কর্মস্থলের ফেরার তাগিদে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসীরা বিমানবন্দরে করোনা পরীক্ষার ল্যাব (আরটি-পিসিআর) স্থাপনের দাবিতে মঙ্গলবার ইস্কাটনে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সামনে অনশন করেন। ল্যাব স্থাপনে আজকালের (মঙ্গল/বুধবার) মধ্যেই প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে- প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদের এ আশ্বাসে প্রবাসী অনশন ভেঙে কর্মসূচি স্থগিত করেন।

অনশনকারীদের পাঁচ প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকের পর মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ২৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিমানবন্দরে করোনা পরীক্ষার ল্যাব স্থাপনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল। সক্ষমতার দিক বিবেচনা করে সাতটি কোম্পানির আবেদন আমলে নেওয়া হয়েছে। এই সাত কোম্পানির মধ্য থেকে কাকে কাকে কাজ দেওয়া হবে- আজকে (মঙ্গলবার) এ সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে।

ইমরান আহমদ বলেন, একটি কোম্পানি কাজ পেতে পারে, আবার একাধিক কোম্পানিও পেতে পারে। তবে তা নির্ধারণ করবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কত দ্রুত পরীক্ষা করতে সক্ষম এবং খরচ কত কম হবে তার ওপর নির্ভর করবে কে কাজ পাবে।

আমিরাতের শর্তানুযায়ী, যাত্রার ৪৮ ঘণ্টা আগে করোনার পিসিআর টেস্ট করে নেগেটিভ সনদ নিতে হবে। বিমানবন্দরে প্রবেশের পর উড়োজাহাজ উড্ডয়নের ছয় ঘণ্টা আগে র‌্যাপিড টেস্ট করতে হবে। সেই পরীক্ষায় ফল নেগেটিভ এলে, তবেই বিমান বসতে পারবেন যাত্রীরা। বিমানবন্দরে র‌্যাপিড টেস্ট না থাকায় প্রবাসীরা কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। নতুন কর্মী ও ভিজিট ভিসায় আমিরাত যেতে অপেক্ষমানরাও আটকে গেছেন।

অনশন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কুমিল্লার দেবিদ্বারের মো. রাসেল আমিরাতের শারজায় চাকরি করেন। তিনি জানান, গত ১৪ জুন ছুটিতে দেশে এসেছেন। দুই মাসের ছুটি শেষ হয়েছে ১১ আগস্ট। ৯ আগস্ট তার কর্মস্থলে ফেরার বিমান ধরার ফিরতি টিকিট ছিল। কিন্তু বিমানবন্দরে র‌্যাপিড টেস্ট সুবিধা না থাকায় ফিরতে পারছেন না। ১৩ আগস্ট তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে। চাকরি আছে না নেই- তা বুঝতে পারছেন না।

আটকেপড়া আরব আমিরাত প্রবাসীদের নেতা প্রকৌশলী মহিউদ্দিন বেলাল রনি সমকাল বলেন, সারাদেশ থেকে আসা প্রবাসীরা অনশনে অংশ নিয়েছেন। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী তাকেসহ পাঁচজনকে ডেকে নিয়ে কথা বলেছেন। মন্ত্রী তাদের জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান ল্যাব স্থাপনে কাজ পাবে। তা না হলে, বুধবারের মধ্যে চূড়ান্ত হবে। এরপর দুই/তিন দিনের মধ্যে ল্যাব স্থাপন হয়ে গেলে, কর্মীরা করোনা টেস্ট করে কর্মস্থলে ফিরতে পারবেন। মন্ত্রীর এ আশ্বাসের সম্মানে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।

প্রবাসীরা দ্রুততম সময়ে বিমানবন্দরে করোনার পরীক্ষার আরটি-পিসিআর ল্যাব স্থাপনের দাবি জানালেও- সরকারের কমিটিগুলো ১৩ দিনেও ঠিক করতে পারেনি কোন কোন প্রতিষ্ঠান পাবে স্থাপনের কাজ। গত ৬ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকের নির্দেশ ছিল দুই/তিন দিনের মধ্যে বিমানবন্দরে করোনা পরীক্ষার সুবিধা চালু করার। আমিরাত প্রবাসীরা বলছেন, এ কাজে 'সময়ক্ষেপনের' ফলে তারা কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে।

সোমবার কারিগরি কমিটির স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টদের সভায় বিমানবন্দরে আরটি-পিসিআর ল্যাব স্থাপনে আগ্রহী ২৩ প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত করেনি কমিটি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মো. খুরশীদ আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় গন্তব্য দেশের চাহিদা অনুযায়ী ল্যাব স্থাপনে কী কী সুবিধা থাকতে হবে তা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। ল্যাব স্থাপনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা দেওয়া কাগজের ভিত্তিতে তাদের সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া সাতটি প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকার শীর্ষে রেখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব লোকমান হোসেন মিয়ার নেতৃত্বাধীন মূল কমিটি কারিগরি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী চূড়ান্ত করবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান বিমানবন্দরে র‌্যাপিড টেস্টের কাজ পাবে। তবে কারিগরি কমিটি সুপারিশ করেছে, দ্রুততম সময়ে করোনা পরীক্ষা করে রিপোর্ট দিতে হলে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে ল্যাব স্থাপনের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।

প্রবাসীরা বলছেন, সরকারের কমিটিগুলোর সময়ক্ষেপনের খেসারত দিতে হচ্ছে তাদের। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভারতের বিমানবন্দরে র‌্যাপিড টেস্ট সুবিধা থাকায় সেসব দেশের কর্মীরা আরও কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই আরব আমিরাত যাচ্ছেন। বাংলাদেশে একই সুবিধা চালু করতে প্রবাসীরা জুন মাস থেকে দাবি জানিয়ে আসছেন। জুলাই থেকে রাস্তায় কর্মসূচি পালন করছেন। ৪০ থেকে ৫০ হাজার আরিমরাতপ্রবাসী কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না।

প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী সমকালকে জানিয়েছিলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অনুরোধ করেছিলেন সরকারিভাবে টেস্ট করতে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাতে অপারগতা প্রকাশ করে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, শুরুতে একটি মাত্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। যে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দিতে 'চাপ' ছিল তারা প্রথমে টেস্ট প্রতি এক হাজার ৭০০ টাকা প্রস্তাব করেও পরে দাবি করেছেন দুই হাজার ৭০০ টাকা। এতে সময়ক্ষেপন হয়। পরে আরও ২২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়ার দৌড়ে নামে। তাদের মধ্য থেকে বাছাইয়ে এখন সময় যাচ্ছে।