় আচরণ করে আসছিলেন তিনি। তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- এমন আশঙ্কাও ব্যক্ত করে আসছিলেন তিনি। এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ নেতারা তাকে এড়িয়ে চলছেন, এমন অভিযোগও তোলেন তিনি। এক্ষেত্রে ফেসবুক কমেন্টে হাজার হাজার ব্যক্তি তার এমন অদ্ভূত আচরণকে ‘মানসিক অসুস্থতা’ আখ্যা দিয়ে নানা ধরনের কটূক্তি এবং তার বিরুদ্ধে প্রতারণার নানা অভিযোগ আনলেও মোটেই পাত্তা দেননি তিনি। বৃহস্পতিবার র‌্যাবের হাতে আটকের পরও তার হাত নাড়ানো ও হাস্যোজ্জ্বল থাকাকেও ‘পাগলামি’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

অবশ্য এর আগে থেকেই হেলেনা জাহাঙ্গীরের ‘আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া কোনো মন্ত্রীকেও গুনি না’ এমন একটি বিতর্কিত বক্তব্যের ভিডিও ফেসবুকে ভাসছিল। এছাড়া ‘বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ এর পোস্টার প্রকাশের পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সঙ্গে হেলেনা জাহাঙ্গীরের পুরনো দুটি ছবিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় পার্টি ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল বলেও শোনা যায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর হঠাৎ-ই আওয়ামী লীগার বনে যান তিনি। যদিও এরশাদ-খালেদা জিয়ার সঙ্গে তোলা ছবি প্রকাশের পর হেলেনা জাহাঙ্গীর এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছিলেন, ‘খালেদা জিয়া ও অন্যান্যদের সঙ্গে আমার যে ছবিগুলো ভাইরাল হচ্ছে, সেগুলো একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে তোলা এবং ছবিগুলা আমি নিজেই ফেসবুকে দিয়েছিলাম।’

এরশাদ ও খালেদা জিয়ার বাইরেও আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও নেতাদের সঙ্গে হেলেনা জাহাঙ্গীরের তোলা ছবি প্রায়ই ফেসবুকে দেখা গেছে, যেগুলো তিনি নিজেই পোস্ট করে ‘রাজনৈতিক সুবিধা’ নেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আর নিজেকে ‘সিস্টার হেলেনা’ পরিচয় দিয়ে অসহায় মানুষকে কথিত মানবিক সাহায্য-সহযোগিতার প্রচার-প্রচারণাও চালিয়ে আসছিলেন তিনি। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচিত ও বিতর্কিত সেফায়েতুল্লাহ সেফু ওরফে সেফুদার সঙ্গেও তার কথোপকথনের একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

শুক্রবার র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, হেলেনা জাহাঙ্গীর জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে নানা প্রতারণা ও অপরাধের পাশাপাশি তার মালিকানাধীন জয়যাত্রা টেলিভিশন ও বিভিন্ন মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সংস্থার বিরুদ্ধে নানা কুৎসা রটিয়ে আসছিলেন। র‌্যাবের অভিযানকালে জয়যাত্রা টেলিভিশনের সরকারি অনুমোদনের কোনো প্রমাণ মেলেনি। আর কথিত এ টিভিতে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগের নামে সারাদেশের বেশ কিছু ব্যক্তির কাছ থেকে কী পরিমাণ অর্থ-বাণিজ্য করা হয়েছে- সেটারও অনুসন্ধান চলছে। জয়যাত্রা গ্রুপের কর্ণধার হেলেনা জাহাঙ্গীর নিজেকে আইপি টিভি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হিসেবেও পরিচয় দিয়ে আসছিলেন।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে হেলেনা কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন। আবার মাস কয়েক আগে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্যপদও বাগিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। যদিও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে দুটি পদই হারিয়েছেন গ্রেপ্তারের আগেই। তাকে দলের পদে আনার ক্ষেত্রে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ও মন্ত্রী সুপারিশ করেছিলেন বলে গুঞ্জন উঠেছে।

চলতি বছর সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু মারা গেলে ওই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের জন্য তৎপরতা চালিয়ে ব্যর্থ হন হেলেনা। এর আগে ২০১৫ সালে তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে আনিসুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার ঘোষণা দেন। পরে তিনি নিজেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

রাজনীতি ছাড়াও বেশকিছু সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক সংগঠনের সঙ্গে হেলেনার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি গুলশান ক্লাব, গুলশান নর্থ ক্লাব, বারিধারা ক্লাব, কুমিল্লা ক্লাব, গলফ ক্লাব, গুলশান অল কমিউনিটি ক্লাব, বিজিএমইএ অ্যাপারেল ক্লাব, বোট ক্লাব, গুলশান লেডিস ক্লাব, উত্তরা লেডিস ক্লাব, গুলশান ক্যাপিটাল ক্লাব, গুলশান সোসাইটি, বনানী সোসাইটি, গুলশান জগার্স সোসাইটি ও গুলশান হেলথ ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত। হেলেনা জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় বেশকিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানেরও মালিক। এরমধ্যে প্রিন্টিং, এমব্রয়ডারি, প্যাকেজিং, স্টিকার ও ওভেন গার্মেন্ট রয়েছে।

হেলেনা জাহাঙ্গীর গ্রেপ্তার

গ্রেপ্তার হয়েছেন হেলেনা জাহাঙ্গীর

Posted by Samakal on Thursday, July 29, 2021