স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে ভিডিও গেমস ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে পড়াশোনায় চাপ না থাকায় ভিডিও গেমস নির্ভর হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। ভিডিও গেমসের আসক্তিতে বিপথগামী হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। এই সুযোগে দেশে হু হু করে বাড়ছে ভিডিও গেমিংয়ের বাজার। জনপ্রিয় গেম নির্মাতা কোম্পানিগুলো দেশের বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের এসব গেমস নির্মাতা কোম্পানি সরকারের কোষাগারে জমা দিচ্ছে না ট্যাক্স-ভ্যাট বাবদ কোনো অর্থ। মূলত দেশে 'ভিডিও গেমিং গাইডলাইন' জাতীয় কোনো নীতিমালা না থাকায় সব ধরনের গেমস যেমন উন্মুক্ত রয়েছে, তেমনি সহিংস গেমসসহ ইন্টারনেটভিত্তিক অশ্নীল কনটেন্টনির্ভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝুঁকে পড়ছে তরুণরা।
গত সোমবার হাইকোর্ট দেশে পাবজি ও ফ্রি ফায়ারের মতো অনলাইন গেমের পাশাপাশি টিকটক, বিগো লাইভ, লাইকির মতো অ্যাপ তিন মাসের জন্য বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পর নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বিশ্বজুড়েই ভিডিও গেমসের রমরমা বাণিজ্য। চাইলেও সময়ের চাহিদাকে অস্বীকার করা যাবে না। তবে তরুণ প্রজন্মকে গেমিং আসক্তি থেকে সুরক্ষার পাশাপাশি গেমিং কোম্পানিগুলো থেকে রাজস্ব আদায়ে সরকারকে দ্রুত 'ভিডিও গেমিং গাইডলাইন' তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
দেশে মোবাইল ফোন নির্মাতা ও ব্যবসায়ীদের সূত্র মতে, দেশে বর্তমানে চার কোটিরও বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন। যার অধিকাংশই ফোনে ভিডিও গেমস খেলে থাকেন। দেশে গেমসের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে পাবজি কিংবা ফ্রি ফায়ার, ফোর্টিনাইটের মতো সহিংস ব্যাটল গ্রাউন্ড গেমস। গেমে প্রতিযোগীদের হারিয়ে ভালো অবস্থান তৈরিতে বিভিন্ন উপকরণ (যুদ্ধাস্ত্র, পোশাক, চরিত্র প্রভৃতি) বিক্রি (ইন গেম পারচেজ) করে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা আয় করছে নির্মাতা। অভিযোগ রয়েছে, ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিতে তৃতীয় পক্ষের সহায়তায় বিকাশ কিংবা নগদের মাধ্যমে গেমারদের থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে গেমসের বহুজাতিক নির্মাতারা। দেশে পাবজি ও ফ্রি ফায়ার উভয় গেমস কোম্পানির প্রচার-প্রচারণায় এজেন্সি থাকলেও কোনো কর্মকর্তা কিংবা অফিসিয়াল কার্যক্রম নেই।
চলতি বছর ৭৭৬ কোটি টাকায় মুনফ্রগ ল্যাবের মালিকানাধীন ঢাকাভিত্তিক বাংলাদেশি গেমিং কোম্পানি 'উল্ক্কা গেমস' অধিগ্রহণ করে সুইডিশ গেম নির্মাতা স্টিলফ্রন্ট গ্রুপ। লুডু, তিন পাত্তি, কার্ড ক্লাবের মতো জনপ্রিয় ৫০ গেমসের নির্মাতা এ প্রতিষ্ঠানটি গত বছর বাংলাদেশ সরকারকে চার কোটি ৯৮ লাখ টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়েছে। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি আট কোটি টাকার মতো ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে পারে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। সর্বশেষ সরকারের চাপে গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজন ভ্যাট দিলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে পাবজি, ফ্রি ফায়ারের মতা গেমস নির্মাতারা।
ভিডিও গেমস সংশ্নিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, বিশ্বজুড়ে ভিডিও গেমিংয়ের বাজার প্রতি বছর গড়ে ২৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। চলতি বছরই বিশ্বজুড়ে ভিডিও গেমসের বাজার ২০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
জরিপ প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টার এক হিসাবে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বিশ্বজুড়ে শীর্ষে থাকা পাবজি আয় করেছে ৭৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার, দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে ফ্রি ফায়ার আয় করেছে ২৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার, কল অব ডিউটির মোবাইল সংস্করণ আয় করেছে ১৮ কোটি ২০ লাখ ডলার, নাইভস আউট আয় করেছে ১৩ কোটি ৩০ লাখ
ডলার।
গেমসের এ বিশাল বাজার ধরতে ভিডিও গেমস নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ডেভেলপার তৈরিতে ২৮১.৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে 'মোবাইল গেমস অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট'
শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। এ প্রকল্প থেকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে গেমস ও অ্যাপস তৈরির পাশাপাশি দেশের ১০ হাজার তরুণ-তরুণীকে গেমস ডেভেলপার হিসেবে তৈরিতে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে আইসিটি বিভাগ। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ভিডিও গেমস শিল্প থেকে বিলিয়ন ডলার আয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভিডিও গেমস আসক্ত তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষা দিতে 'ভিডিও গেমস গাইডলাইন' জাতীয় নীতিমালার বিকল্প নেই। যুগোপযোগী নীতিমালা থাকলে ডেভেলপারদের যেমন স্পষ্ট ধারণা থাকবে কোন ধরনের গেমস তারা বানাতে পারবেন, গেমিং আসক্তি থেকেও তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা যাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো গেম দেশের প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করলে সেটি নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। তবে আসক্তির কথা বলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া দুঃখজনক। আমরা কী ধরনের গেমস ডেভেলপ করব, তা নিয়ে দ্বিধায় আছি, কেননা একটা ভালো গেমস নির্মাণে ব্যাপক শ্রমের পাশাপাশি বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে।
উল্ক্কা গেমসের প্রধান নির্বাহী জামিলুর রশিদ সমকালকে বলেন, গেমিং ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নিতে একটা সরকারি নীতি থাকা জরুরি। নীতিমালা হলে গেমার (খেলোয়াড়) ও ডেভেলপার উভয়ের জন্যই লাভ। ডেভেলপার জানবে সে কোন ধরনের গেম ডেভেলপ করবে, আবার কোন গেম কে কতক্ষণ খেলতে পারবে কিংবা গেম খেলে সর্বোচ্চ কত অর্থ খরচ করা যাবে এ সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা থাকবে। তিনি বিভিন্ন দেশের ভিডিও গেমস পলিসির উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভিডিও গেমস নীতিমালায় গেমের ক্যারেক্টারের (চরিত্র) নূ্যনতম কী পোশাক কতটুকু পরিমাণ থাকতেই হবে, কতটুকু রক্তারক্তি দেখানো যাবে, কোন বয়সীরা কোন গেমস খেলতে পারবে- এরকম নানা বিষয় স্পষ্ট থাকে। তিনি ভারতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভারতে সংস্কৃতিগত পার্থক্য থাকায় একই গেমস ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়। বয়স ভেদে দিনে গেম খেলার সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড সার্ভিসেস (বেসিস) সূত্র বলছে, দেশে বর্তমানে শতাধিক প্রতিষ্ঠান ভিডিও গেমস নির্মাণ ও ব্যবসা সংশ্নিষ্ট কাজে যুক্ত রয়েছে। বেসিস সভাপতি আলমাস কবীর সমকালকে বলেন, বৈশ্বিক চাহিদার প্রেক্ষাপটে দেশে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান ও গেমস ডেভেলপার তৈরি হচ্ছে। এ খাতে আমাদের দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে তরুণদের রক্ষা করে কীভাবে এ খাতে আমরা এগিয়ে যেতে পারি, তা বের করতে হবে। গেমস নিষিদ্ধ না করে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড মেনে রেটিং করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে 'গাইডলাইন'ই হতে পারে রক্ষাকবচ।
এশিয়ার ও ওশেনিয়া অঞ্চলের ২৪টি দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক সংগঠন এশিয়ান ওশেনিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের (অ্যাসোসিও) সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ এইচ কাফি সমকালকে বলেন, 'ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে কর্মযজ্ঞ শুরুর এক যুগ অতিবাহিত হতে চললেও এখনও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কোনো পলিসি নেই, এটা সত্যিই আশ্চর্যের। তরুণ প্রজন্মের সুরক্ষার পাশাপাশি বিলিয়ন ডলারের গেমিং বাজার ধরতে যুগোপযোগী পলিসির বিকল্প নেই। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যেন কম্পিউটার-ল্যাপটপ-ফোনের বাইরে খেলাধুলার সুযোগ পায় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।'
এ বিষয়ে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি সমকালকে বলেন, ভিডিও গেমিংয়ে আমাদের দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে বিনামূল্যে আমরা প্রায় ১০ হাজার গেমস ও অ্যাপস ডেভেলপার তৈরি করেছি। তাদের অনেকেই আন্তর্জাতিক মার্কেট থেকে আয় করছেন। মোবাইল গেম অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পটি পরবর্তী ফেজে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। এ খাতের বিকাশের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের সুরক্ষায় ভিডিও গেমিং নীতিমালা তৈরিরও উদ্যোগ নেব আমরা।'
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেন, 'পাবজি, ফ্রি ফায়ারসহ কয়েকটি গেমস ও অ্যাপসে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি এসব গেমস-অ্যাপস ক্ষতিকর কিনা, তা যাচাইয়ে কমিশন গঠনে আদালতের আদেশের কথা গণমাধ্যম থেকে শুনেছি। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আমাদের হাতে আদালতের রায়ের কোনো কপি আসেনি। আদালতের নির্দেশনা পেলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। আর এসব গেমস ক্ষতিকর কিনা এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, আমরা গেমস বানানো শেখানোর জন্য বিনিয়োগ করছি, বিলিয়ন ডলারের এ বাজার ধরতে তরুণ ডেভেলপার তৈরি করছি। তবে গেমসের মধ্যে কিছু কিছু ক্ষতিকর থাকতে পারে। কিছু কিছু গেমস খেলা উচিত না কিংবা খেলতে দেওয়া উচিত না এরকম থাকতে পারে। পাবজি বা ফ্রিফায়ারের মতো গেমস তো নতুন কিছু না। যেহেতু ইন্টারনেটের প্রসার হয়েছে, নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়ের কাছে ডিভাইস পৌঁছে গেছে, ফলে তারা এগুলো খেলতে পারছে। দুটি গেমস বন্ধ করলে খুব বেশি লাভ হবে বলে মনে হয় না, কেননা ইন্টারনেটে এ ধরনের অসংখ্য গেমস রয়েছে। কাজেই গেমস বন্ধ না করে আসক্তিটা কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, এটা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা রাখতে হবে।'


বিষয় : ভিডিও গেমস নীতিমালা

মন্তব্য করুন