নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জট কমাতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার নেওয়া হচ্ছে বেসরকারি ১৯ ডিপোতে। গত সোমবার থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত পাঁচ দিনে ১৫ জাহাজে থাকা প্রায় ছয় হাজার কনটেইনার ডিপোতে পাঠানো হয়েছে। এর পরও কমানো যাচ্ছে না জট। এখনও বন্দরের জেটিতে আছে ২০ ফুট দীর্ঘ ৪২ হাজার ৫৮৫টি কনটেইনার। সাত কারণে বন্দরে এ সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে মনে করছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। আমদানি-রপ্তানি পণ্য ক্রমে বাড়লেও বন্দরে নেই বাড়তি কনটেইনার রাখার জায়গা, নেই পর্যাপ্ত স্ক্যানার। আবার বেসরকারি ১৯টি কনটেইনার ডিপোতে নেই পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, সুরক্ষিত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও দক্ষ জনবল। এসব বাধা দূর না হলে সংকট দীর্ঘায়িত হবে। আবার পণ্য পরিবহন ব্যয়ও তিন গুণ বাড়বে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

আগে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৩৮ ধরনের আমদানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার বেসরকারি ডিপোতে নিয়ে খালাস করা হতো। কিন্তু জট বেড়ে যাওয়ায় চলতি সপ্তাহ থেকে সব ধরনের আমদানি কনটেইনার ডিপোতে নিয়ে খালাস করার অনুমতি দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এ জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় ৩১ আগস্ট।

বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার কনটেইনার নেওয়া যাবে ১৯টি ডিপোতে। এর পর কী হবে তা নিয়ে ভাবতে হবে বন্দর কর্তৃপক্ষকে। কারখানা খোলা থাকলে পণ্য খালাস করতে আমাদের কোনো অসুবিধা হতো না। তার পরও আমরা খালাসের পরিমাণ আগের তুলনায় বাড়িয়েছি। কিন্তু ডিপো থেকে পণ্য খালাস করতে হলে আমাদের যে তিন গুণ বাড়তি খরচ গুনতে হয়, তার কী হবে?

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ডিপোতে কনটেইনার খালাস করার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও জনবল নেই। সেখানে নিরাপত্তারও সংকট রয়েছে। বন্দরের বিকল্প হিসেবে যদি ডিপোকে চিন্তা করা হয়, তাহলে সেটির সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। বন্দরে স্ক্যানারেরও সংকট রয়েছে। মাত্র সাতটি স্ক্যানার দিয়ে চলছে কার্যক্রম।

চট্টগ্রামের ১৯টি ডিপোতে কনটেইনার ধারণক্ষমতা আছে ৭৮ হাজার ৭০০ টিইইউএস (প্রতিটি ২০ ফুট দীর্ঘ)। শুক্রবার পর্যন্ত ডিপোতে কনটেইনার আছে ৫৭ হাজার ২৯০টি। তবে নতুন করে কনটেইনার স্থানান্তর করা যাবে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার। কারণ আমদানি ও রপ্তানি পণ্য ওঠানামার সুবিধার্থে ডিপোতে কিছু জায়গা খালি রাখতে হবে। তা না হলে রপ্তানি পণ্য প্রক্রিয়াজাত করতে সমস্যা তৈরি হবে। ১৯ ডিপোর হিসাব অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত ৩১ হাজার ৭১৯ টিইইউএস খালি কনটেইনার, ১১ হাজার ১৩৩ টিইইউএস রপ্তানি কনটেইনার ও ১৪ হাজার ৪৩৮ টিইইউএস আমদানি কনটেইনার ছিল তাদের কাছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম সমকালকে জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ গত সপ্তাহের পাঁচ দিনে ১৫ জাহাজে থাকা প্রায় ছয় হাজার টিইইউএস কনটেইনার পাঠিয়েছে ডিপোতে। বন্দর থেকে পণ্য খালাসের পরিমাণও আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু যে হারে আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ বাড়ছে, সে হারে বাড়ছে না খালাসের পরিমাণ। তাই ডিপোতে কনটেইনার পাঠিয়েও ৪০ হাজারের নিচে নামানো যাচ্ছে না কনটেইনারের জট।

সর্বশেষ ছয় মাসের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রাম বন্দরে রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ বেড়েছে কয়েক গুণ বেশি। ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ছয় লাখ ৭২ হাজার টিইইউএস কনটেইনার পণ্য রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এটি ছিল ছয় লাখ ৩৩ হাজার টিইইউএস। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি হয়েছে সাত লাখ ১৫ হাজার টিইইউএস কনটেইনার। চলতি মাসের সর্বশেষ দুই মাসের হিসাব টানলেও পাওয়া যাচ্ছে রপ্তানির ঊর্ধ্বগতি। জুন মাসের প্রথম ২৫ দিন চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৪৪ হাজার ৪৭৬ টিইইউএস রপ্তানি কনটেইনার গেলেও জুলাই মাসের প্রথম ২৫ দিনে পণ্যভর্তি কনটেইনার গেছে ৫৮ হাজার ২৬৩ টিইইউএস। লকডাউনের কারণে বর্ধিত এ রপ্তানি পণ্য সে হারে খালাস না হওয়ায় জট তৈরি হয়েছে কনটেইনারের।

রপ্তানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, বন্দরে জেটির পরিমাণ বাড়াতে হবে। স্ক্যানারের সংখ্যাও করতে হবে দ্বিগুণ। তা না হলে সব ধরনের আমদানি পণ্য স্ক্যানিং করে ডিপোতে নেওয়ার যে শর্ত দেওয়া হচ্ছে, তা হোঁচট খাবে। ডিপোগুলোতে কনটেইনার হ্যান্ডেল করার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবল নেই। সেখানে পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। তাই পণ্য খালাস করতে সেখানে খরচের পরিমাণ বেড়ে যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান বলেন, পৃথিবীর ভালো কোনো বন্দরে আমাদের মতো পণ্য খালাসের সুযোগ নেই। এখানে বন্দরকে গুদাম বানিয়ে রাখেন কিছু ব্যবসায়ী। এ প্রবণতা দূর করতে হবে। পণ্য আসার সঙ্গে সঙ্গে তা খালাস করার চেষ্টা করতে হবে ব্যবসায়ীদের। ডিপোতে কনটেইনার স্থানান্তর করে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাব না আমরা। কারণ বেসরকারি ডিপোগুলোরও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।