ইতিহাসে একই ঘটনা দু'বার ঘটে না। তবে একটি ঘটনার সঙ্গে অপর ঘটনার সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়। বেশ সাযুজ্য রয়েছে পলাশীর বিপর্যয় ও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্যে। তা কেবল ঘটনা সংঘটনে নয়, কার্যকারণ সম্বন্ধেও।

এ দুই শোকাবহ ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান ২১৮ বছরের। বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা নিহত হয়েছিলেন ১৭৫৭ সালে ২৩ জুন, পলাশীর বিপর্যয়ের পর সুবে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে। আর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। বড় সাযুজ্য- এ দুই পটপরিবর্তন ঘটেছিল যুদ্ধ জয়ে নয়; ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে।

বাংলার সম্পদের প্রতি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছিল লোলুপ দৃষ্টি। তবে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বশে আনা তাদের জন্য সহজ ছিল না; যুদ্ধ করা কল্পনায়ও ছিল না। সুবে বাংলার সামরিক শক্তিমত্তার কাছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শক্তি তুচ্ছাতিতুচ্ছ। তাই অধিকতর ও নিয়মবহির্ভূত বাণিজ্যিক সুবিধালাভে ব্যর্থ বিদেশি বেনিয়ারা চক্রান্তের পথে অগ্রসর হয়। তাদের অজানা ছিল না- মীরজাফর, ঘসেটি বেগম, ইয়ার লতিফ, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ, জগৎশেঠরা ছিলেন তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলার ওপর নাখোশ। কোম্পানির কর্ণধার রবার্ট ক্লাইভ (তখন কর্নেল) কুচক্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এসব উচ্চাভিলাষী ব্যক্তি অতিলোভে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলান; ষড়যন্ত্র পাকান।

স্বাধীন বাংলাদেশে পরাজিত পাক-মার্কিন চক্রেরও জানা ছিল- নানা কারণে খন্দকার মোশতাক, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, মাহবুবুল আলম চাষী, রশীদ, ফারুক, ডালিম, নূর প্রমুখ বঙ্গবন্ধুর ওপর নাখোশ। মুর্শিদাবাদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মতো স্বাধীন বাংলাদেশেও খন্দকার মোশতাককে ঘিরে একটি চক্র গড়ে ওঠে। এটি আজ ওপেন সিক্রেট, একাত্তরে পরাজিত পাক-মার্কিন চক্রের সঙ্গে এসব উচ্চাভিলাষী ব্যক্তির যোগাযোগ হয়। এভাবেই বঙ্গবন্ধু হত্যার নীলনকশা তৈরি হয়।

ইতিহাসের এ দুই ঘটনা সংঘটনে কী বিস্ময়কর মিল! 'নিকটজনের' বিশ্বাসঘাতকায় পলাশীতে ক্ষুদ্র শক্তির কাছে পরাক্রমশালী সুবে বাংলা বাহিনীর পরাজয় এবং নবাবের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। একইভাবে কাছের লোকদের বিশ্বাসঘাতকতায় বিপথগামী কিছু সেনাসদস্যের হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন। পলাশীর ঘটনায় বিশ্বাসঘাতকতার শিরোমণি নবাব সিরাজউদ্দৌলার আত্মীয় ও সেনাধ্যক্ষ মীরজাফর আলী খান; আর ১৫ আগস্ট চক্রান্তের হোতা বঙ্গবন্ধুর 'বন্ধু' ও প্রভাবশালী মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ।

হিংস্রতা ও বর্বরতায় ১৭৫৭ সালের মীরজাফরের আজ্ঞাবহ ঘাতক মিরন-মহম্মদী বেগ চক্র ও ১৯৭৫-এ মোশতাকের লেলিয়ে দেওয়া ফারুক-রশীদ-ডালিম গং অভিন্ন। মিরন-মহম্মদী বেগরা নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের শিশু-নারীসহ সবাইকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছিল। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের খুনিরাও বেগম মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, নবপরিণীতা দুই বধূসহ সবাইকে পৈশাচিক উন্মাদনায় হত্যা করে। শিশু রাসেলের প্রাণ সংহারেও খুনিদের হাত কাঁপেনি। বিদেশে অবস্থান করায় ঘাতকের বুলেট বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

দুই ঘটনায় মিল ছিল অপপ্রচারেও। ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কে নানা অপপ্রচার করে। আজ্ঞাবহ ঐতিহাসিকরা 'অন্ধকূপ হত্যা'সহ নানা কল্পকাহিনি রচনা করেন। বেনিয়া দখলদার গোষ্ঠী বোঝাতে চাইছিল- 'ত্রূক্রর, লম্পট, মদ্যপ, নিপীড়ক' একজন শাসককে সরিয়ে তারা এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। পঁচাত্তরের খুনিচক্র দম্ভ করে বলেছিল- তারা জাতিকে 'জালিম'-এর হাত থেকে বাঁচিয়েছে। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নানা অপবাদ দেওয়া হয়। মনগড়া দুর্নীতির ফিরিস্তিও দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়; বেতার- টেলিভিশন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে নিষিদ্ধ করা হয়। ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয় বঙ্গবন্ধুর নাম। পরবর্তী সময়ে প্রচার করা হয়েছিল- বঙ্গবন্ধুর ডাকে নয়; মেজর জিয়ার ঘোষণায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।

ইতিহাসের এ দুই বিয়োগান্ত ঘটনার মধ্যে পার্থক্য এই যে, পলাশীতে ইংরেজ বাহিনী সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। আর ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রে বিদেশি শক্তি দূর থেকে কলকাঠি নেড়েছিল; যারা আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে। যদিও বিদেশিদের মদদ ও সমর্থনের বিষয়টি এখন আর ধামাচাপা নেই। সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের দলিলপত্র বিশ্নেষণ করলে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এটি বোধগম্য, আন্তর্জাতিক মদদ ও সমর্থন ছাড়া এমন ধৃষ্টতা কেউ দেখাতে পারত না। তা ছাড়া, ১৫ আগস্টের পর অবৈধ সরকারের প্রতি পাশ্চাত্য ও মধ্যপ্রাচের দেশগুলোর সমর্থনই তা বোঝার জন্য যথেষ্ট।

পলাশীর বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়ার আজ্ঞাবহ মীরজাফরকে নবাবের আসনে বসানো হয়। ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে খন্দকার মোশতাকও রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। পলাশীর বিপর্যয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পথ সুগম হয়। পরিণতিতে শুধু বাংলা নয়; সমগ্র উপমহাদেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের করতলগত হয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মোশতাকের হাত ধরে ৩০ লাখ শহীদের রক্তস্নাত বাংলায় একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্থান ঘটে। পাকিস্তানি প্রেতাত্মা ফিরে আসে। বাহাত্তরের সংবিধান ছিন্নভিন্ন করা হয়। চার রাষ্ট্রীয় নীতি ছেঁটে ফেলা হয়। বাঙালি জাতি হয়ে যায় বাংলাদেশি। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা হয় নির্বাসিত। সমাজতন্ত্রকে করা হয় বিকৃত। পাকিস্তানের আদলে জয় বাংলা হয়ে যায় 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ', বাংলাদেশ বেতার হয়ে যায় 'রেডিও বাংলাদেশ'। আর খুনিদের রক্ষায় দায়মুক্তি আইন করা হয়, যাতে কখনও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার না হতে পারে।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন 'মীরজাফর'দের থেকে সদা সজাগ। বিভিন্ন জনসভায় বলতেন, বাংলায় মীরজাফরের বংশধররা এখনও আছে- তাদের থেকে আপনারা সাবধান থাকবেন। কিন্তু তিনি কি ঘুণাক্ষরেও ভেবেছিলেন, তার আশপাশ, মন্ত্রিসভা, দল, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনে মীরজাফররা ঘাপটি মেরে আছে!

মোশতাকের মীরজাফরপনা এই নতুন নয়। সেটির প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে। এটি প্রমাণিত সত্য যে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মোশতাক মার্কিন কূটনীতিকদের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক যে, এ ষড়ন্ত্রের পরও স্বাধীন বাংলায় মোশতাককে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি; তাকে কোনো জবাবদিহি করতে হয়নি। উপরন্তু মন্ত্রিসভায় সসম্মানে আসীন থাকেন। তার প্রতি বঙ্গবন্ধুর আস্থাও অটুট রইল। এই চিহ্নিত চক্রান্তকারীকে বিশ্বাস করার চরম মূল্য বঙ্গবন্ধুকে দিতে হলো সপরিবারে জীবন দিয়ে। একইভাবে তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলা নানা অভিযোগ পাওয়ার পরও মীরজাফরকে বিশ্বাস করেছিলেন এবং অপরিমেয় খেসারত দিয়েছিলেন।

পলাশীর বিপর্যয়ের পর ইংরেজ শাসনের অবসানে উপমহাদেশের মানুষকে প্রায় দু'শ বছর গোলামির জিঞ্জির পরতে হয়েছে। তবে ১৫ আগস্টের খুনিদের রাজত্ব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৭৫-এর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর খুনিদের ভীতি তৈরি হয়। ভয়ে বিহ্বল মোশতাক রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি হয়। খুনিদের কয়েকজন দূতাবাসে চাকরি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়, অন্যরাও দেশান্তরী হয়। যদিও জিয়া-এরশাদ আমলে এই চিহ্নিত খুনিরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল।

২১ বছর পর যখন ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হয়, তখন ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০০৯ সালে আদালতে কর্নেল ফারুক, কর্নেল রশীদসহ ১২ জন সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। ইতোমধ্যে ফারুক, হুদা, শাহরিয়ার, একেএম মহিউদ্দিন ও মহিউদ্দিন আহমেদ, সর্বশেষ আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত ও পলাতক খুনিদের খোঁজাখুঁজি চলছে।

আরও আশার কথা, পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে চার রাষ্ট্রীয় নীতিও সংবিধানে স্থান লাভ করেছে। তবে তা অনেকাংশে সংবিধানবন্দি। রাষ্ট্র পরিচালনায় তার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটছে না। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে জনগণের যথাযথ অংশীদারিত্ব কায়েম হয়নি। ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির আস্টম্ফালনও বন্ধ হয়নি। তবে স্বীকার্য- এসব প্রতিকূলতার মুখেও নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে মানুষে মানুষে বৈষম্য; বৈষম্য বেড়েছে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল শোষিতের বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্র অভিমুখী পরিকল্পিত ও কল্যাণকর অর্থনীতি চালু করেন। বাংলাদেশ এখন সে পথে চলছে না। এখানে এখন মুক্তবাজারের উন্মত্ত নৃত্য।

আজকের বাস্তবতায় দ্বিমতের সুযোগ নেই- বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথেই সুখী-সমৃদ্ধ, সবার জন্য বাসযোগ্য সোনার বাংলা কায়েম সম্ভব; অন্য কোনো উপায়ে নয়। আর এটিই স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রকৃষ্ট পথ।

মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও লেখক