১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকারের আমলে প্রণীত এনাম কমিটির সুপারিশ ও জনবল কাঠামো অনুযায়ী চলছে প্রায় সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর। গত ৩৮ বছরে জনবল কাঠামো হালনাগাদ করতে পারেনি সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, পুরোনো কাঠামো দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, যেসব দপ্তরের ক্ষমতা বেশি, তারা ইচ্ছামতো নতুন পদ সৃজন করে নিয়েছে। যেগুলোর ক্ষমতা কম, সেগুলোতে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে। এতে সরকারি কিছু অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দিনরাত কাজ করছেন, আবার অনেক অফিসে তেমন কাজের চাপ নেই।

জানা যায়, সরকারি সব দপ্তরের টিওঅ্যান্ডই (টেবিল অব অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ইকুইপমেন্টস) যুগোপযোগী ও হালনাগাদকরণের লক্ষ্যে সরকার বহুবার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু দপ্তর, অধিদপ্তরসহ পুরোপুরিভাবে একটি মন্ত্রণালয়ও জনবল হালনাগাদ করতে পারেনি। অবশেষে আজ রোববার বিকেল ৩টায় ফের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সরকারি দপ্তরের বিদ্যমান পদের বিষয়ে পর্যালোচনা এবং মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অর্গানোগ্রাম হালনাগাদকরণের লক্ষ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আয়োজন করা হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কে এম আলী আজম।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে পে-কমিশন এবং অ্যাডমিনিস্ট্র্যাটিভ অ্যান্ড সার্ভিসেস রি-অর্গানাইজেশন কমিটি (এএসআরসি) গঠন করেন। পে-কমিশনের প্রতিবেদন ১৯৭৩ সালেই বাস্তবায়ন শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় পরে প্রতি পাঁচ বছর পর পে-কমিশন গঠন করা হচ্ছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে পে-কমিশন গঠনের মাধ্যমে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু অ্যাডমিনিস্ট্র্যাটিভ অ্যান্ড সার্ভিসেস রি-অর্গানাইজেশন কমিটির প্রতিবেদন ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে দেওয়া হলেও সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে দেশের সরকারি দপ্তরে জনবল নিয়ে এখনও জটিলতা রয়ে গেছে। অথচ ওই প্রতিবেদন থেকে তথ্য নিয়ে আনঅফিসিয়ালি অনেক কিছু হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৩ সালে 'জনবল সংক্রান্ত মার্শেল ল কমিটি গঠন' করা হয়। এই কমিটির উদ্দেশ্য ছিল সিভিল সার্ভিসের কমন পদ ও অতিরিক্ত জনবল কমানো। কমিটির প্রধান ছিলেন ব্রিগেডিয়ার এনাম আহমেদ। এনাম কমিটি জনবলের সেটআপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। জনবলকে বলেছিল অতিরিক্ত জনবল। অতিরিক্ত জনবল তারা ছাঁটাই করেননি। ওই অতিরিক্ত জনবল বিভিন্ন দপ্তরে যুক্ত করেছিলেন। এনাম কমিটি যে প্রশাসনিক জনবল ও নিয়োগ নিয়ে কাজ করেছিল, পরবর্তী সময়ে আর কোনো সরকার সেটা করেনি।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ সমকালকে বলেন, ১৯৭২ সালে প্রশাসন সংস্কার সংক্রান্ত যে রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছিল, সেটি যদি অলোর মুখ দেখত, তাহলে বর্তমান প্রশাসন আরও গতিশীল হতো। এখন যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, এটি যদি বাস্তবায়ন হয়, জনবল সংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি হয়, তাহলে প্রশাসন আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এটি আরও আগে করা উচিত ছিল।

তিনি বলেন, জনবল বাড়ালেই হবে না। জনবল যাতে যথাযথভাবে কাজে লাগে, সেটাও চিন্তা করতে হবে। এ জন্য এনাম কমিটির মতো একটা কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী সমকালকে বলেন, জনবল নিয়ে মন্ত্রণালয়গুলোর নতুন চ্যালেঞ্জ কী আছে, সরকারের মিশন ভিশন অনুযায়ী ভবিষ্যতে কী করতে হবে, এসব নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে। হালনাগাদ হলে সরকারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও কাজ করা সহজ হবে। কাঠামো পরিবর্তন হলে যোগ্যতা অনুযায়ী পদায়ন করা যাবে।

সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার সমকালকে বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে চান না। তাই দীর্ঘদিন ধরে জনবল হালনাগাদ হচ্ছে না। জনবল কাঠামো হালনাগাদ করতে হলে বাইরের লোক দিয়ে যেভাবে পে-কমিশন গঠন করা হয়, সেভাবে সাবেক কোনো দক্ষ সচিবদের দিয়ে কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তারা একটা প্রস্তাব তৈরি করে দেবেন। এরপর সচিব কমিটি, মন্ত্রিসভা কমিটি, সুশাসন সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আছে, এসব দেখে বাস্তবতার নিরিখে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ করবেন। প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন।