আগামী জানুয়ারিতে শেষ হচ্ছে স্থানীয় সরকার পরিষদের সর্বোচ্চ স্তর জেলা পরিষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ। যদিও এই পরিষদের নির্বাচিতদের দায়িত্ব ও মর্যাদা নিয়ে রয়েছে নানা বিভ্রান্তি। শুরুতে নানা প্রতিশ্রুতির কথা শোনা গেলেও পুরো পাঁচ বছরে কখনও এর কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, দেশের সংবিধানে অন্তত চারটি অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তারপরেও এটির একটি আলংকারিক স্তর হিসেবেই পুরো মেয়াদ পার করল জেলা পরিষদ।

তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১ জেলা পরিষদে ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো নির্বাচন হয়। চেয়ারম্যান পদটি উপমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে কর্মপরিধি নির্ধারণসহ ১১ দফা দাবি জানায় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফোরাম। কিন্তু কোনো দাবিই পূরণ হয়নি তাদের। তাই পদমর্যাদা ছাড়াই অনেকটা ক্ষোভ ও অসন্তোষ নিয়ে আগামী বছরের জানুয়ারিতে মেয়াদ শেষ করছেন তারা।

নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের আইন শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেলা পরিষদ আইন-২০০০ অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে নতুন পরিষদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান চেয়ারম্যানদেরই দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে। তবে তা নির্ভর করছে স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর। যদিও গত ৩০ জুন সংসদের বৈঠকে প্রশ্নোত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী, কার্যকর ও স্বাবলম্বী করা বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী, কার্যকর ও স্বাবলম্বী করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফোরামের সদস্য সচিব মহিউদ্দিন মহারাজ জানান, পরিষদের দাবিগুলো নিয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে অনুমতি পাওয়া যায়নি।

দেশের ৬১ জেলায় ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচন হয়। বিজয়ী চেয়ারম্যানরা প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে ২০১৭ সালের ১১ জানুয়ারি শপথ নেন। শপথ অনুষ্ঠানে মানুষের সেবা ও উন্নয়নে জেলা পরিষদের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা থাকবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। জেলা পরিষদগুলোর প্রথম বৈঠক হয় ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি। তাই ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি মেয়াদ শেষ হবে ৬১ জেলা পরিষদের।

পদমর্যাদা ও কর্মপরিধির বিষয়টি জেলা পরিষদ আইনে স্পষ্ট না থাকায় নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই চেয়ারম্যানদের একরকম 'ঢাল নেই তলোয়ার নেই, নিধিরাম সরদার'-এর মতো দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। একাধিক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জানান, নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য এমনকি সাবেক মন্ত্রীও রয়েছেন। তাই তাদের পদমর্যাদা না থাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গেও নানা ইস্যুতে মতবিরোধ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফোরামের নেতারা স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে কর্মপরিধি নির্ধারণ করে দেওয়াসহ ১১ দফা দাবি জানান।

তারা বলেন, একজন চেয়ারম্যান, ১৫ জন সদস্য ও পাঁচ নারী সদস্য (সংরক্ষিত আসন) রয়েছেন এ পরিষদে। কিন্তু কার কী কাজ, সে বিষয়ে পরিস্কার ধারণা নেই চেয়ারম্যানসহ অন্য সদস্যদের। তারা কোন কোন কাজের তদারকি করতে পারবেন বা করা উচিত তাও পরিস্কার বলা নেই আইনে। বিষয়টি সুরাহা না করলে জেলা পরিষদ গঠনের উদ্দেশ্য বাস্তব রূপ পাবে না। জেলা পরিষদকে উপজেলা ও পৌরসভার উন্নয়ন কার্যক্রমের তদারকির দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা দেওয়া, জেলা পর্যায়ের সব দপ্তরকে জেলা পরিষদের আওতায় এনে সুসমন্বয়ের মাধ্যমে দপ্তরগুলোর কার্যক্রম গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া, এডিপির সাধারণ বরাদ্দের কত শতাংশ সংসদ সদস্যরা পাবেন, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জেলা শিল্পকলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের পরিবর্তে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের ওপর ন্যস্ত করা, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের অভিপ্রায় অনুযায়ী একান্ত সচিব বা সহকারী একান্ত সচিবের পদ ও চেয়ারম্যানের নিরাপত্তার জন্য গানম্যানের পদ সৃষ্টি এবং জেলা পরিষদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ সৃষ্টির দাবিও ছিল ফোরামের।

খুলনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশিদ বলেন, ২০০৮-এর ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা যুগ্ম সচিবের পদমর্যাদাক্রমের তালিকায় রয়েছেন- যা শুধু অনুষ্ঠানে আসনের ক্ষেত্রে। তবে গাড়ির সুবিধা ছাড়া পদমর্যাদা অনুযায়ী অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা তারা পান না।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আইনে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের কার্যপরিধি কী হবে, তা পরিস্কার করা হয়নি। তাদের পদমর্যাদা কী, তারা কী ভূমিকা পালন করবেন, তা নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। এটা দূর করলে জেলা পরিষদ গতিশীল হবে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, আইনের বাইরে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের কোনো পদমর্যাদা দেওয়ার সুযোগ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি চান তাহলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কাউকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীসহ অন্য কোনো পদমর্যাদা দিতে পারেন। কর্মপরিধি নির্ধারণসহ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের অন্যান্য দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনে যে কর্মপরিধি রয়েছে, এর বাইরে কিছু করার সুযোগ মন্ত্রণালয়ের নেই।