রাজধানীর বনানী থানায় করা মাদক মামলায় চিত্রনায়িকা পরীমণির জামিন আবেদন দু'দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না- জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে পরীমণির জামিন আবেদন শুনানির জন্য ১৩ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করে বিচারিক আদালতের আদেশ কেন বাতিল করা হবে না, তাও রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশকে আগামী ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এই রুল জারি করেন। আদালতে পরীমণির পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না ও মজিবুর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবু এহিয়া দুলাল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান।
শুনানিতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় করা পরীমণির জামিন আবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে আইনজীবী মজিবুর রহমান বলেন, ঢাকার মহানগর দায়রা জজ পরীমণির জামিন আবেদনটি না শুনেই আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন। তখন মজিবুর রহমানকে মামলার এফআইআর থেকে পড়তে বলে হাইকোর্ট ঘটনার তারিখ (পরীমণির বাসায় অভিযান, মাদক জব্দ ও আটক) এবং এফআইআর দায়েরের তারিখ জানতে চান। জবাবে আইনজীবী বলেন, ঘটনার তারিখ এবং সময় হচ্ছে ৪ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। আর এফআইআর দায়েরের তারিখ ও সময় ৫ আগস্ট ৬টা ৪০ মিনিট। ঘটনার কত ঘণ্টা পর এফআইআর দায়ের করা হয়েছে- জানতে চান হাইকোর্ট। আইনজীবী বলেন, প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর। তবে এফআইআরে বলা আছে, পরীমণিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাড়ে ৪টায়। আদালত বলেন, তাহলে তো সময় আরও দুই ঘণ্টা বেড়ে যায়। এ সময় মজিবুর রহমান বলেন, পরীমণিকে গ্রেপ্তার ও এফআইআর দায়েরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ ধারা মানা হয়নি। এরপর তিনি এফআইআর পড়ে শোনানোর পাশাপাশি পরীমণির বাসা থেকে কী কী জব্দ করা হয়েছে, তার আংশিক পড়ে শোনান।
মজিবুর রহমান বলেন, এক লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং কাঠের ফ্রেমে রক্ষিত একটি সাদা জিপার ব্যাগে চার গ্রাম আইস/ক্রিস্টাল মেথ জব্দ করা হয়েছে। হাইকোর্ট তখন ক্রিস্টাল মেথ জিনিসটা কী, সেটা মাদক হিসেবে তফসিলভুক্ত কিনা- জানতে চান। জবাবে আইনজীবী বলেন, আইনে মাদক হিসেবে তফসিলভুক্ত নয়। এ পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মিজানুর রহমান বলেন, এটি এমফিটামিন গ্রুপের মাদক। পরীমণির আইনজীবী এ সময় বলেন, এটা এমফিটামিন গ্রুপের হলে সেটা আলাদা চিন্তা। কিন্তু যেটুকু উদ্ধার করা হয়েছে, তার আনুমানিক মূল্য ৪০ হাজার টাকা। এ ছাড়া আছে এলএসডি। তখন হাইকোর্ট এলএসডি তফসিলভুক্ত কিনা জানতে চান। জবাবে আইনজীবী মজিবুর বলেন, আছে। তবে সেখানে মাত্রার কথাও উল্লেখ আছে। কিন্তু এফআইআরে এলএসডির মাত্রার কথা উল্লেখ নেই। শুধু বলা হয়েছে এলএসডি।
একপর্যায়ে পরীমণির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্নার বক্তব্য শুনতে চান হাইকোর্ট। তখন আইনজীবী পান্না বলেন, এই মহিলার (পরীমণি) গ্রেপ্তার করার ২৬ ঘণ্টা পর মামলা দায়ের করা হয়েছে। আর রিমান্ডের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের কিছু নির্দেশনা আছে, যার একটিও নিম্ন আদালত অনুসরণ করেনি। এ পর্যায়ে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মিজানুর রহমান ঢাকার মহানগর দায়রার জজ আদালতের আদেশটি বেআইনি নয় বলে দাবি করেন। তখন হাইকোর্ট বলেন, জামিন আবেদনের বিষয়ে মহানগর দায়রা জজ আদালত রীতিনীতির বাইরে গিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ২১ দিন পর জামিন আবেদনের শুনানি, এটা জামিন আবেদনটি খারিজ করার শামিল। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল তখন বলেন, তার (বিচারক) সামনে তো অন্যান্য রেকর্ডও থাকতে হবে। তা ছাড়া তো তিনি আদেশ দিতে পারেন না। হাইকোর্ট বলেন, তিনি (মহানগর দায়রা জজ আদালত) না শুনলে অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত আছে, তারা শুনবে। কিন্তু এত লম্বা তারিখ দেওয়ার কী আছে? এরপর আদালত পরীমণিকে জামিন না দিয়ে তার জামিন আবেদনের শুনানি প্রশ্নে রুল জারি করেন।
গত ২২ আগস্ট মাদক মামলায় কারাগারে থাকা পরীমণির জামিন আবেদনের শুনানির জন্য ১৩ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন ঢাকার বিচারিক আদালত। পরে ওই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে বুধবার হাইকোর্টে আবেদন করেন পরীমণি। আবেদনে জামিনও চাওয়া হয়। পরীমণির পক্ষে আবেদনটি করেন আইনজীবী মজিবুর রহমান।
গত ৪ আগস্ট বিকেলে প্রায় চার ঘণ্টার অভিযান শেষে বনানীর বাসা থেকে পরীমণি ও তার সহযোগী দীপুকে আটক করে র‌্যাব। এ সময় পরীমণির বাসা থেকে বিভিন্ন মাদক জব্দ দেখানো হয়। ৫ আগস্ট র‌্যাব-১ বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য আইনে পরীমণি ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করে। এরপর তিন দফায় আদালতের নির্দেশে পরীমণিকে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। সর্বশেষ ২১ আগস্ট পরীমণিকে তৃতীয় দফায় এক দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করলে ঢাকা মহানগর হাকিম আশেক ইমাম তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।