ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

মাঝারি ভূমিকম্পে বড় কাঁপুনি

মাঝারি ভূমিকম্পে বড় কাঁপুনি

ভূমিকম্পে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হলের দেয়ালে দেখা দেয় ফাটল সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:৫৭ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০৮:৫৯

মাঝে মাত্র এক মাসের ফারাক। এর মধ্যেই ভূকম্পনে আবার নড়ে উঠল দেশ। গতকাল শনিবার সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে অনুভূত এ ভূমিকম্পের রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৫। মাঝারি মানের এ কম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৮৬ কিলোমিটার দূরে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ। এ নিয়ে গেল সাড়ে তিন মাসে সাতবার কাঁপল দেশ। তবে দেশে এত বড় কম্পন গত কয়েক বছরে অনুভূত হয়নি, এবার ক্ষতিও হয়েছে বেশি।

গতকালের ভূমিকম্পে ঢাকাসহ সারাদেশে ঘরবাড়ি ও দালানকোঠা কেঁপে ওঠে। এতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে অনেক মানুষ বাড়ির বাইরে সড়কে বেরিয়ে আসেন। কুমিল্লায় কম্পনের সময় তাড়াহুড়ায় এক কারখানার শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের একটি ভবনের বিভিন্ন স্থানের পলেস্তারা খসে পড়েছে। ভেঙে গেছে দরজার কাচ। আতঙ্কে লাফিয়ে পড়ে ঢাকা ও কুমিল্লায় তিন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) তিনটি হলের দেয়ালে এবং লাকসামে মসজিদে ফাটল দেখা দিয়েছে। 

দেশে কয়েক বছরে নিয়মিত ভূমিকম্প হচ্ছে। সাধারণত সিলেট ও এর আশপাশের অঞ্চলকে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে দেখা হয়। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও এর আশপাশেও ভূমিকম্পের উৎপত্তি হতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বারবারই সামনে বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা করে আসছেন। এমন সময় লক্ষ্মীপুরে কম্পনের উৎপত্তিকে বড় ভূমিকম্পের আভাস হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর দেশে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রেসুবেলপাড়া থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে। সেপ্টেম্বরে এক মাসে তিনবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর ৪ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল টাঙ্গাইলে। এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর সিলেট অঞ্চলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে। আর ৯ সেপ্টেম্বরের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের আসামের কাছাড় এলাকায়। আগস্টে দুই দফা দেশে ভূকম্পন হয়েছে। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয় ২৯ আগস্ট। উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটে। ১৪ আগস্ট আরেকবার ৫ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। কেন্দ্রস্থল ছিল বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী সিলেটের কানাইঘাট এলাকায়।

এবার ক্ষতি বেশি
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ছুপুয়া এলাকায় আমির শার্ট নামে একটি পোশাক কারখানায় আতঙ্কে কারখানা থেকে বের হওয়ার সময় পদপিষ্ট হয়ে শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। এ সময় কারখানার গেট বন্ধ থাকায় কেউ বের হতে পারেননি।

ভূমিকম্পে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের একটি ভবনের বিভিন্ন স্থানের পলেস্তারা খসে পড়েছে। হলের পাঠকক্ষের দরজার কাচ ভেঙে গেছে। শিক্ষার্থীরা জানান, মুহসীন হল পুরোনো হয়ে যাওয়ায় নানা কারণে প্রায়ই পলেস্তারা খসে পড়ে। ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কে হলের দোতলা থেকে লাফিয়ে নামতে গিয়ে পায়ের গোড়ালিতে আঘাত পেয়ে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন ঢাবির ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মিনহাজ (২১)। আতঙ্কে দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের ঢালুয়া রহমতিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের মুনতাসির (২০) ও সায়েম (১৫) নামে দুই শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) তিনটি হলের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। হলগুলো হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কাজী নজরুল ইসলাম ও নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হল। এ ছাড়া মেয়েদের শেখ হাসিনা হলের রিডিং রুমেও হালকা ফাটলের দেখা দেয়। কম্পনে কুমিল্লার লাকসামের পৌর এলাকার বাগবাড়িয়া জামে মসজিদের দেয়ালে ফাটল ও তিনটি টাইলস খসে পড়েছে।
ভূমিকম্পের সময় বাড়িতেই ছিলেন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের স্থানীয় সাংবাদিক আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের কারণে হঠাৎ ঘর কাঁপতে থাকে।

বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস
বাংলাদেশে সর্বশেষ ১৮২২ ও ১৯১৮ সালে মধুপুর ফল্টে বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে ঢাকার কাছে মানিকগঞ্জে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে। ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পের মধ্যে বেশি মাত্রা ছিল ২০০৩ সালের ২৬ জুলাইয়ে সৃষ্টি হওয়া একটি ভূমিকম্পের। সেটি চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়িতে অনুভূত হয়। মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৬। সব মিলিয়ে গত এক বছরে বাংলাদেশে ৫০টি ভূমিকম্প হয়েছে। বেশির ভাগের মাত্রা ছিল ৪ থেকে ৫-এর মধ্যে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, রামগঞ্জে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পের গভীরতা ১০ কিলোমিটারের মধ্যেই ছিল। এই ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে রামগঞ্জের যেখানে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে, ওখানে একটা ‘ক্রাস্টাল ফল্ট’ আছে, এটা আমরা ভাবিনি। এ ধরনের ফাটলরেখা থেকে সাধারণত বড় ভূমিকম্প হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, আগামীতে বড় ভূমিকম্প হতে পারে, সেটারই জানান দিচ্ছে ছোট ভূমিকম্পগুলো। গতকালের ভূমিকম্পটি সাবডাকশন জোনে হয়েছে। এ অঞ্চলে যে পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত হয়ে আছে, তাতে এ বেল্টের যে কোনো জায়গায় যে কোনো সময় ভূমিকম্প হতে পারে। সাবডাকশন জোনের যে কোনো জায়গায় ভূমিকম্প হওয়ার মানে হচ্ছে বড় ভূমিকম্প হওয়ার পূর্বলক্ষণ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, তুরস্কের বড় ভূমিকম্পের আগে ১০০টির বেশি ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়েছিল। গত এক বছরে বাংলাদেশে ৫০টির বেশি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ছোট এসব কম্পন শক্তি সঞ্চয় করছে। ফলে সামনে বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা আছে। ঝুঁকি মাথায় রেখে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিতে হবে।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সিলেট ও ভারতের আসাম মিলিয়ে ডাউকি চ্যুতি পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার বিস্তৃত। ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। ডাউকি চ্যুতি ছাড়াও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকার ভূগর্ভে থাকা একটি চ্যুতিও সক্রিয়। বাংলাদেশের মাটির নিচে চ্যুতি আছে মোট ১৩টি।

আরও পড়ুন

×