লাকিংমে চাকমার লাশ পড়ে ছিল কক্সবাজারে হাসপাতাল মর্গে। সে বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে বন্ধু মেইনথিন প্রমীলার কাছে জানলাম, লাকিংমের নামে চাকমা পদবি থাকলেও সে একজন তঞ্চঙ্গ্যা মেয়ে। প্রমীলার শ্বশুরবাড়ি লাকিংমের গ্রামের কাছেই। পটুয়াখালীর মেয়ে প্রমীলা জানাল, রাখাইন ভাষার 'হল্গা খারে মে' উচ্চারণের বিভ্রান্তিতে 'লাকিংমে' হয়ে গেছে হয়তো। হদ্মা খারে মে শব্দগুলোর বাংলা হতে পারে 'সুন্দর স্নেহময়ী মেয়ে'।
লাকিংমের পরিবারটি চাকমা নাকি তঞ্চঙ্গ্যা? প্রমীলা যে সন্দেহ আমার মনে গেঁথে দিয়েছিল, তার পুরো মীমাংসা করতে পারিনি এখনও। তবে টেকনাফের বাঙালিদের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, তারা রাখাইনদের গ্রামকেও 'চামমাপল্লি' বলে চেনে। তঞ্চঙ্গ্যা মেয়ের নাম রাখাইন ভাষায় রাখার একটা যুক্তি খুঁজে পাই। কক্সবাজার থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত বাংলাদেশের সবখানেই রয়েছে রাখাইনদের বাস। জাতিতে ভিন্ন হলেও চাকমা, রাখাইন ও তঞ্চঙ্গ্যারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং লাকিংমের নামটি রেখেছিলেন কোনো রাখাইন পুরোহিত।
অনেকে তঞ্চঙ্গ্যাদের চাকমা জাতির অংশ মনে করে, বিশেষত চাকমাদের মধ্যে এ রকম মনে করাটা প্রবল। যদিও ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং বিয়ের রীতিতে পার্থক্য আছে এ দুই জাতির মধ্যে। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বর্ণমালা প্রায় এক হলেও ভাষাটা পুরোই আলাদা। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা নারীর পোশাকে অনেক পার্থক্য আছে। তঞ্চঙ্গ্যাদের ১২টি উপগোত্রের মধ্যে ছয়টির বসবাস আছে বাংলাদেশে। এরা হলো মোঅ গছা, ধোন্ন্যা গছা, লাং গছা, মেলং গছা, কারবা গছা, অংগ্য গছা। গোত্রের ভিন্নতা মেয়েদের পরিধেয় বস্ত্র দেখে বোঝা যায়। চাকমাদের সঙ্গে তঞ্চঙ্গ্যাদের পার্থক্য রয়েছে বিয়েসহ আরও অনেক আচার-অনুষ্ঠানেও।
প্রাচীনকালে চাকমা রাজা আরাকান অভিযানে জয়ী হয়ে সেখানকার এক রমণীকে বিয়ে করেন এবং এই রানীর বংশধররা তঞ্চঙ্গ্যা বলে পরিচিত হয়েছে- এমনটাই গবেষকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন। তবে তঞ্চঙ্গ্যারা এই উপকথা পুরোপুরি মেনে নিতে নারাজ। আমার মনে হয়, স্বতন্ত্র জাতিসত্তার দাবির মধ্যে জাত্যাভিমান এবং জাতির গৌরবও প্রকাশিত হয়। সে যা-ই হোক, টেকনাফ অঞ্চলের তঞ্চঙ্গ্যারা কয়েক প্রজন্ম ধরে নামের সঙ্গে চাকমা লিখে থাকে। সেই সুবাদে লাকিংমের নামে চাকমা শব্দটি আছে, তবে সে যে তঞ্চঙ্গ্যা মেয়ে এটা নিয়ে খুব বেশি সংশয় নেই। বান্দরবানের সাংবাদিক উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, তিনি নিজে টেকনাফের ওই অঞ্চল ঘুরে দেখেছেন, সেখানকার চাকমা পদবিধারীরা তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষায় কথা বলে। এই চাকমা পদবিধারীরা তঞ্চঙ্গ্যাদের ধোন্ন্যা গছা গোত্রের মানুষ এবং তাদের বিয়েও হয় তঞ্চঙ্গ্যাদের সঙ্গে।
বাঙালি মুসলমানের মনে আদিবাসী নারী বিয়ে করে সওয়াব পাওয়ার একটা মানসিকতা আছে। লাকিংমেকে অপহরণের পর ধর্মান্তর এবং বিয়েতে বাধ্য করা আতাউল্লাহর ভাষ্যে এটা স্পষ্ট হয়েছিল। সম্ভবত অপহরণ সহযোগী প্রতিবেশী বাঙালি, সরকারি তদন্ত সংস্থার একাংশ এবং একজন মারমা তদন্তকারী কর্মকর্তা মিলে প্রতিষ্ঠা করেছিল- লাকিংমে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিল। কিন্তু ওর ছোট ভাই ঘটনার যে বর্ণনা করল, তাতে আর কারও সন্দেহ থাকল না যে মেয়েটিকে সন্ধ্যার অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে জাপটে ধরে নিয়ে গিয়েছিল কিছু লোক; যাদের সাহায্য করেছিল প্রতিবেশী মুসা। লাকিংমের ছোট ভাই ১০ বছর বয়সী এক শিশু, তার ভাষা দোভাষীর সাহায্য ছাড়া বুঝতে পারিনি আমরা। শিশুটি কেঁদে ভাসাচ্ছিল আর তার দিদিকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বলছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ফটিক চরিত্রকে বিশ্নেষণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন, 'বিশেষত, তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই।' রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প 'ছুটি' সাধারণ বাঙালি পাঠকের পড়া আছে। ফটিকের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে গল্পে আরও বলা হয়, 'শৈশব এবং যৌবনের অনেক দোষ মাফ করা যায়, কিন্তু এই সময়ের কোনো স্বাভাবিক অনিবার্য ত্রুটিও যেন অসহ্য বোধ হয়।' সে রকমভাবে আমরা ভেবেছিলাম, লাকিংমের কিশোরী মনের আবেগ তাকে ঘরছাড়া করলেও করতে পারে। কিন্তু ঘটনাটা এমন ভাবাবেগের ছিল না। এখানে ভয়ানক নৃশংসতার কথা আছে। লাকিংমের কথিত স্বামী আতাউল্লাহ বলেছে, মুসারা তার জন্য একটি চাকমা মেয়ে এনে রেখেছে, সে মেয়েটিকে বিয়ে করতে পারে। মুসারা মিথ্যা বলেছিল। যদিও এখনও মামলাটি রয়ে গেছে রহস্যাবৃত, তদন্তাধীন। আতাউল্লাহর পরিবার এই ভেবে আনন্দিত ছিল যে, একটি আদিবাসী মেয়েকে অন্তত তারা ইসলাম ধর্মে আনতে পেরেছে। তাদের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী এটি পরকালে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দারুণ কাজ হয়েছিল বলে তারা মনে করছিল। আমার ইহলৌকিক সচেতনতা কিন্তু মনে ভীষণভাবে খচখচ অনুভূতি তৈরি করছিল।
লাকিংমের পরিবার আর প্রতিবেশী ঈসা মিয়ার পরিবার ছিল খুব আলাদা ধরনের দুটো পরিবার। সপ্তম শ্রেণিপড়ূয়া লাকিংমে মা-বাবার সঙ্গে থাকত টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শিলখালী চাকমাপাড়ায়। স্থানীয় শামলাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ত সে। ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পড়াশোনায় মনোযোগ ছিল তার। লাকিংমের সঙ্গে চেহারা, ভাব, ভাষা- কোনো কিছুরই মিল ছিল না পাশের বাড়ির ইঁচড়েপাকা ধরনের কিশোরী দু'জনের। এ দুই কিশোরী ক্রমাগত নির্লজ্জের মতো আমাদের মিথ্যা বলছিল। তারা বলেছিল, লাকিংমে পালিয়ে গেছে। কিন্তু আমার বয়স আর অভিজ্ঞতা আমাকে নিশ্চিত করছিল, মুখ থেকে শিশুর ছাপ মুছে যায়নি, এমন মেয়েটি একটি অচেনা ছেলের জন্য পালিয়ে কুমিল্লা যেতে পারে না।
কক্সবাজার শহর থেকে একাত্তর কিলোমিটার দক্ষিণে টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়ন। মূল সড়ক ছেড়ে মেঠোপথ ধরে এগোলে মটকামুরা নামে পাহাড়ের পাদদেশে লাকিংমেদের বাড়ি। আমরা শিলখালীতে গিয়েছিলাম গেল বছর ২৮ ডিসেম্বর। লাকিংমেদের জরাজীর্ণ ঘর দেখে মনে হলো জসীমউদ্‌দীনের 'আসমানী' কবিতাটি- 'আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,/ রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।' আমার বন্ধুদের উদ্যোগে, স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় লাকিংমেদের 'বাড়ি তো নয়, পাখির বাসা- ভেন্না পাতার ছানি'টি পাকাবাড়িতে রূপান্তর হয়েছে এখন। সুপারি বাগান করেছেন লাকিংমের মা-বাবা। কিন্তু মেয়ে হারানোর বেদনা কি ভুলতে পেরেছেন তারা? পারবেন কোনো দিন?
লাকিংমেকে অপহরণের পর ১০ দিনের মতো আটকে রাখা হয়েছিল টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায়। আতাউল্লাহ তাকে ধর্মান্তরিত এবং বিয়ে করতে নিয়ে যাওয়ার আগে কি ছোট্ট মেয়েটি ধর্ষিত হয়েছিল? অপহরণের দু'দিন পর লাকিংমে ওদের বাড়ির কাছের একটি দোকানে বিষ কিনতে চেষ্টা করেছিল। কেন? মা-বাবার কাছে না ফিরে বিষ কিনতে চেয়েছিল কেন এবং এক বছর পর তেরো দিনের শিশুকন্যাকে ফেলে সে সম্ভবত বিষপান করে আত্মহত্যা করে। অথবা তাকে হত্যা করা হয়েছিল। তাহলে কি ধর্মান্তরিত করে যারা নিজেদের সুখী ভাবছিল; ধর্মান্তরিত হয়ে, মা-বাবা-ভাই-বোন, প্রিয় পড়াশোনা ফেলে, প্রিয় ছায়াময় গ্রাম ফেলে যন্ত্রের শহরে, শিশুবয়সে প্রতিদিন কারও যৌনইচ্ছা পূরণ করে লাকিংমে কি সুখে ছিল? চাঁদের মতো শিশুটিকে একা রেখে মরে যেতে চেয়েছে কেন লাকিংমে? নোটারি পাবলিককে দেওয়া ৬০ হাজার টাকা আতাউল্লাহকে কে দিল? রাজনৈতিকভাবে ধর্মান্তরিত করার জন্য কোনো সংস্থা কি কক্সবাজারে কাজ করছে?
লাকিংমে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল। যদিও প্রাপ্তবয়স্কের মিথ্যা সার্টিফিকেট বানিয়েছিল আতাউল্লাহরা। অপহরণের এক বছর পর যখন মেয়ের লাশ আনতে ব্যর্থ হচ্ছিল লালাঅং চাকমার পরিবার, তখন আমরা গেলাম সেখানে। লাকিংমের মা কেচিং চাকমা আহাজারি করছিলেন। মেয়েকে অপহরণকারীরা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে আরও অনেকবার এভাবেই কেঁদেছেন কেচিং চাকমা।
লাকিংমে পালায়নি, তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। সে তখন বারান্দায় বসে ছিল। বাবা সাগরে গিয়েছিল মাছ ধরতে। মা আর বড় বোন কাজ করছিল পানের বরজে। ছোট ভাইবোনরা খেলছিল উঠোনে। গ্রামের প্রান্তে আমরা দুটি বাড়িই শুধু দেখলাম। বাঙালি প্রতিবেশী তাদের তঞ্চঙ্গ্যা প্রতিবেশীকে অপহরণ করছে। চিৎকার করলেও শোনার কেউ নেই। যে পথ দিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেদিকটা নির্জন।
বাঁশঝাড়, আশপাশের গাছেরাও খুব কাঁদছিল বলে মনে হয়েছিল আমার। সেই অসহায় বোবাকান্না নীরব প্রাণের কান্নার মতো। অসহায়, নিরুপায় মানুষের বেদনার মতো; যারা কখনও ন্যায়বিচার পায় না। লাকিংমে ন্যায়বিচার পাবে না। সে ১৫ বছর হওয়ার আগেই মরে গেছে। অনেক নৃশংসতা পেয়ে মরেছে সে। লাকিংমের শিশুটিও কোনো ন্যায্যতা পাবে না হয়তো। তার তঞ্চঙ্গ্যা পরিচয় কি বেঁচে থাকবে মা-হারা অপহরণকারী আতাউল্লাহর ঘরে? তার ভাষা হবে বাংলা। নাম রাখা হয়েছে বাঙালি মুসলমানের মতো। চেহারাটা তঞ্চঙ্গ্যাদের মতো। এলেক্স হেলির 'রুটসে'র কিসির মতো হবে নাকি লাকিংমের বাচ্চাটির জীবন?