দলের নাম ভাঙিয়ে গড়ে ওঠা ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোর দায়দায়িত্ব নেবে না আওয়ামী লীগ। এখন থেকে এ ধরনের সংগঠনের কোনো কর্মসূচিতে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা যাবেন না। মন্ত্রীদের কেউ যাতে ভুঁইফোঁড় সংগঠনের কর্মসূচিতে অতিথি হিসেবে না যান, সে অনুরোধও করা হবে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সময় ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোর সঙ্গে দলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই জানিয়ে অনতিবিলম্বে এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এই বৈঠক চলাকালেই দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে অনুষ্ঠেয় 'বাংলাদেশ আওয়ামী প্রজন্ম লীগ' নামের একটি ভুঁইফোঁড় সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানের মঞ্চ ও প্যান্ডেলও সরিয়ে দেওয়া হয়।

গত ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গতকালের সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক ডাকা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে বৈঠকে আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলের সব পর্যায়ের, একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল নিরসন, তৃণমূল সম্মেলন কার্যক্রম জোরদার এবং নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে দলকে আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দেন নেতারা।

বৈঠকে ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের আসন্ন নির্বাচনগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক এবং জনগণের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর করার উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আগামীতে সংসদের কোনো উপনির্বাচনও যেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হতে না পারে- সে লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপও নেবে আওয়ামী লীগ।

ভুঁইফোঁড় সংগঠনের কর্মসূচিতে 'না' কেন্দ্রীয় নেতাদের: আওয়ামী লীগের নামে গড়ে ওঠা অসংখ্য ভুঁইফোঁড় ও নামসর্বস্ব সংগঠনের মাধ্যমে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হওয়ার প্রসঙ্গটি সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকের আলোচনায় উঠে আসে। এ নিয়ে কয়েকজন নেতা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান এবং ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোর অপতৎপরতা বন্ধে দল থেকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেন।

বৈঠক সূত্র আরও জানিয়েছে, গতকাল সকালে সম্পাদকম লীর ওই বৈঠকে যোগ দিতে এসে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে 'আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ' নামের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের চোখে পড়ে। পরে দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে দলের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়াকে প্রজন্ম লীগের অনুষ্ঠান বন্ধ করতে নির্দেশ দেন তিনি। বিপ্লব বড়ূয়া অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ দিলে সংগঠনটির কর্মীরা দ্রুত মঞ্চ ও প্যান্ডেলসহ সব কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়।

পরে বৈঠকে প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে ওবায়দুল কাদের বলেন, কিছুক্ষণ আগে খবর পেলাম আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে প্রতিষ্ঠালগ্নের কী একটা আয়োজন করেছে আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ। মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের ব্যাপারে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু লীগ আর আওয়ামী যখন যুক্ত হয়, তখন এখানে আমাদের সংশ্নিষ্টতা এসে যায়। এখানে আমাদের ভাবমূর্তির বিষয়টি এসে যায়। কারণ এসব দোকান অনেকে খুলে থাকে চাঁদাবাজির জন্য। এগুলো আসলে চাঁদাবাজির প্রতিষ্ঠান।

তিনি বলেন, সবাই চাঁদাবাজি করে তা নয়। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যারা চাঁদাবাজিনির্ভর। এরা দলের নাম ভাঙায়। কাজেই এসব সংগঠনের কোনো প্রকার আয়োজনে, বৈঠকে কিংবা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যেটাই হোক, আমি আমাদের কেন্দ্রীয় নেতাদের আহ্বান জানাব- আপনারা কোনো অবস্থায়ই এসব সংগঠনের সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থিত থাকবেন না।

এ সময় দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, কেন্দ্রীয় নেতারা যেহেতু ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোর কর্মসূচিতে যাবেন না, সেহেতু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও যাতে সেখানে না যান- সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। দলের পক্ষ থেকে যেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের এ বিষয়ে জানানো হয়।

পরে সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে এই প্রস্তাব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের অবহিত করে কেন্দ্রীয় নেতাদের মতো তাদেরও ভুঁইফোঁড় সংগঠনের কোনো কর্মসূচিতে অতিথি হিসেবে যোগদান থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে এসব সংগঠনের অপতৎপরতা বন্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার কৌশল নির্ধারণের তাগিদ: বৈঠকে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ের নির্বাচনে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নেতারা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে প্রার্থী বাছাই দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড করবে। তবে দলীয় সব প্রার্থীই যাতে জনগণের সমর্থন ও ভোটে জিতে আসতে পারে সেজন্য জনগণের মধ্যে সর্বাত্মক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে মানুষকে সচেতন করতে হবে। আর সাংগঠনিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে দলের মধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। সভায় স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠানের বিষয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।

বৈঠকে সাম্প্রতিক সময়ে সংসদের বেশ কয়েকটি উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার প্রসঙ্গটিও উঠে আসে। উপনির্বাচনগুলোতে অন্য কয়েকটি দলের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিলেও পরে প্রত্যাহার করে নেওয়ায় জনগণের মধ্যে 'ভুল বার্তা' যাচ্ছে বলে মত দেন নেতারা। এই অবস্থায় উপনির্বাচনগুলো যাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও প্রতিযোগিতামূলক হয়- সেই পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোর বিষয়েও একই উদ্যোগ নেবে আওয়ামী লীগ।

তৃণমূল সম্মেলন কার্যক্রম জোরদারের তাগিদ: করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির প্রেক্ষাপটে চলতি মাস থেকে দলের তৃণমূল সম্মেলন কার্যক্রম আবারও শুরু হচ্ছে। এরই মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ বেশ কয়েকটি জেলা-উপজেলা সম্মেলনের তারিখও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

বৈঠকে মেয়াদোত্তীর্ণ বাকি জেলা সম্মেলনগুলোও দ্রুততম সময়ে শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে মেয়াদোত্তীর্ণ উপজেলা, থানা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড সম্মেলনগুলো আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বৈঠক থেকে। এ বিষয়ে সংশ্নিষ্ট বিভাগীয় সাংগঠনিক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা উদ্যোগ নেবেন।

প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের কর্মসূচি চূড়ান্ত: বৈঠকে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে দলীয় কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়। কর্মসূচিতে রয়েছে- ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা, বাদ জোহর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ দেশের সব মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল এবং সুবিধাজনক সময়ে মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রার্থনা সভা। সারাদেশে দল ও সব সহযোগী সংগঠন স্বাস্থ্যবিধি মেনে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল, বিশেষ প্রার্থনা, আলোকচিত্র প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করবে।

'নির্বাচন কমিশন গঠন হবে আইন অনুযায়ী': এদিকে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রাক্কালে বিএনপি নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসার আগেই তারা নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। নতুন নির্বাচন কমিশনও আইন অনুযায়ী গঠন করা হবে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির আহ্বানে ও সব দলের সঙ্গে আলোচনা করেই সার্চ কমিটির মাধ্যমে বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। সেখানে বিএনপিসহ সব দলের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এবারও সব রকম গ্রহণযোগ্য পন্থায় নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে।

ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, বিএনপি সব সময় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্র করে। আগামী বছর নির্বাচন কমিশন গঠনকে কেন্দ্র করে তারা আবার নতুন করে ষড়যন্ত্র করছে। বিএনপির সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই। যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার জবাব দেওয়া হবে। আগাম নির্বাচন বা দলের আগাম সম্মেলন বিষয়ে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী যথাসময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির মেয়াদ আগামী বছর ডিসেম্বরে শেষ হবে। দলের সম্মেলনও নির্ধারিত সময়ে হবে। এ দলে আগাম সম্মেলনের নজির নেই।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, বিএনপির মতো আওয়ামী লীগে জাম্বো জেট কেন্দ্রীয় কমিটি হয় না। বিএনপি ৫০১ সদস্যের জাম্বো জেট কমিটি করেছিল। মিডিয়ায় দেখলাম, সেই নির্বাহী কমিটির সিরিজ সভা হচ্ছে। এ সভায় তাদের দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের বিষয় নেই। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা না করে বিশেষ সিরিজ সভা তথা সরকারবিরোধী সিরিজ ষড়যন্ত্রের গোপন সভা করছে তারা। কীভাবে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা যায়, কীভাবে সরকার হটাবে কিংবা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উস্কানি দেবে, এটা তারই সভা। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের এক বছর আগে বিএনপির কমিটি হয়েছে। সেই কমিটির মিটিং হয় তিন বছর পর। তারা কোনো জেলা-উপজেলা সম্মেলনও করেনি। তারা মুখে মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ায়। তাদের সম্মেলন হয় না, কমিটি হয় না; দলে গণতন্ত্র নেই। তারা কীভাবে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে? অবৈধভাবে ক্ষমতা গ্রহণকারী জিয়ার দলে কোনো গণতন্ত্র নেই।

ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল হক, এসএম কামাল হোসেন, শফিউল আজম নাদেল, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, শিক্ষা ও মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক সামসুন্নাহার চাঁপা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সবুর, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ূয়া, মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি, বন ও পরিবেশ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান প্রমুখ।