তথ্য অধিকার অনুযায়ী নাগরিকদের কাছে স্বপ্রণোদিত হয়ে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পিছিয়ে আছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) অবস্থান উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। 

বৃহস্পতিবার ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে 'স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ চর্চার মূল্যায়ন' শীর্ষক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে সরকারের খাদ্য, পানিসম্পদ এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকার পরেও মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতি-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ ও প্রদানের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার সংস্কৃতি অব্যাহত রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নে যেমন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা ছিল, তেমনি এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নের কাজটিও এসব সংস্থার। আইনটি প্রণয়নের ১১ বছর পর এসে তথ্য পাওয়ার সুযোগ আগের তুলনায় বাড়লেও সার্বিকভাবে এবং মোটা দাগে তা সন্তোষজনক নয়। স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের বিষয়টি আইনগত গুরুত্ব পেলেও তার চর্চা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণা জরিপে সরকারি ১৫৩টি প্রতিষ্ঠান, ৩৯টি এনজিওসহ মোট ১৯২টি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের তথ্য ও নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এই হিসাবে ৭৬ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ২৪ শতাংশ এনজিওর ওপর জরিপ পরিচালিত হয়। ২০২০ সালের আগস্ট থেকে ২০২১ সালে জানুয়ারি পর্যন্ত ১৯২টি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের তথ্য সংগ্রহ করে মিশ্র পদ্ধতিতে গবেষণাটি সম্পন্ন করা হয়েছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে স্কোরিং করা হয়েছে। নির্ধারিত তিনটি ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত মোট ২৫টি নির্দেশকের (তথ্যের ব্যাপ্তিতে ১৯টি, প্রবেশগম্যতায় চারটি ও উপযোগিতায় দুটি নির্দেশক) ভিত্তিতে তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ চর্চার মূল্যায়ন করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক ও সেবা সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশের মাত্রা অধিকাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানের (যথাক্রমে ৫৪.৯% এবং ৫৯.৪%) ওয়েবসাইটে সন্তোষজনক। ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশে অধিকাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্কোর (৪৫.৮%) অপর্যাপ্ত এবং কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্কোর (৫৪.২%) উদ্বেগজনক। অন্যদিকে ওয়েবসাইটে নির্দেশকের ধরনভেদে অধিকাংশ এনজিওর (৮০% এর অধিক) সব ধরনের তথ্য প্রকাশের মাত্রা এবং একটি ছাড়া সব নির্দেশকে অধিকাংশ এনজিওর স্কোর সর্বনিম্ন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সন্তোষজনক স্কোর পেয়েছে। প্রায় ৮.৫ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্কোর উদ্বেগজনক। পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সার্বিকভাবে ৪২ স্কোর (৮৪ শতাংশ) পেয়ে যৌথভাবে প্রথম স্থানে আছে খাদ্য মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয় স্থানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং যৌথভাবে তৃতীয় স্থানে আছে কৃষি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সেতু বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়-মাদ্রাসা বোর্ড, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বনিম্ন ৪ স্কোর (৮ শতাংশ) পেয়েছে আন্তঃবাহিনী নির্বাচন পর্ষদ।

অন্যদিকে, কোনো এনজিওই প্রথম ১০ অবস্থানে নেই, এমনকি গবেষণার মানদণ্ডে কোনো এনজিও সন্তোষজনক স্কোর পায়নি। বরং স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশে ৯৪.৯ শতাংশ এনজিওর স্কোর উদ্বেগজনক। এনজিওদের মধ্যে প্রথম ১০টি অবস্থানে রয়েছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান, যাদের প্রাপ্ত স্কোর ৭ থেকে ২২ এর মধ্যে। সর্বোচ্চ স্কোর ২২ (৪৪ শতাংশ) পেয়ে প্রথম স্থানে আছে জাতীয় পর্যায়ের এনজিও কোস্টাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল ট্রান্সফরমেশন, দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা আহছ্‌ানিয়া মিশন ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে গণউন্নয়ন কেন্দ্র। প্রথম ১০টি অবস্থানের মধ্যে ছয়টি আন্তর্জাতিক এনজিও এবং তালিকার বাকি সব ওয়েবসাইট জাতীয় পর্যায়ের এনজিওর।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রায়ই পরিপূর্ণ অবগত নন। ফলে স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ, প্রচারসহ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হয়। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকার পরেও মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতি সংশ্নিষ্ট তথ্য প্রকাশ ও প্রদানের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার সংস্কৃতি অব্যাহত রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তার নিজস্ব পদের দায়িত্ব বেশি থাকায় ওয়েবসাইটের গুণগতমান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেওয়া বা সে বিষয়ে চিন্তা করার অবকাশ পান না দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রত্যাশা ছিল বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলো আরও অনেক ভালো করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্কোর সন্তোষজনক তো নয়ই, উল্টো প্রায় ৯৫ শতাংশ এনজিওর অবস্থাই উদ্বেগজনক; যা হতাশার। আন্তর্জাতিক এনজিওর ক্ষেত্রেও তথ্য বিধিমালা অনুযায়ী তথ্য নেই। যেহেতু বেসরকারি সংস্থাগুলো তথ্য অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত এবং তারা এর বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে কাজ করে, তাই তাদের স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের চর্চা আরও বাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশলগুলোর মধ্যে তথ্য প্রকাশ ও তথ্যের অভিগম্যতা নিশ্চিত করা অন্যতম হলেও দুর্নীতি প্রতিরোধে শুধু এটিই যথেষ্ট নয়। এজন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতিতে যারা জড়িত তাদের কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনগণের অংশগ্রহণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা।