প্রায় ৪ বছর ধরে দফায় দফায় ছেলেদের নির্যাতনের শিকার এক মা বিচার চাইতে ইউএনওর কাছে গিয়েছিলেন। ইউএনও সব শুনে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেন। পুলিশকে নির্দেশ দেন মামলা নিয়ে অভিযুক্ত ছেলেকে আটক করার। যেই কথা, সেই কাজ, ছেলেকে ধরে ফেলে পুলিশ। কিন্তু ছেলেকে হাতকড়া পরাতেই আবার ঘুরে যায় মায়ের মন। হাউমাউ কাঁন্না শুরু করেন মা মোমেনা বেগম। ছেলের মুক্তিও চান।

সোমবার মাগুরার শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে এ ঘটনা। কাঁদতে কাঁদতে মা বলেন, ‘স্যার আমার ছেলেকে পুলিশে দেবেন না। পুলিশ মারবে। আমার ছেলে ভুল করে ফেলছে। এবারের মতো মাফ করে দেন। আবার যদি আমারে মারে, তাহলে ওকে জেলে দিয়ে দেবেন।’

এ দৃশ্য দেখে ঘটনাস্থলে উপস্থিত এসিল্যান্ড (সহকারী কিমশনার ভূমি) শ্যামানন্দ কুন্ডুসহ উপজেলার অন্যান্য কর্মকর্তারা বলেই ফেললেন, ‘এই হচ্ছেন মা। যে মা এসেছিলেন বিচার চাইতে, সেই মা-ই আবার বিলাপ করে কাঁদছেন, ছেলেদের মাফ করে দেওয়ার জন্য।’

পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ের ভরা সংসার ছিল মোমেনার। মেয়েদের বিয়ে দেওয়া পর একা হয়ে যান তিনি। চার বছর আগে স্বামীকেও হারান তিনি। এরপর থেকেই ছেলেদের অত্যাচার শুরু হয় তার ওপর। জমি-জমা লিখে নেওয়ার জন্য ছেলেরা তাকে মারধরও করেন। হাসপাতালেও ভর্তি করতে হয় তাকে। একপর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে যান ইউএনওর কাছে।

সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে ছেলেদের মারধরের কারণে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান মা মোমেন। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চার ছেলে দাঁড়িয়ে আছেন। আর বেদনাভরা নয়নে বসে আছেন মা। ছেলেদের জেরা করছেন ইউএনও লিউলা-উল জান্নাহ। জিঙ্গাসাবাদ শেষে ইউএনও আদেশ দেন, প্রত্যেক ছেলেকে মাসে এক হাজার করে টাকা মায়ের ভরণপোষণের জন্য দিতে হবে। আর যে ছেলের মারধরে জখম হয়ে মোমোনা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, সেই ছেলের নামে নিয়মিত মামলা দিয়ে ধরে নিয়ে যেতে পুলিশকে নির্দেশ দেন। পুলিশও কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলেকে ধরে হাতকড়া লাগিয়ে ফেলে। তখনই মায়ের মন ঘুরে যায়। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

মাকে কেন মেরেছেন, জানতে চাইলে মোমোনা বেগমের অভিযুক্ত ছেলে আয়েব আলী বলেন, ‘আমি যখন শুনলাম, মা আমার নামে ইউএনওর কাছে মামলা করেছে, তখন আর মাথা ঠিক ছিল না। এ রকম ভুল আর করব না।’

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিউলা-উল-জান্নাহ সমকালকে বলেন, লিখিত অভিযোগের ভিতিত্তে বিচারের জন্য মোমেনা বেগমের পাঁচ ছেলেকে নোটিশ করা হয়েছিল। এরমধ্যে চার ছেলে এসে হাজির হন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ভরণপোষণের জন্য পাঁচ ছেলে মাসে এক হাজার করে টাকা মাকে দেবে মর্মে লিখিত মুচলেকা নেওয়া হয়। আর যে ছেলের মারধরের কারণে মোমেনাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল, তার নামে নিয়মিত মামলা করার নির্দেশ দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। কিন্তু পরে মায়ের কান্নাকাটির কারণে এবং মামলা করতে রাজি না হওয়ায় আমি বিষয়টি ওসি সাহেবের ওপর ছেড়ে দিই।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, বৃদ্ধা মায়ের আকুতি মিনতির কারণে এবারের মতো মুচলেকা নিয়ে তার চার ছেলেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।