মডেল-অভিনেত্রীদের বিদেশে প্রমোদভ্রমণের সঙ্গীদের তালিকা করছেন গোয়েন্দারা। অসৎ উদ্দেশ্যে প্রভাবশালী একটি মহল দীর্ঘদিন ধরেই অনেক মডেলকে দুবাই-মালয়েশিয়া নিয়ে যেতেন। সেখানে তারকা হোটেলে থাকা-খাওয়া ও কেনাকাটার সব খরচ বহন করত ওই মহলটি। অভিনেত্রী পরীমণিও একাধিক শিল্পপতি ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে অন্তত ৩০ বার বিদেশে গেছেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকেও দুবাইয়ে একটি বিলাসবহুল হোটেলে পরীমণিকে নিয়ে যান একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি। সেখানে পরীমণির সব খরচ বহন করেছিলেন তিনি। মাদক মামলায় গ্রেপ্তার পরীমণি ছাড়াও প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ, আশরাফুল ইসলাম ওরফে 'দীপু মামা' ও সবুজ আলীকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ এসব তথ্য পেয়েছে বলে সংশ্নিষ্টরা জানান।

এদিকে গত কয়েক দিনে একের পর এক মডেল-অভিনেত্রী ও তাদের সহযোগীদের গ্রেপ্তারের পর চলচ্চিত্র অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকে বলছেন, চলচ্চিত্র অঙ্গনের সুনাম রক্ষায় উঠতি শিল্পীদের সঠিক অভিভাবকত্ব জরুরি। বর্তমানে এটি নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সদস্য অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাস সমকালকে বলেন, মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাকে মূল্য দেওয়ার দায়িত্ব একজন শিল্পীর। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের প্রতিও তার অনেক দায় রয়েছে। কাজের মধ্য দিয়ে একজন শিল্পী সমাজে তার নিজের ইমেজ গড়ে তোলেন। সেই ইমেজ রক্ষার মূল কাজটাও তাকে করতে হয়। আবার কে কীভাবে জীবন-যাপন করবেন এটা নির্ধারণ করতে হবে তাকে। কেউ সাদাসিধে জীবন-যাপন করেন। আবার কেউ থাকেন উচ্চাভিলাসী। তবে গুরুজনের কথা মেনে জীবনকে একটি স্বাভাবিক বলয়ের মধ্যে পরিচালিত করতে পারলে ভালো।

পরিচালক সমিতির মহাসচিব শাহীন সুমন সমকালকে বলেন, এক সময় চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক ধরনের অভিভাবক হিসেবে যে কোনো সংকটে শিল্পীদের পাশে এসে কেউ না কেউ দাঁড়াতেন। উঠতি শিল্পীরাও তাদের সম্মান করতেন। রাজ্জাক, আলমগীর, কবরী, রোজিনা, সোহেল রানা, মান্নাদের মধ্যে এটা দেখা গেছে। এখন এই শিল্পে কার্যত মুরুব্বি নেই। তাই অনেক সময় কোনো কোনো শিল্পী ভুল পথে চলে গেলেও তাকে সঠিক পথে এনে পুরো ইন্ডাস্ট্রির সুনাম রক্ষার লোক পাওয়া যায় না। এছাড়া অনেক দিন ধরে দেশে চলচ্চিত্র শিল্পের করুণ দশা। অনেক শিল্পী ও এর সঙ্গে সংশ্নিষ্টরা কর্মহীন। এরপরও কিছু লোক এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করছেন। দু-চারজনের জন্য সকল শিল্পীকে তো আর দায়ী করা যায় না।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সমকালকে বলেন, অভিজাত এলাকাকেন্দ্রিক এসব চক্রের মূল হোতা রাজ। তার মোবাইলে অনেক পর্নো ভিডিও পাওয়া গেছে। বিকৃত যৌনাচারের কিছু উপকরণও তার বাসা থেকে জব্দ করা হয়। এ ছাড়া রাজের ছায়াতলে থাকা অন্যদের ব্যাপারেও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, উঠতি মডেলদের নানা টোপ দিয়ে ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার মূল হোতা হলেন প্রযোজক রাজ ও রয়েল খান। রাজ গ্রেপ্তার হলেও রয়েল এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। সুন্দরী উঠতি কোনো মডেলের দিকে নজর পড়লেই তারা প্রলোভনের ফাঁ?দ পাততেন। এরপর তাদের রাতারাতি দামি গাড়ি ও গহনাসহ বিলাসবহুল জিনিসপত্র উপহার পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন। এর বিনিময়ে তাদের কথা মতো ওই প্রভাবশালীদের সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর প্রস্তাব দেন। অনেকেই এই ফাঁদে পা দিতেন।

জানা গেছে, মডেলদের বিদেশে নিয়ে অনৈতিক কারবারে জড়ানোর হোতাদের তালিকায় আরও আছেন জুনায়েদ করিম জিমি ও শরফুল হাসান ওরফে মিশু। এই চক্রটিকে অর্থ দিয়ে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করতেন চা শিল্পের সঙ্গে জড়িত এক শিল্পপতি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরেকজন কর্মকর্তা জানান, কয়েকজন উঠতি শিল্পীর বিদেশযাত্রার তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের সঙ্গে কারা একই ফ্লাইটে গেছেন, কারা আগে-পরে গিয়ে বিদেশে একত্রিত হয়েছেন সেই তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এরই মধ্যে পরীমণিকে তার সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের উৎস নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পরীমণি দাবি করেছেন, তার ব্যাংক হিসাব নম্বরে মোটা অঙ্কের কোনো টাকা জমা নেই। বনানীর ফ্ল্যাটে ভাড়ায় থাকছেন। আর গাড়ি কিনেছেন ব্যাংক ঋণ করে। তবে অন্য এক কর্মকর্তা জানান, পরীমণি প্রভাবশালী দুই ব্যক্তির কাছ থেকে গাড়ি ও ফ্ল্যাট উপহার হিসেবে পেয়েছেন।

আরেকটি সূত্র বলছে, রাজ এরই মধ্যে যেসব উঠতি মডেলকে টোপ দিয়ে ফাঁসিয়েছেন, তার একটি তালিকাও গোয়েন্দারা পেয়েছেন। সেখানে দুইশর বেশি নাম রয়েছে। ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে তিনি পর্নো ভিডিও তৈরি করছিলেন কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া তার আন্ডারওয়ার্ল্ড কানেকশনে শটগান সোহেল ওরফে সোহেল শাহরিয়ার নামে আরেকজনের ব্যাপারেও চলছে অনুসন্ধান।