স্বর্ণ চোরাচালানে চট্টগ্রামে গড়ে ওঠা বিশাল চক্রের বেশিরভাগ সদস্যের বাড়িই ফটিকছড়ি উপজেলার জাফতনগর ইউনিয়নে। এর মধ্যে ২২ চোরাকারবারি এই ইউনিয়নের জাহানপুর ও ফতেহপুর গ্রামের বাসিন্দা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে আরও ১১ জন।

ফটিকছড়ি গ্যাংয়ের এই ৩৩ সদস্যের প্রত্যেকেই চট্টগ্রাম-মধ্যপ্রাচ্য রুটে স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সদস্য। তারা ফতেহপুর গ্রামের বাসিন্দা আবু আহম্মেদ ওরফে সোনা আবুর নেতৃত্বে কাজ করেন। আর পুরো চক্রটি সমন্বয় ও নতুন নতুন সদস্য সংগ্রহের কাজটি করেন জাহানপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুর ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এনামুল হক নাঈম।

সর্বশেষ গত ১৯ মে চট্টগ্রাম আদালতে জমা দেওয়া একটি স্বর্ণ চোরাচালান মামলার অভিযোগপত্রে তিন চোরাকারবারির তথ্য উঠে আসে। তারা হলো- সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বাচ্চু, মোহাম্মদ আলী ও খোরশেদ আলম রুবেল। তাদের বাড়ি ফতেহপুর গ্রামে। এর আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নিউমার্কেট এলাকার একটি হোটেল থেকে ছয়টি স্বর্ণ বারসহ র‌্যাবের হাতে সাজ্জাদ ও আলী গ্রেপ্তার হওয়ার পর রুবেলের নাম বেরিয়ে আসে।

মহানগর পিপি ফখরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামে স্বর্ণবার চোরাচালান মামলার ৮০ ভাগ আসামিরই গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়িতে। এসব মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন আসামিও এ উপজেলার বাসিন্দা। এতে মনে হচ্ছে, স্বর্ণ চোরাচালানে ফটিকছড়িকেন্দ্রিক চক্রই জড়িত।

ফটিকছড়ি গ্যাংয়ের হোতা আবুর ব্যাপারে জাফতনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল হালিম বলেন, শুনেছি তিনি স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। তবে এই ইউনিয়নে এত ব্যক্তি যে এ চক্রের সঙ্গে জড়িত, তা জানতাম না। তিনি আরও বলেন, আবুর অধীনে চাকরি করতে গিয়ে অনেকে ফেঁসে গেছেন বলেও শুনেছি। তবে আবু ছাড়া আর কাউকে চিনি না।

ফটিকছড়ি থানার ওসি রবিউল ইসলাম বলেন, জাফতনগরের দুই গ্রামের এত মানুষের স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে আবু চোরাচালানে জড়িত, সেটা আমরা জানি। ফটিকছড়ি থানায় তার বিরুদ্ধে কোনো পরোয়ানা নেই। তিনি আরও বলেন, মূলত স্বর্ণ চোরাচালান হয়ে থাকে চট্টগ্রাম শহরকেন্দ্রিক। আবুর বিরুদ্ধে সব মামলাও শহরে।

দুই গ্রামেই ২২ স্বর্ণ চোরাকারবারি, উপজেলায় মোট ৩৩ জন: ফতেহপুর এবং জাহানপুর গ্রামের ২২ চোরাকারবারির মধ্যে আবু ও তার ম্যানেজার নাঈম ছাড়া অন্যরা হলো- ফতেহপুরের কোরবান আলী পণ্ডিত বাড়ির সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বাচ্চু ও মোহাম্মদ আলী, সারেং বাড়ির খোরশেদ আলম রুবেল, শামসুল হকের ছেলে হেলাল উদ্দিন, ইকবাল মোহাম্মদ নেজাম ও মো. রফিক।

জাহানপুরের বাসিন্দা জিয়া উদ্দিন বাবলু, আবু রাশেদ, মাহবুবুল আলম আলমগীর, ইমরান আহমেদ মির্জা ওরফে সবুজ, জসিম, জাফর, রহিম, রনি, ইমরান, ইব্রাহিম, মুক্তার, হাকিম, সাত্তার এবং আবুর ম্যানেজার নাঈমের ভাই নেজাম উদ্দিন। এ অপরাধ জগতে নাঈমই তার ভাইকে যুক্ত করেন। তাদের বিরুদ্ধে ৩২টি চোরাচালান মামলা রয়েছে। কারও বিরুদ্ধে দুটি, কারও বিরুদ্ধে তিনটি আবার কারও বিরুদ্ধে অর্ধ ডজন মামলা রয়েছে।

এই চক্রে রয়েছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার আরও ১১ জন। তারা হলো- দক্ষিণ রোসাংগিরি ইউনিয়নের বাসিন্দা ওবায়দুল আকবর ও সেলিম উদ্দিন, ধর্মপুর ইউনিয়নের মিনহাজ উদ্দিন ও মো. সারোয়ার, ফতেহপুর গ্রামের শামসুল হকের ছেলে হেলাল উদ্দিন, মো. নুর উদ্দিন, মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান খান ও নাজিরহাট এলাকার মো. বেলাল উদ্দিন, মীর মেফতাহ উদ্দিন, কাঞ্চনপুর এলাকার আবদুস শুক্কুর ও আবদুল করিম। চক্রের সদস্যরা মোটা অঙ্কের লোভ দেখিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন সদস্য সংগ্রহ করে। এই ১১ জনের বিরুদ্ধে রয়েছে ১৪টি মামলা।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, আবুর নেতৃত্বে ফটিকছড়ির প্রায় অর্ধশত চোরাকারবারির সঙ্গে পাশের উপজেলা রাউজান, হাটহাজারি, ফেনী এবং চকরিয়া থেকেও এরই মধ্যে অনেক সদস্যকে যুক্ত করা হয়েছে।

এক চোরাকারবারি কারাগারে গেলে যুক্ত হয় নতুন সদস্য: মহানগর পুলিশের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রাম-মধ্যপ্রাচ্য রুটে স্বর্ণবার চোরাচালানে আবুর নেতৃত্বে ও তার ম্যানেজার নাঈমের তত্ত্বাবধানে 'ফটিকছড়ি গ্যাং'-এ ৩৫ থেকে ৪০ সদস্য রয়েছে। এ গ্যাংয়ের এক সদস্য চোরাচালান করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হলে সঙ্গে সঙ্গে নতুন সদস্য যুক্ত করে অপকর্ম সচল রাখা হয়। প্রতি বছরই নতুন সদস্য দলে ভেড়াচ্ছে তারা। গত ১৪ বছরে এই চক্রের ২১ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে।

আসামি নয়নের জবানবন্দি :২০১৫ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে যাওয়ার পথে মিরসরাইয়ে পুলিশের হাতে ১০টি স্বর্ণের বারসহ গ্রেপ্তার হয় আন্তঃজেলা স্বর্ণ চোরাচালান দলের সদস্য জাবেদ আহম্মদ ওরফে নয়ন। ওই ঘটনায় তাকে আসামি করে মামলা করে মিরসরাই পুলিশ। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জাবেদ জানান, রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে ফটিকছড়ির নাঈম ও রাউজানের আমানুল্লাহ তাকে স্বর্ণগুলো সিলেটে নিয়ে যেতে দেন।

দুবাই আসা-যাওয়া ওদের কাছে মামুলি ব্যাপার: প্রতিষ্ঠিত কিংবা বড় ব্যবসায়ী ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে হুট করে দুবাই আসা-যাওয়া করা কঠিন। কারণ এখানে ভিসা সংগ্রহ ও যাতায়াতের জন্য বড় অঙ্কের খরচের ব্যাপার রয়েছে। তবে ফটিকছড়ির দুই গ্রামের স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সদস্যরা ইচ্ছে করলেই চলে যেতে পারেন দুবাই। স্বর্ণ চোরাচালানের উদ্দেশ্যে শ্রমিক ভিসা নিয়ে বছরে কেউ ছয়বার, কেউ ১২ বারের বেশি দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশে আসা-যাওয়া করেছেন- সেই রেকর্ড রয়েছে পুলিশের খাতায়।

এর মধ্যে ফতেহপুরের হেলাল উদ্দিনের এক বছরে ১৬ বার দুবাই যাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। এ বছরের ৮ এপ্রিল রেকর্ড হওয়া ১৬০টি স্বর্ণ চোরাচালান মামলায় জবানবন্দি দেয় সে। হেলালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণবারের একটি চালান দুবাই থেকে দেশে আনার জন্য তাকে টিকিটের দাম ও চালান বাবদ ৩০ হাজার টাকাসহ অন্যান্য খরচ দেওয়া হয়। এভাবে প্রতিটি চালান চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছে দিত সে। ১৬০টির চালান ধরা পড়ার আগে ৩০টি বারের আরও একটি চালানও এনেছিল এই আসামি।

হেলাল ছাড়াও ফটিকছড়ির আরেক বাসিন্দা ইমরান আহমেদ মির্জা ওরফে সবুজের দুটি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ছয় মাসের মধ্যে ১১ বার বিদেশ আসা-যাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। নুর উদ্দিন নামে একজন এক বছরে যাতায়াত করেন ছয়বার।

চক্রের আরেক সদস্য ফেনীর ছাগলনাইয়ার বাসিন্দা আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে লকডাউনের মধ্যেও স্বর্ণ চোরাচালানের উদ্দেশ্যে দুবাই আসা-যাওয়ার তথ্য পায় সিআইডি। গত এক বছরে ৯ বার যাতায়াত করেন তিনি।

সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ বলেন, ১৬০টি স্বর্ণ চোরাচালান মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এক প্রবাসী শ্রমিককে একাধিকবার দুবাই আসা-যাওয়া করার তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি। দুই আসামিকে গ্রেপ্তারও করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বর্ণ চোরাচালান করতেই এতবার বিদেশে আসা-যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। চক্রে আর কারা জড়িত, তা বের করার চেষ্টা চলছে। কয়েকজনকে শনাক্তও করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী অন্য অনেকের মতো চক্রের হোতা আবু আহম্মেদও পলাতক রয়েছেন। তবে মোবাইল ফোনে সমকালের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এ সময় আবু দাবি করেন, স্বর্ণবার চোরাচালানে তার কোনো গ্যাং নেই। আর তার বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, তা মিথ্যা ও বানোয়াট।