বনবাসী আমার মনটা বাস করে এক নাগরিক দেহে। তাই সুযোগ পেলেই ছুটে যাই, 'যে-জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা এই জেনে'ও। চা বাগানের স্নায়ু শীতল করা হাওয়া মেখে, ছড়া দেখে থামি। ছড়া বলতে ঝরনা ধরে নিতে পারেন। যদিও ছড়াকে পুরোপুরি ঝরনা বলা যায় না। 'দেখ তো বনের কাছে' নিজেকেই বলছিলাম আর মাঝেমধ্যে কারণে-অকারণে থেমে আঁকাবাঁকা মাটির পথ ধরে কাঁকড়াছড়াপুঞ্জিতে পৌঁছাতে সঙ্গীদের চেয়ে বেশ একটু দেরি করে ফেললাম।
খাসিরা গ্রামকে পুঞ্জি বলে। আমরা সাধারণত খাসিকে খাসিয়া বলে ডাকি, ওদের গ্রামকে বলি পানপুঞ্জি। পানপুঞ্জিকে পানজুম বলাটাই ঠিক হয়। কাঁকড়াছড়ায় পৌঁছে শুনলাম, একসময় পাশের ছড়ায় প্রচুর কাঁকড়া পাওয়া যেত বলে এই পুঞ্জির নাম কাঁকড়াছড়া। প্রথম যে টিলা পেলাম, সেখানে চা বাগান আছে। ওখানে টিলা কেটে হাঁটার পথ বানিয়েছে রেহানা চা বাগান পক্ষ। কয়েকবার হাতবদল হয়েছে চা বাগানটার।
পথের কাটা মাটি লালচে রঙের। কিছু পথ পেরিয়ে চিকন একটা ছড়া দেখা গেল, এটাই কাঁকড়াছড়াপুঞ্জি। এর অবস্থান মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায়। ছড়া দিয়ে কুলকুল শব্দে পানি বয়ে যাচ্ছিল। বাঁশের ছোট সাঁকো পার হলাম। আরেকটা টিলায় ছেলেরা বল খেলছিল। এখানে বল খেলতেন এই পুঞ্জির সবচেয়ে প্রবীণ বাসিন্দারাও। এই মাঠ এখন দখলের পথে। এখানকার জিংত্যাপ বা শ্মশানও দখল হয়ে গেছে। বছর কয়েক আগে মান্দি নারী মেরুনী রুরাং মারা গেলে তার ছেলে পানগাছ তুলে মাকে কবর দিয়েছেন। আমার জানা ছিল না, খাসিপুঞ্জিতে মান্দিদের দেখা পেয়ে যাব। গাছের পাশে বসে ছিল দুটো মেয়েবাচ্চা। পুঞ্জির প্রথম সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই গ্রাম শুরু হলো। মেয়ে দু'জনকে দেখে বিস্মিত হই, এখানে মান্দি মেয়ে কেন? সিলেট, মৌলভীবাজারের চা বাগানে মান্দি আছে জানি। কিন্তু খাসিপুঞ্জিতে আচিক স্বর? জানা গেল, এই পুঞ্জিতে মোট ১৭টি ঘরের মধ্যে আটটি মান্দিদের, একঘর বাঙালিও আছে। বাঙালি মেয়েটার মা-বাবা এদিকে কোনো কাজে এসেছিলেন। পরে মেয়েটাও পানচাষি হয়ে রয়ে গেছে এই পুঞ্জিতে। শুধু কাঁকড়াছড়ায় নয়, মান্দি আর খাসিরা যেখানেই সংখ্যায় কমে গেছে, সেসব জায়গায় একসঙ্গে বসত গড়ে তুলছে। গত আট বছরে এই পুঞ্জির ৩০টা ঘর উচ্ছেদ হয়েছে। পড়ে আছে তাদের ফেলে যাওয়া মাটির ঘরগুলো।
পুঞ্জি সচরাচর বাজার, পথ বা নাগরিক বসতি থেকে দূরে হয়। নিভৃতি ছাড়া স্বভাববাস হয় না তো। অনেকে বলে, অত জমি আদিবাসীরা কী করবে? জমির সব না নিলে, জমির সঙ্গে কেবল বাস করলে অত জমিই লাগে। ঘর বড্ড আপন কিছু। খুব দুঃখী মানুষ, দিনহীনজনেও নিজের কুঁড়েঘরকে মায়া করে। ছেঁড়া পলিথিনের ছাপড়া ঘরেও কত অমূল্য, কত প্রিয় কিছু থাকে মানুষের। পুরোনো জংধরা টিনের কৌটাজুড়ে হয়তো শিশুর প্রথম বিস্কুট খাওয়ার স্মৃতি লেগে থাকে কখনও। উদ্বাস্তু হওয়ার বেদনা বড় কঠিন।
গড়ে শ তিনেক বড় গাছ কাটলে একটা পরিবারকে উঠিয়ে দেওয়া যায়। এই পদ্ধতিতেই চা বাগান বছরে আড়াই শতাংশ বাগান বৃদ্ধি করে আর আদিবাসীরা আশপাশে সরে যেতে যেতে, গরিব হতে হতে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তারা বহুকাল ধরে নীরবে এসব এলাকায় স্বনির্ভর এবং সুখী জীবনযাপন করছিল। রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শন তাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে। চা গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য। পানগাছও ৫০ বছর ফলন দেয়। চা বাগানের মালিকরা সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে আদিবাসীদের সাব-লিজ দেয়। চা বাগানকে লিজ না দিয়ে আদিবাসীদেরও জমি লিজ দেওয়া যায়, যা থেকে উচ্চ অঙ্কের রাজস্ব আদায় করলেও প্রকৃতির সুরক্ষা হতো এবং আয় বাড়ত সরকারের। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল সংস্কৃতির খাসিপুঞ্জিগুলো বাংলাদেশকে বহু বৈচিত্র্যের দেশ হিসেবে মর্যাদা বাড়াত। উন্নয়নে বৈষম্যের সূচক ধাই ধাই করে বেড়ে যেত না। এসব ভাবার সময় হয়নি হয়তো কারও। চাম্বিল, বণাকের মতো বড় গাছ কাটার সঙ্গে সঙ্গে মৌলভীবাজার, সিলেটের পানপুঞ্জিগুলো যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি এখানে এখন আর পাখি, বনরুইদের দেখা পাওয়া যায় না। বুনো মাশরুমও নেই বনে।
বাংলাদেশের মান্দি ও খাসি জাতি দুটি মাতৃসূত্রীয় হলেও তারা আলাদা ভাষা, রীতি এবং কৃষ্টি চর্চা করে। মান্দিদের মতো খাসি মেয়েরাই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। পারিবারিক সিদ্ধান্তের জন্য খাসি মেয়েরা নিজের মামা-নানার ওপরে বেশি ভরসা করে। খা অর্থ জন্ম, সি অর্থ মা। যাপাং, খা, খং লিংডো, নং, পাংখন, মাজাওর মতো অনেক গোত্র থাকলেও খাসিরা বিশ্বাস করে, তারা এক মা থেকে জন্মেছে। মান্দিরা জন্মেছে আচ্চু জানি আর আম্বি ফিলদি থেকে। যদিও মান্দি বিশ্বাসে বাগবা হলেন সকল প্রাণীর মা। খাসি পরিবারে মা-ই কর্ত্রী। পুরুষেরা বিয়ের পরে স্ত্রীর বাড়িতে থাকতে আসে এবং নিজের মায়ের বাড়ির সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা থাকলেও স্ত্রীর সংসারে ততটা ভূমিকা থাকে না। বাড়িতে স্ত্রী, শাশুড়ি এবং মামাশ্বশুরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়। সম্পত্তির উত্তরাধিকারী 'কা-খাদ্দু' সচরাচর ঘরের ছোট মেয়ে হয়ে থাকে। ছোট মেয়েটির যেমন সম্পদ থাকে, তেমনই মা-বাবা, শ্বশুরবাড়িফেরত ভাই এবং আত্মীয়দের দায়িত্বও থাকে।
খাসিবাড়িতে আগন্তুক-অতিথি এলে সচরাচর মান্ত্রীর ঘরেই বসতে দেওয়া হয়। মান্ত্রী হলো পুঞ্জি বা গ্রামপ্রধান। কাঁকড়াছড়ায় বসার পর আমাদের সম্ভাষণ জানালেন শতবর্ষী একজন ইয়াও বা দিদিমা, যার পুরো নাম কাকা লাকাছিয়াং। খাসিদের ঘরে অতিথিকে চা দিয়ে আপ্যায়ন করাটা অবধারিত। সেইসঙ্গে অনুষঙ্গ হিসেবে থাকবে ঝাঁজালো খাসি পান। কখনও কখনও ঐতিহ্যবাহী অন্য খাবার বা পানীয়ও দেওয়া হয়। খাসি পানের চাহিদা বেশি হওয়ার কারণে বাংলাদেশের অন্য আদিবাসীদের তুলনায় তারা বেশ সচ্ছল। তবে কিছুদিন আগের এই সচ্ছলতা এখন আর থাকছে না সব পুঞ্জিতে। এ বছরও কাঁকড়াছড়াপুঞ্জি, আগারপুঞ্জি ও বনাখলাপুঞ্জিতে খাসিদের পানজুমে তাণ্ডব চালিয়েছে চা বাগান পক্ষ এবং বহিরাগত বাঙালি সন্ত্রাসীরা।
পান চাষ খাসিদের প্রায় সবার প্রধান জীবিকা। পান চাষে খরচ বেশি নয়, অথচ আয় বেশি। তবে খুব পরিচ্ছন্ন হয়ে পানক্ষেতে যায় খাসিরা। কারণ, একবার পান গাছে উৎরাম রোগ শুরু হলে বাগান উজাড় হয়ে যায়। উৎরাম এক ধরনের ছোঁয়াচে রোগ, যা একবার শুরু হলে পুরো পানজুম নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং এর ফলে খাসিপুঞ্জি উচ্ছেদ হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন সময়। বড় গাছ জড়িয়ে থাকা এই পানলতা সারাবছর ফলন দেয়। তবে হেমন্তে ফলন হয় সবচেয়ে বেশি। একটা গাছ ৫০ বছরও ফলন দিতে পারে। একবার পানজুম করলে এবং জুমে পচন না হলে কেবল পানক্ষেত পরিস্কার রাখলেই চলে। আর সেসব মহাজনের কাছে অথবা বাজারে বিক্রি করে খাসিদের সংসার চলে।
অন্য সব আদিবাসীর মতো খাসিরাও জমির ব্যক্তিগত মালিকানায় বিশ্বাস করে না। জমি তাদের কাছে মা এবং সামাজিকভাবেই সেগুলো ব্যবহার করতে হয়। খাসিপুঞ্জির জমি পরিবারগুলোকে ভাগ করে দেন খাসি মান্ত্রী। কাঁকড়াছড়ার ১৭ পরিবারের কথা বলছিলাম। সাত-আট বছর আগেও সেখানে ৪৭টি পরিবার ছিল। চা বাগান মালিক বাগান সম্প্রসারণের জন্য কিছু বড় গাছ কাটে, সেইসঙ্গে কাটা পড়ে খাসিপুঞ্জির পানগাছগুলোও। আমরা কাঁকড়াছড়ায় যাওয়ার মাসখানেক আগে মিন্টু রেমা, রাবিয়া বেগম, রেলিস চেল্লা- কাঁকড়াছড়ার এই তিনজনের ছয় একর জমির পানজুম নষ্ট করা হয়েছে। আগারপুঞ্জিতে রিনোস পডুওয়ংয়ের ২১ বছর বয়সী পানজুম উজাড় করে দেওয়া হয়েছে, যে জুমে হাজারখানেক পানগাছ ছিল। আমরা ঘুরে আসার পর থেকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও বড়লেখায় পুঞ্জিগুলোর মানুষ পাহারা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছিলেন তাদের গাছ। আসল কথা হলো চা বাগানের জন্য জমি লিজ দেওয়ার শর্তের মধ্যে আছে, প্রতিবছর চা বাগান সম্প্রসারণ করতে হবে শতকরা আড়াই শতাংশ। বাগান মালিকরা সরকারের কাছ থেকে জমি লিজ নেওয়ার পর প্রথমে বছর দশেকের জন্য সাব-লিজ দেয় পানচাষিদের। পরের ১০ বছর লিজ না দিলেও চাষিদের হাতেই থাকে পান জড়ানো বড় গাছগুলো। এই সময়ে প্রতিবছর কিছু গাছ কাটেন বাগান মালিকরা। গড়ে বছরে গোটা দশেক চাষির পানজুম নষ্ট করা গেলেই ১৫ বছরে গড়া একটা বসতি তুলে দেওয়া যায়। এ প্রক্রিয়া একইভাবে চলতে থাকে নানা এলাকায়। তো এই গাছগুলো, জমিগুলো কাদের? এসব অঞ্চলে বহুকাল আগে থেকেই আছে গাছগুলো। কখনও খাসজমি, কখনও সংরক্ষিত জমি হিসেবে এসব সরকারের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। নিয়ন্ত্রণবাদীরাই ক্ষমতাধর, কারণ তারা ক্ষমতাবাদী। এমন অবস্থায় দলবেঁধে মাটিকে মা ভেবে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাকারী মানুষের সংবেদকে সহ্য করা আমাদের মতো সভ্য মানুষের ধৈর্যে কুলাবে না। তাই প্রকৃতিকেই নিজের সুরক্ষা দিতে হবে হয়তো। তার এই মানব বন্ধুরা মানব অবন্ধুদের চাপে উদ্বাস্তু হতে হতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে কি? হয়তো অনেকে হারিয়ে যাবে, অনেকে যাবে না।
খাসিরা নিজ ঐতিহ্য ও কৃষ্টি সংরক্ষণে যথেষ্ট যত্নশীল। তবে তারা সংস্কার বিসর্জন দিয়ে রূঢ় হতে পারছেন না তো। যেসব আইন তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেসব আইন তো তারা বানায় না। মিসাইল নিয়ে বা জঙ্গি বোমা হাতে তারা ধ্বংস করতেও পারে না। এই দৃঢ়তা তাদের কতখানি সুরক্ষা দেবে, তার উত্তর আছে রাজনীতিবিদদের কাছে। তার উত্তর হয়তো প্রাণপ্রকৃতিও জানে। হয়তো পাহাড় জানে। হয়তো পান বাগান জানে।
'তোমার দেহ আমি নিলাম, আমার দেহ তুমি নিয়ো'- ওষুধের জন্য গাছের দুটি পাতা ছেঁড়ার জন্য খাসি নারী চিকিৎসকের প্রার্থনা ছিল এটা। এ কাহিনি দুই দশক আগে শুনেছি পাভেল পার্থের কাছে, যখন সে উদ্ভিদবিজ্ঞান পড়ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কয়েক দিন আগে পর্যন্তও খাসিরা হাসপাতালে যেতেন না একেবারেই। খাসি ও মান্দি- মাতৃতান্ত্রিক উভয় সমাজেরই নিজস্ব চিকিৎসাপদ্ধতি খুব কাজের। খাসিরা তাদের নিত্য অভ্যাসে সৎ জীবনযাপনের চেষ্টা করে। জীবন তাদের কাছে শান্ত-ধ্যান।