সীতাকুণ্ডে ধর্ষণের শিকার এক নারীকে গ্রাম্য সালিশে সমাজচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে। মামলা করলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় তার পরিবারকে। এতে ২৫ দিন মামলা করতে পারেননি ওই নারী ও তার পরিবারের লোকজন। উপায়ান্তর না পেয়ে রোববার সীতাকুণ্ড প্রেস ক্লাবে এসে অঝোরে কেঁদেছেন ওই নারী। 

সাংবাদিকদের পরামর্শে ওই নারী দুপুরে থানায় গেলে মামলা নেয় পুলিশ। পরে বিকেলেই গ্রেপ্তার করা হয় অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন মানিককে।

পুলিশ জানিয়েছে, রোববার দুপুরে ওই নারী থানায় অভিযোগ নিয়ে এলে বিকেলেই ধর্ষণকারীকে উপজেলার বারৈয়ারঢালা ইউনিয়নের বহরপুর সাগর উপকূলীয় এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারা বিচারের নামে অপরাধীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল তাদেরও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানায় থানা পুলিশ।

পুলিশ ও ওই নারীর স্বজন সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ড বারৈয়ারঢালা ইউনিয়নের বহরপুর গ্রামের ২৫ বছরের তালাকপ্রাপ্ত ওই নারীকে বিয়ের কথা বলে গত ৮ আগস্ট বাঁশবাড়িয়ার এমএম জুট মিল এলাকায় একটি বাসায় নিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করে একই এলাকার মৃত অলি মিয়ার ছেলে ইকবাল হোসেন মানিক (৪৫)। এরপর ওই নারীর সঙ্গে প্রতারণা করে তার আগের স্বামীর দেওয়া তালাকের তিন লাখ টাকা আত্মসাৎ করে ইকবাল।

এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গত ২৫ আগস্ট বহরপুর গ্রামে সালিশ হয়। তবে সালিশে উপস্থিত ছিল না ইকবাল।

সালিশে ধর্ষণের শিকার ওই নারীকে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত হয়। যারা ধর্ষিতার পরিবারকে সহযোগিতা করবে তাদেরও একই শাস্তি পেতে হবে বলে সালিশকারীরা জানিয়ে দেন। ওই নারী ও তার পরিবারকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে নানা অপবাদ দেওয়া হয়।

এদিকে ধর্ষণের বিচার না করে উল্টো ধর্ষিতা ও তাদের পরিবারকে সমাজচ্যুত করায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে এলাকায়। অনেকে সরব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ধর্ষণকারীর শাস্তির দাবি করে পোস্ট দিয়েছেন অনেকে।

ফাহিম সিদ্দিক নামে এক ব্যক্তি তার ফেসবুক আইডিতে লেখেন, ধর্ষণকারী ইকবাল একজন প্রভাবশালী ও চিহ্নিত ডাকাত। এর আগে সে ডাকাতির মামলায় সাত মাস জেল খেটেছে। এ ছাড়া এলাকায় একাধিক নারী তার খপ্পরে পড়ে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয়েছে। সালিশের নামে যারা প্রভাবশালী ওই ধর্ষণকারীকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে চাচ্ছে, সর্দারসহ তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবিও জানানো হয় ওই পোস্টে।

ওই নারীর ভাই অভিযোগ করেন, ঘটনার পর গ্রাম সর্দার নুরুল আলম গ্রামে সালিশ করেন। সেখানে তাদের সমাজচ্যুত করা হলেও অপরাধী ইকবালকে উপস্থিত করা হয়নি। সব দোষ তার বোনের ওপর দিলেও সালিশে ইকবালকে ভালো মানুষ হিসেবে অখ্যায়িত করেন সর্দারসহ অন্য সালিশকারীরা।

তিনি আরও জানান, ধর্ষণকারী ও গ্রাম সর্দারের লোকজন তাদের পরিবারকে বিভিন্ন হুমকি দেয়। মামলা করলে এলাকা ছাড়তে হবে বলে জানায়। তারা নিরুপায় হয়ে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়েছেন। পরে পুলিশের কাছে গেলে পুলিশ মামলা নিয়ে তাকে আটক করে।

গ্রাম সর্দার নুরুল আলম মোবাইল ফোনে জানান, সমাজিক বৈঠকে সম্মিলিত সিদ্ধান্তের আলোকে তাদের সমাজচ্যুত করা হয়েছে। সর্দার আরও বলেন, সমাজিকভাবে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে বলেছিলাম আমি।

সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, রোববার দুপুরে ওই নারী তার মা ও ভাইকে নিয়ে থানায় আসেন অভিযোগ দিতে। বিকেল সাড়ে ৪টার সময় অভিযুক্তকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় মামলা রেকর্ড হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সালিশে ধর্ষণের শিকার ওই নারী ও তার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার যে কথা বলা বলা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উপযুক্ত প্রমাণ পেলে সালিশকারীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। কারণ এমন বিষয়ে সালিশ করার সুযোগ নেই সর্দার-মাতবরদের।