জালিয়াতির মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) ঋণের চার কোটি টাকা আত্মসাত ও পাচারের অভিযোগে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ৫ অক্টোবর ঘোষনা করা হবে। উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ঢাকার ৪ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শেখ নাজমুল আলম মঙ্গলবার আসামিদের উপস্থিতিতে এ দিন ধার্য করেন।

রাষ্ট্রপক্ষে দুদকের আইনজীবী মীর আহমেদ আলী সালাম আদালতের কাছে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি (যাবজ্জীবন) দাবি করেন। সাত আসামির পক্ষে খালাস চেয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবী বোরহান উদ্দিন, শাহীনুর ইসলাম অনিসহ কয়েকজন। বিচারপতি এস কে সিনহাসহ চারজন পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলনা। পলাতক অপর আসামিরা হলেন ফারমার্স ব্যাংকের ফাষ্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সাফিউদ্দিন আসকারী, টাঙ্গাইলের রণজিৎ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী সান্তি রায় সিমি।

দণ্ডবিধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের যেসব ধারায় এ মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, তাতে অপরাধ প্রমাণিত হলে আসামিদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন শাস্তি হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্নিষ্ঠ আইনজীবীরা। দুর্নীতির অভিযোগে দেশে এই প্রথম কোনো সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে মামলার রায় হতে যাচ্ছে।

আদালতে উপস্থিত সাত আসামি হলেন ফারমার্স ব্যাংকের অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী (বাবুল চিশতী), সাবেক এমডি এ কে এম শামীম, ফাস্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট লুৎফুল হক, সাবেক এসইভিপি গাজী সালাহউদ্দিন, টাঙ্গাইলের ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান ও একই এলাকার নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা। তাদের মধ্যে বাবুল চিশতী কারাগারে আছেন, বাকিরা জামিনে।

এর আগে ২৪ আগষ্ট মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। ২১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন আদালত। ২০১৯ সালের ১০ জুলাই দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন মামলা করেছিলেন। মামলা তদন্ত করে একই বছরের ৯ ডিসেম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদক পরিচালক বেনজীর আহমেদ। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে গত বছর ১৩ আগষ্ট অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন বিচারক। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বিচারপতি সিনহার ব্যাংক হিসাবের চার কোটি টাকা জব্দের পাশাপাশি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর আসামি শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় আলাদা দুটি হিসাব খোলেন। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য পরদিন তারা ওই ব্যাংক থেকে দুই কোটি টাকা করে মোট চার কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন। তাদের ব্যাংক হিসাব এবং ঋণের আবেদনে উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের ৫১ নম্বর বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়, যার মালিক ছিলেন তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। ঋণের জামানত হিসেবে আসামি রনজিৎ চন্দ্রের স্ত্রী সান্তি রায়ের নামে সাভারের ৩২ শতাংশ জমির কথা উল্লেখ করা হয় আবেদনে। ওই দম্পতি এস কে সিনহার পূর্ব পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ বলে উল্লেখ করা হয়।

আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নিজেরা লাভবান হয়ে এবং অন্যদের লাভবান করতে এ ধরনের অপরাধ করেন। তারা ভুয়া ঋনের মাধ্যমে ৪ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করে নগদ উত্তোলন ও বিভিন্ন পে-অর্ডারের মাধ্যমে নিজ আত্মীয়ের ব্যাংক হিসাবে হস্তান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং কিছু পর্যবেক্ষণের জের ধরে ২০১৭ সালের অক্টোবরের শুরুতে ছুটিতে যান তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। পরে বিদেশ থেকেই তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। বিচারপতি সিনহা ছুটি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম, নৈতিক স্খলনসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ পাওয়ার কথা সুপ্রিমকোর্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। তিনি বর্তমানে কানাডায় রয়েছেন। তবে নিজের বইয়ে লিখেছেন, পদত্যাগে বাধ্য করে তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে।