বাংলাদেশের উত্তরে হাতিপাগাড় বলে একটা জায়গা আছে। উত্তরাঞ্চল বলতে কাগজ-কলমে যা বোঝানো হয়, বৃহত্তর ময়মনসিংহের এ জায়গা তার মধ্যে পড়ে না। গারো পাহাড়ের পাদদেশে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার এই হাতিপাগাড় গ্রাম উত্তর সীমান্তের ধারেই; গারো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এর অবস্থান। পাশেই গাঁওধারা কাঁটাবাড়ি গ্রাম। হাতিপাগাড় নামটি আমার কল্পনাকে উস্কে দিয়েছিল। যদিও হাতির এই বনে এখন আর হাতি নেই বললেই চলে, তবু আমার মনে ভাসছিল পাহাড়ি বনে হাতিদের দাপিয়ে বেড়ানোর দৃশ্য। হয়তো কোনো হাতি বাচ্চাকে দুধ খাওয়াত এখানে। তখন পাশেই একটা হাতির দল জলকেলি করত। কেউ হয়তো মহুয়া খেয়ে পেটভর্তি হলে নৃত্যও জুড়ে দিত। কেউ আবার আড্ডা-আসর জমাত। বাস্তবে তেমন দিন আর নেই। আজকাল এখানে হাতি আসে না। শুনেছি, গ্রামের উত্তর প্রান্তে তারা কখনও-সখনও আসে রুদ্রমূর্তি নিয়ে। শুধু নালিতাবাড়ী নয়, শেরপুর থেকে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পর্যন্ত সীমান্তের গ্রাম-গ্রামান্তরে মানুষ হাতি নামার আতঙ্কে দিন কাটায়।
হাতি তো গণেশের প্রতিমূর্তি। গণেশের মাথাটি হাতির মতো কেন- তার ব্যাখ্যা একাধিক পুরাণের নানা গল্পে দেওয়া আছে এবং ছোটবেলা থেকেই শোনা হয়েছে আমাদের। দুর্গার কাছে সবচেয়ে অনুগত সন্তান, যে মাকে প্রদক্ষিণ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড প্রদক্ষিণের গৌরব লাভ করেন, সেই গণেশ ঘটাপটা করে পূজিত হন না বোধ হয়, তবে সিদ্ধিদাতা এই দেবতা নিত্যপূজা পান হিন্দুদের বহু ঘরে।
আদিবাসীর মধ্যে সাঁওতালরা হাতিকে পূজা করত- এটা রবীন্দ্রনাথ সরেনের ধারণা। তিনি দিনাজপুরের একজন। এই সাঁওতাল লোকটি বাংলাদেশের সমতলের আদিবাসীদের শীর্ষস্থানীয় নেতা, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি। রবীনদা আমাকে জানালেন, সোহরায় পূজায় গরু-মহিষের পূজা করে সাঁওতালরা। কারাম পূজায় কড়ারা গণেশকে ভোগ দেয়। আসাম আর ঝাড়খণ্ডে পাহাড় ছিল। তাই হাতিও ছিল। রবীন্দ্রনাথ সরেনের দাদা আলমা সরেন কলম সরেন মাঠে হাতিতে চড়ে ঘুরতেন। হাতি সাধারণভাবে শান্ত প্রাণী হলেও মাঝেমধ্যে রেগে যায়। তারা দলবেঁধে চলাফেরা করে। নেতা যেদিকে, দল সেদিকে। রবীন্দ্র্রনাথ সরেনের ধারণা, 'আদিবাসীরা যেহেতু প্রকৃতিপূজারি; বাঘ-ভালুক, সাপকে পূজা দেয়; হাতিকে পূজা দেওয়া স্বাভাবিক, যাতে তারা ফসল নষ্ট না করে।'
শুধু পূজায় নিরস্ত করা যায় না। বনে খাবারের অভাব হলে হাতি তো লোকালয়ে নামবেই। খাবার খুঁজতে লোকালয়ে আসা হাতিকে মেরে ফেলার জন্য পানিতে বিদ্যুতের তার বসিয়ে রাখা হয়। হাতি যতই মনোহরা হোক, যুদ্ধ জানুক; হাতি পোষা সহজ কাজ নয়। হাতি পোষার কথা মনে এলেই তো আসে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের 'আদরিণী' গল্পের কথা। মালয়ালম লেখক ভৈকম মুহম্মদ বশীরের 'নানার হাতি' ভুলি কেমন করে। 'নানার হাতি' একটা মুসলিম পরিবারের শেষ বংশধরের স্মৃতি রোমন্থনের কাহিনি। আদর নামে হাতিটির খাবার জোগাতে না পারা জয়রাম ও তার পরিবারের গল্প 'আদরিণী' দিয়ে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বাংলা ভাষায় পশুপ্রেমের সাহিত্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন।
মানুষেরই যখন খাবারের অভাব, তখন হাতি বেঁচে থাকলে কী লাভ! কত যুগের বিবর্তনে হাতির জন্ম হয়েছে, সে কথা ভাবার অবসর কি আছে কারও? কিছুদিন আগে বানিজুড়ির দিকে একটা বাচ্চা হাতি মারা যাওয়ার পরও তার মা তাকে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছিল। মা হাতিটি বুঝতে পারেনি, তার সন্তান মৃত। খবরের কাগজে এসেছিল সেসব কথা। লোকে এখন নিয়মিত হাতি মারে।
হাতি যারা ভালোবাসত সেই দালু, কোচ, হাজং, মান্দিরা আর আগের মতো নেই। দালুদের দু-একটি বাড়ি আছে। মান্দিরা বাংলা ভাষা বলেও ভাষাহীন অসহায়ের মতো ভয় নিয়ে যাপন করছে জীবন। হাজংরা তো ১৯৬৪ সালের পরে এমনিতেই কমে গিয়েছিল এ দেশে। যারা আছে, তারা বংশপরম্পরায় প্রচলিত সংস্কৃতি বিস্মৃত হতে চলেছে। খাদ্যাভ্যাস পর্যন্ত বদলে গেছে তাদের। ভুলে গেছে প্রাচীন রান্নাবান্নাও।
কাঁটাবাড়ি গ্রামের ঝরনা চিসামের কাছ থেকে এমন একটা গল্প শুনেছিলাম। যে গাঁয়ের পোশাকি নাম গাঁওধারা। ঝরনা আজংয়ের মা মৃত্যুকালে মেয়ের কাছে মুরগির মাংসের গব্বা খেতে চেয়েছিলেন। আজং শব্দের বাংলা মাসি বা খালা। ঝরনা মাসিমা গব্বা রাঁধতে জানতেন না। মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের ইচ্ছা হয়েছিল পুরোনো দিনের খাবার খাবেন জীবনের শেষ সময়ে। অনেক দিন যদিও এ বাড়িতে গব্বা রান্না করা হয়নি। মধুপুরের চুনিয়া গ্রামের শেষ সাংসারেকদের প্রবীণতম মানুষ আমাদের জনিক আচ্চুও বছর তিনেক আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় গব্বা রাঁধতে বলেছিলেন তার পুত্রবধূকে। মায়ের বলে দেওয়া নিয়মে মুরগি খুব ছোট ছোট টুকরো করে গব্বা বানালেন ঝরনা মাসি। ছোট্ট টুকরোগুলোতে মাংসের অর্ধেক পরিমাণ কাঁচা লঙ্কা, অনেক নুন আর একটুখানি পেঁয়াজ দিয়ে সেদ্ধ করে পানি শুকিয়ে গব্বা তৈরি হলো মায়ের শেষ ইচ্ছা রাখার জন্য। মা খুশি হলেন। মায়ের কাছে যা সুস্বাদু, সেই রান্না কিন্তু ঝরনা মাসির ভালো লাগল না। ঝরনা মাসির সেই আধুনিকতা, যা রান্নায় তেলপ্রীতির মতো কঠিন জীবনের মুখোমুখি করে দিয়েছে। তার নানির নানি এই গ্রামেই জন্মেছেন। বলে রাখা ভালো, মান্দি মেয়েরা বিয়ে করে স্বামীকে ঘরে আনে। তাই দাদার বদলে নানির নানিকে দিয়েই বংশধারা জানাতে হবে। খাসিরাও মাতৃতান্ত্রিক, কিন্তু নারীদের সবচেয়ে বেশি স্বচ্ছন্দ গতি আছে মান্দি সমাজেই। কারও কারও মতে, কোচরা আগে মাতৃতান্ত্রিক ছিল, তবে এখন আর তেমন নয়। রবিন্স বার্লিংয়ের মতে, সুমাত্রাবাসী মিনাংকাবৌ, কেরলের নায়ার জাতি, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নাভাহোরাও মাতৃতান্ত্রিক।
ঝরনা মাসির নানির নানি যখন এই গ্রামে ছিলেন, পাঁচ পুরুষে অন্তত ১০০ বছর তো হলোই। এখানে এখন বাঙালি আর মান্দিদের মিলিত বসবাস। মান্দিরা শাড়ি পরছে। কথা বলে বাংলা-আচিক মিলিয়ে। আচিক মান্দিদের ভাষার নাম। ওই গ্রামের সোহেল রেমাকে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নাকি বলেছেন, তাদের বাড়ির মাঝখানে গুচ্ছগ্রাম হলেও কোনো অসুবিধে নেই। দরখাস্ত দিলে তারাও সেখানে ঘর পাবে। এ কারণেই সোহেলের পিসিমণি আর আমার আজং-ফাজংয়ের মন ভালো ছিল না। ফাজংকে বাংলায় মেসো বা খালু বলা হয়। আজংয়ের অনেক মায়া। তিনি আমার গায়ে হাত বুলাচ্ছিলেন, যেমন হাত বুলাতেন আমার বড় ফুফু। হাত বুলাতে বুলাতে বারবার বলছিলেন, 'কিছু বুঝি না, কী যে করব।'
রাজনৈতিক আগ্রাসনের ধরন যেমনই হোক, কোনো সমাজের মানুষই তাদের রীতি বদলায় না সহজে। ঝরনা মাসির বাড়িতেও ফাজং অবিনাশ ম্রং এক কোণে বসে চু বানাচ্ছিলেন। আজং অতিথিদের সঙ্গে আলাপে যোগ দিলেন। তবে দু'জনেরই মন খারাপ ছিল সামনের দিনের অনিশ্চয়তা নিয়ে। পরিবারটি নিজেদের জমির খাজনা দিত এককালে। ১৯৯০ সালের দিকে খাজনা নেওয়া বন্ধ হয়ে গেল কেন, তা তারা জানেন না। খাজনার চক্রে কীভাবে যেন তাদের জমি খাসজমি হয়ে গেল! এখন কিছুদিন হলো, এই জমিতে গুচ্ছগ্রাম হবে বলে শোনা যাচ্ছে। তাদের জ্ঞাতিগোষ্ঠী যেখানে বসবাস করছে, সেখানেই তাদের আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পাওয়ার জন্য আবেদন করতে হয়েছে। বাস্তুহীন হওয়ার দুশ্চিন্তা তাদেরও পেয়ে বসেছে।
মান্দিপাড়াগুলোতে উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার ক্রমটা বলি। প্রথমে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা দেওয়া হয়। মান্দিরা অত্যন্ত সহনশীল। ব্যাপক হারে ধর্ম বদলে আধুনিক শিক্ষায় যুক্ত হয়ে চেষ্টা করেছে আত্মরক্ষার। ধর্মান্তরের পরও তাদের সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক রীতিনীতি বদলে যায়নি। তারপর এলো বনকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় আনার দিন। বন বিভাগ মুখে বলেছে, তারা আদিবাসীর জন্য কর্মসৃজন করছে। বাস্তবতা হলো, আকাশমণি গাছের সামাজিক বনায়নে একদিকে যেমন বনের প্রাণবৈচিত্র্য পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেছে, অন্যদিকে বন থেকে খাবার এবং ওষুধ সংগ্রহের সুযোগ নেই। এখানেও শক্ত অভিযোগ আছে- গাছ বিক্রি করে লাভবান হয় বিভিন্ন বিভাগ এবং ক্ষমতাধররা। অন্যদিকে, বন উজাড় হলে বনবাসী মানুষের জীবনও শ্রী হারায়। তাছাড়া বন মামলা, ফসল কাটা, বন সমতলে পরিণত হওয়া, বনের জমির খাসজমিতে রূপান্তর, অতঃপর গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পে আদিবাসীদের অভিবাসন করা- এমনটাই হচ্ছে।
বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি নেমেছিল। কিন্তু বৃষ্টি আমাকে শীতল করতে পারছিল না। আমি অস্থির হয়ে ভিজতে ভিজতেই বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে।