অনলাইনে ভিডিওচিত্রে দেখানো দুটি হাতের পেছনে ছুটছেন গোয়েন্দারা। কার হাত তা জানতে চলছে নানামুখী তদন্ত। এক বছরের বেশি সময় ধরে এই হাত দুটি দিয়ে দেখানো হচ্ছে- কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় কী কী ব্যবহার করে বোমা বানানো যায়। ভিডিওতে কখনোই তার চেহারা দেখানো হয় না। দেশে সক্রিয় উগ্রপন্থিদের কাছে ওই হাতের ব্যক্তি 'বোমার মাস্টার' হিসেবে পরিচিত।
ডিএমপির বোমা নিষ্ফ্ক্রিয়করণ দলের প্রধান এডিসি রহমত উল্লাহ চৌধুরী সমকালকে বলেন, হাত দুটি কার এটা বের করার চেষ্টা করছি। জঙ্গিদের বোমা 'কুক-বুক' তার তৈরি করা। নানা আলামত বিচার-বিশ্নেষণ করে বোমা তৈরির কারিগরের আসল পরিচয় জানতে চাই। এটা সম্ভব হলে বোমা নেটওয়ার্ক প্রায় পুরোটা ভাঙা যাবে।
সংশ্নিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অনেক দিন ধরেই অনলাইনে জঙ্গিদের বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে একটি চক্র। জঙ্গিরা যেসব গ্রুপে উগ্র মতাদর্শীদের জড়ো করে এসব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে সেখানে প্রায় সবসময় ওই ব্যক্তির ভিডিও দেখানো হয়। এটিকে বোমা তৈরির প্রাথমিক ম্যানুয়াল হিসেবে বিবেচনা করে তারা। যখন কেউ ওই ভিডিও দেখেও বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নিতে ব্যর্থ হয় তখন সরাসরি যোগাযোগ করা হয়। অনলাইনে ফোন করে কোথায় সমস্যা রয়েছে সেটা বলে দেয় জঙ্গিরা।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে বোমা তৈরির এই ভিডিও গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। সম্প্রতি গ্রেপ্তার এক জঙ্গি এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তথ্য দেয়। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের হাতে গ্রেপ্তার ওই জঙ্গির নাম ছিল জাহিদ হাসান। তবে জাহিদ রিমান্ডে পুলিশের কাছে দাবি করে, যার ভিডিও অনুসরণ করে বোমা তৈরির কৌশল শেখানো হয় সে ওই ব্যক্তি না। আসল ব্যক্তির নাম-পরিচয়ও তার জানা নেই। তবে তারা ওই ব্যক্তিকে গুরু হিসেবে মানে। সংগঠনের রীতি মেনে কখনও তার পরিচয় সম্পর্কে কেউ জানতেও চায়নি। তবে অনলাইনের কোন প্ল্যাটফর্মে কখন কীভাবে বোমা তৈরি শিখতে আগ্রহীরা যুক্ত হবে- এটা আগে থেকেই জানানো হয়। ছোট ছোট স্লিপার সেলে ভাগ হয়ে এ কাজটি করা হয়।
জঙ্গি কর্মকাণ্ডের ওপর এক দশকের বেশি খোঁজ রাখেন এমন একজন কর্মকর্তা জানান, দেশে সক্রিয় জঙ্গিদের মধ্যে জামা'আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) দুর্ধর্ষ জঙ্গি মিজান ছিল বোমার সবচেয়ে বড় কারিগর। ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে জঙ্গিরা বোমা মিজানসহ তিনজন উগ্রপন্থিকে ছিনিয়ে নেয়। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর ভারতে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে দেশটির কারাগারে বন্দি জেএমবির বোমার এই কারিগর। পুরোনো জেএমবির নেতা বোমা মিজানের পর নব্য জেএমবির বেশ কয়েকজন বোমা তৈরিতে দক্ষ ছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম রাইসুল ইসলাম ফারদিন। নব্য জেএমবি নেতা ফারদিন বগুড়ার একটি বাসায় বোমা বিস্ম্ফোরণে মারা যায়। বোমা তৈরিতে দক্ষ আরেক জঙ্গি মাইনুল ইসলাম মুসা। সিলেটে একটি অপারেশনে মারা যায় মুসা। এরপর দেশে সক্রিয় জঙ্গিদের মধ্যে বোমা তৈরিতে দক্ষ হিসেবে জাহিদ হাসানের নাম সামনে আসে। সম্প্রতি তাকে গ্রেপ্তারের পর জঙ্গিদের বোমা তৈরির নেটওয়ার্ক সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসতে থাকে। জেএমবির পলাতক শীর্ষ নেতা বিদেশে পলাতক মাহাদি হাসান জনের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে তার। অনলাইনে ইদাত-১, ইদাত-২, ইদাত-৩ নামে সেল পরিচালনা করে সেখানে জঙ্গিদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছিল সে। একেকটি সেলে ১৫-২০ জন রয়েছে। এই সেল থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে গত কয়েক বছরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক পুলিশ বক্স টার্গেট করে বোমা হামলা চালানো হয়।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে জঙ্গিদের তেমন বড় ধরনের হামলার করার মতো সক্ষমতা নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে তারা কোণঠাসা। আবার বোমা তৈরির কাঁচামাল আগের তুলনায় হাতের নাগালে পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়েছে।