ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে ভূমিকা আছে পুনর্বাসন পেশাজীবীর

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে ভূমিকা আছে পুনর্বাসন পেশাজীবীর

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস উপলক্ষে শনিবার রাজধানীর মিরপুরের সিআরপিতে গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:৪৭ | আপডেট: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১৩:৪০

পুনর্বাসন পেশাজীবীদের সাহায্য ও সহযোগিতাই পারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়ন করতে। অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পিচথেরাপিস্টসহ সংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই তাদের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব। উন্নত সেবা পেলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আবারও কর্মক্ষেত্রে ফিরতে পারেন। সেই সঙ্গে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করতে পারেন তারা।

গতকাল শনিবার ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নে পুনর্বাসন পেশাজীবীদের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস উপলক্ষে রাজধানীর মিরপুরের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রের (সিআরপি) কনফারেন্স রুমে এই বৈঠক হয়। উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ), সিআরপি ও বাংলাদেশ সিবিএম গ্লোবাল ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুশন যৌথভাবে বৈঠকের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন ডব্লিউডিডিএফের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সিবিএম গ্লোবাল ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুশনের প্রোগ্রাম অফিসার তারিকুল ইসলাম সজীব।

প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু সালেহ্ মোস্তফা কামাল। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শহিদুল ইসলাম শোভন। আরও বক্তব্য দেন সিআরপির অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ অকুপেশনাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশন (বিওটিএ) সভাপতি শেখ মনিরুজ্জামান, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক রকনুল হক, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (এসসিআইডিএবি) সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সিবিএম গ্লোবাল ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুশনের হিউম্যানিটেরিয়ান ম্যানেজার রিপন চক্রবর্তী, সিআরপি মিরপুর সেন্টারের ম্যানেজার মোরশেদুর কাদের রিপন, সিআরপির ফিজিওথেরাপি বিভাগের প্রধান ও বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি ড. আনোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদৎ হোসেন, সোসাইটি অব স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টসের সভাপতি ফিদা আল-শামস, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) ফিজিক্যাল রিহ্যাবিলিটেশন ম্যানেজার সুভাষ সিনহা, সিডাপের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সিআরপির প্রজেক্ট ম্যানেজার রহমতুল বারী।

মূল প্রবন্ধে তারিকুল ইসলাম সজীব বলেন, প্রতিবছর প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, বিশ্বে মোট জনগোষ্ঠীর ১৬ শতাংশ প্রতিবন্ধী, যা গত বছরও ছিল ১৫ শতাংশ। বিশ্বে ২ থেকে ৫ লাখ মানুষ স্পাইনাল কর্ডজনিত সমস্যার কারণে প্রতিবন্ধিতার শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীর হার মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। এই তথ্য দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, আমাদের এখানে কোনো না কোনো শূন্যতা রয়েছে, যেটা নিয়ে কাজ করার বড় সুযোগ আছে। প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে পুনর্বাসন সেবার মান বাড়াতে হবে। বেসরকারির পাশাপাশি সরকারিভাবেও এই সেবার মান বাড়াতে কাজ করতে হবে। এজন্য অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, ফিজিও থেরাপিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্টদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আইন অনুযায়ী যে শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে, সেই যোগ্যতা দেখে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করতে হবে। ভুয়া লোক যাতে এই পেশায় না আসতে পারে, সে জন্য তদারকি বাড়াতে হবে এবং আইনের আওতায় এনে এদের বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।

তারিকুল ইসলাম বলেন, এই পেশার মানুষের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থায়ী রাজস্ব খাতে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। অভিন্ন শিক্ষা কাঠামো তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া মূলধারার স্বাস্থ্যসেবায় সঙ্গে আমাদের পেশার লোকদের যুক্ত করতে পারলে অনেক অপচিকিৎসা থেকে মানুষ রক্ষা পাবে। আমাদের বেশ কিছু সুপারিশ রয়েছে। এটি এরই মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দিয়েছি। আমাদের দাবি, সুপারিশগুলো যাতে আগামী পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সিডাপের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিবন্ধীদের জীবন পরিবর্তনে পুনর্বাসন কেন্দ্র অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। পুনর্বাসন পেশাজীবীদের সহযোগিতায় আমি নতুন করে কর্মজীবনে ফিরেছি। নতুন করে কাজের স্বপ্ন দেখতে পেরেছি।

শেখ মনিরুজ্জামান বলেন, রাজধানীতে বিশেষায়িত ১৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে অকুপেশনাল থেরাপি কোর্স চালু করতে পারলে আগামী দিনে প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে বড় ভূমিকা রাখবে এসব প্রতিষ্ঠান। এই কোর্স থেকে পড়াশোনা করে বিভিন্ন দেশে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে পুনর্বাসন পেশাজীবীদের পদ সৃষ্টি করতে হবে।
বিপিএ সভাপতি ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশে ১০ শতাংশের বেশি প্রতিবন্ধী রয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের সেবাকে অবহেলার চোখে দেখছে। আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় প্রতিবন্ধীদের সুচিকিৎসার কথা বলা হয়েছে। তবে দেশে দুই কোটির বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যথাযথ সেবা পাচ্ছে না। প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসার দায় কি শুধু সিআরপির? সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে বিভিন্ন খাতে, কিন্তু প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসায় কোনো অর্থ রবাদ্দ মিলছে না। তাদের সুচিকিৎসার কোনো প্রতিনিধি নেই। আমরা চাই, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাক।

ফিদা আল-শামস বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে তিনজনের একজনকে জীবনের কোনো না কোনো সময় পুনর্বাসন সেবা গ্রহণ করতে হবে। পুনর্বাসন সেবা এখন মানুষের মৌলিক অধিকারে পরিণত হয়েছে। এখন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের এই সেবা নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে এবং নতুন করে পদ সৃষ্টি করতে হবে।
মোরশেদুর কাদের রিপন বলেন, পুনর্বাসন সেবা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারলে প্রতিবন্ধীদের স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়বে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সমাজসেবা বিভাগকে এদিকে নজর দিতে হবে। প্রতিবন্ধীদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আরও সমন্বয় জরুরি।

সুভাষ সিনহা বলেন, স্বাভাবিক জীবনে কোনো না কোনো সময় পুনর্বাসন সেবা নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। তবে আমাদের দেশে এই সেবা পরিধি অনেক কম। পুনর্বাসন সেবা প্রতিটি ব্যক্তির জন্য জরুরিভাবে এটি কীভাবে প্রসার বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে এখন থেকেই ভাবতে হবে।

রকনুল হক বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর বর্তমানে ৬টি রোগের জন্য রোগীকে ৫০ হাজার টাকা দিচ্ছে। নতুন করে অন্য কোনো রোগের জন্য এমন অনুদানের জন্য উচ্চ পর্যায় থেকে আবেদন করতে হবে। পুনর্বাসন চিকিৎসায় মানুষের আস্থা বাড়াতে সেবার মান আরও বাড়াতে হবে।

রিপন চক্রবর্তী বলেন, সিবিএম গ্লোবাল ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুশন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণের জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করে আসছে। সিবিএমের অন্যতম কর্মপন্থা হচ্ছে অংশীদারির মাধ্যমে কাজ করা। প্রতিবন্ধীদের সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকরণে কাজ করে থাকে। এছাড়া সিবিএম গ্লোবাল পুনর্বাসন তথা স্বাস্থ্যসেবায় জড়িত পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রতিবন্ধীদের জন্য সহায়ক উপকরণ প্রদান, বৃত্তিমূলক কাজের সুযোগ বাড়ানো এবং অ্যাডভোকেসি নিয়ে কাজ করে থাকে। সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে সিবিএম গ্লোবাল কাজ করে থাকে।

ডা. শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে একসঙ্গে কাজ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক সায়মা ওয়াজেদ। এমনকি আগামী পাঁচ বছর তাদের নিয়ে কীভাবে কাজ করতে হবে, তা সুস্পষ্টভাবে কর্মকৌশলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক নিয়ে এই কর্মকৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকার সেই কর্মকৌশল পাস করেছে। আগামী জুলাই থেকে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয়ে যাবে। পুনর্বাসন পেশাজীবী সরকারিভাবে নিয়োগের প্রস্তাব আসছে। এটা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব নয়। তার পরও আমরা আগামী বছর ৬৪ জেলায় পুনর্বাসন পেশার চিকিৎসকদের বেসরকারিভাবে নিয়োগের ব্যবস্থা করছি। আগামী পাঁচ বছরের জন্য কাজ করবে। ৩৪ মেডিকেল কলেজে শিশুবিকাশ কেন্দ্রে নিয়ে কাজ করছি।

তিনি আরও বলেন, সরকার চাইলে সব করতে পারবে না। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে কাজ করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি খাতের অনেক অবদান রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করে, এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

ড. আবু সালেহ্ মোস্তফা কামাল বলেন, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পিচথেরাপিস্টসহ সংশ্লিষ্টদের জনগণের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করে আস্থা অর্জন করতে হবে। ভুয়া ফিজিওথেরাপিস্ট যাতে না ঢুকতে পারে, সেদিকে নজর দিতে হবে। এখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে স্লোগান দেওয়া হচ্ছে, এটা বঙ্গবন্ধুর সময়েও ছিল। সম্মিলিতভাবে কাজ করে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।


 

আরও পড়ুন

×