ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ভেঙে যাচ্ছে প্রভাব বলয়, ঢাকার ৩৩ থানায় নতুন ওসি

ভেঙে যাচ্ছে প্রভাব বলয়, ঢাকার ৩৩ থানায় নতুন ওসি

প্রতীকী ছবি

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:৫৪ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২১:৫৯

পুলিশের সবচেয়ে বড় একক ইউনিট ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বিভিন্ন পদমর্যাদার প্রায় ৩৪ হাজার সদস্য এ ইউনিটে কর্মরত। ৫০টি থানা নিয়ে ডিএমপি। এর মধ্যে ৩৩ থানার ওসি পদে রদবদল আসছে। ঘুরেফিরে অনেকে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ থানায় ছিলেন। সেখানেও আসছে রদবদল। বদলির এ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য আজ নির্বাচন কমিশনে (ইসি) পাঠাচ্ছে ডিএমপি। একযোগে রাজধানীতে এত সংখ্যক থানায় ওসি পদে নতুন মুখ আসার ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটেনি। যাদের বদলি করা হচ্ছে, তারা সবাই ছয় মাসের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

ছয় মাসের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন– সারাদেশে এমন সব ওসিকে বদল করতে চায় ইসি। ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বদলির প্রস্তাব ইসিতে পাঠাতে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়। এরপরই পুলিশের নীতিনির্ধারকরা কে কোন থানায় ছয় মাসের বেশি রয়েছেন, তাদের তালিকা তৈরি করা শুরু করেন। মহানগর, রেঞ্জসহ ইউনিটভিত্তিক পৃথক তালিকা করা হচ্ছে। এতে অনেক ওসির কপাল পুড়বে, আবার কারও খুলবে ভাগ্য। 

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক এলাকায় এমপি, মন্ত্রীসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা তাদের পছন্দের কর্মকর্তাকে ওসি হিসেবে পোস্টিং করে নিয়ে থাকেন।

বিভিন্ন থানায় ওসির চেয়ারে নতুন মুখ আসার প্রক্রিয়ায় অনেক হিসাব-নিকাশও বদলে যাচ্ছে। কোনো কোনো থানার ওসিকে অন্য জেলা বা ইউনিটে বদলি করা হচ্ছে। কিছু জেলায় এক থানা থেকে অন্য থানায় পদায়ন করার মতো পরিস্থিতি নেই। কারণ, নতুন যে জায়গায় পদায়ন করা হবে, পরিদর্শক পদমর্যাদার সেই থানার কর্মকর্তার চাকরির সময়সীমা হয়তো ছয় মাসের বেশি হয়নি।

ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান সমকালকে বলেন, ইসির নির্দেশনার আলোকে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় যেসব ওসি ছয় মাসের বেশি দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের তালিকা করা হয়েছে। রদবদলের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য ইসিতে পাঠানো হবে। 

এ ব্যাপারে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ওসি রদবদল করা হলে এটি ইতিবাচক। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ওসির সঙ্গে এমপিদের বিশেষ সখ্য তৈরি হয়েছে। রদবদল করা হলে এ সুবিধা রাজনৈতিক নেতারা পাবেন না।’ 

ডিএমপির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রাজধানীতে যাদের রদলি করা হচ্ছে, তাদের ইউনিট পরিবর্তন হচ্ছে। নির্বাচনী আসনের বাইরে গিয়ে অন্য থানায় নতুন ওসি হিসেবে দায়িত্ব পাবেন।

জানা গেছে, রাজধানীর আটটি অপরাধ বিভাগের আওতাধীন ৫০টির মধ্যে ১৭টি থানার ওসির মেয়াদ এখনও ছয় মাস পূর্ণ হয়নি। বাকি ৩৩ থানার ওসি ছয় মাসের বেশি সময় ধরে একই থানায় রয়েছেন। ইসির নির্দেশনার পর নতুনভাবে কাকে কোন থানায় দায়িত্ব পালনের জন্য বেছে নেওয়া হচ্ছে– এমন একটি খসড়া তালিকা এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। ইসির অনুমোদন পেলে সেখানে তাদের পোস্টিং করা হবে। ডিএমপির মিরপুর বিভাগের মধ্যে রূপনগর ও কাফরুল ছাড়া বাকি পাঁচ থানার ওসি পদে নতুন মুখ আসছে। ডিএমপির উত্তরা বিভাগের ছয় থানার মধ্যে চারটির ওসি রদবদল হচ্ছে। সেগুলো হলো উত্তরা পূর্ব, উত্তরা পশ্চিম, তুরাগ ও উত্তরখান। তেজগাঁও বিভাগে তিন থানার ওসি বদল হচ্ছে। তা হলো শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল।

একাধিক রেঞ্জ ডিআইজির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওসিদের রদবদল করে জেলার ভেতরে অন্য কোনো থানায় দেওয়া হতে পারে। আবার একেবারে নতুন মুখও আসতে পারে। জেলা বা ইউনিটের বাইরে থেকেও কারও কারও ভাগ্য খুলতে পারে; আবার কারও কপাল পুড়তে পারে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারাদেশে ৬৩৬টি থানা রয়েছে। সাধারণত নির্দিষ্ট সংখ্যক পরিদর্শকই ঘুরেফিরে থানায় ওসির দায়িত্ব পালন করেন। তার মধ্যে অধিকাংশ থানার ওসি ছয় মাসের বেশি তাঁর কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজশাহী রেঞ্জে থানা রয়েছে ৭১টি। এর মধ্যে ৩০ জন ছয় মাসের বেশি একই থানায় রয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে থানা রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে পাঁচজন ছয় মাসের বেশি দায়িত্ব পালন করে আসছেন। 

ঢাকা রেঞ্জের এক কর্মকর্তা জানান, ৯৮টি থানা রয়েছে তাদের রেঞ্জের আওতাধীন। ছয় মাসের বেশি দায়িত্ব পালন করেছেন এমন ওসির তালিকা তারা তৈরি করেছেন। 

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাহফুজুল ইসলাম জানান, জেলার ৯টির মধ্যে একটি থানার ওসি ছয় মাসের বেশি দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁকে বদলির প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার ওসি বদলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে চিঠি দেয় ইসি। মন্ত্রিপরিষদের সচিব এবং পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করার জন্য সব থানার ওসিদের পর্যায়ক্রমে বদলি করতে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রথম পর্যায়ে যেসব থানার ওসির বর্তমান কর্মস্থলে ছয় মাসের বেশি সময় পার হয়েছে, তাদের অন্য জায়গায় বদলির প্রস্তাব ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো কোনো ওসি একই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ কারণে তাদের একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে। সংসদ সদস্য ছাড়াও এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে কারও কারও গভীর সখ্য। নির্বাচনী মাঠে এ বলয় ভাঙতে রদবদল ভূমিকা রাখবে। 

আরেক কর্মকর্তা বলেছেন, ওসি পদের মনোনয়ন দেওয়ার নীতিমালা রয়েছে। কোনো কর্মকর্তা পরিদর্শক পদে অন্তত তিন বছর চাকরি করার পর ওসি পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। কোনো কর্মকর্তা ১২ বছর ওসি পদে দায়িত্ব পালন করলে অথবা কোনো কর্মকর্তার বয়স ৫৪ বছর হলে পরবর্তীকালে তিনি ওসি পদে নিয়োগের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। ওসি নিয়োগের ৯ দফা নীতিমালার মধ্যে আরও রয়েছে, পরিদর্শক হিসেবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুই বা তার বেশি এবং চাকরিকালে চার বা ততোধিক গুরুদণ্ড থাকলে ওসি হিসেবে পদায়ন করা যাবে না। কারও বিরুদ্ধে একটি আর্থিক অনিয়ম বা নৈতিক স্খলনের গুরুদণ্ড থাকলে ওই পরিদর্শক ওসি পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।

নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, থানায় পদায়ন করা পরিদর্শকের মধ্যে সিনিয়রকে ওসি পদে নিয়োগ করতে হবে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা একটি থানার ওসির দায়িত্ব পালন করলে পরবর্তীকালে দ্বিতীয় দফায় ওই থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। সদাচরণ, গণমুখী ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমে উৎসাহী পুলিশ পরিদর্শকদের ওসি হিসেবে পদায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বর্তমানে পুলিশে ক্যাডার পদের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। অন্তত সাত হাজার পরিদর্শক ও ২৫ হাজার উপপরিদর্শক পদের কর্মকর্তা রয়েছেন। 

এক কর্মকর্তা জানান, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য এ ধরনের বদলি ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। তবে অন্য একজনের ভাষ্য, হঠাৎ নতুন জায়গায় গিয়ে কারও কারও পক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা কষ্টসাধ্য হতে পারে।

আরও পড়ুন

×