ই-কমার্সের নামে প্রতারণার ফাঁদ পেতে অন্তত ১৬৪ কোটি টাকা গায়েব করে লাপাত্তা আরও তিন রাঘববোয়াল। এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস লিমিটেড, সিরাজগঞ্জশপ ডটকম ও ধামাকা নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডিসহ একাধিক সংস্থা ছায়া তদন্ত শুরুর আগে এর কর্ণধাররা গা-ঢাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ দেশের বাইরেও পালিয়ে গেছেন। এরই মধ্যে গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে ১১৬ কোটি টাকা পাচার করেছে ধামাকা। এসিপিসি ওয়ার্ল্ড ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা পাচার করেছে। আর সিরাজগঞ্জশপ ডটকম হাতিয়ে নিয়েছে ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৬৩ টাকা।

ধামাকার প্রধান জসিম উদ্দিন চিশতি, সিরাজগঞ্জশপের মালিক ও প্রধান নির্বাহী জুয়েল রানা এবং এসপিসি ওয়ার্ল্ডের মো. আলামিনকে আইনের আওতায় আনতে তৎপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের মধ্যে চিশতি যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গেছেন বলে একটি সূত্র জানায়। আর জুয়েল ও আলামিন দেশেই পলাতক আছে।

এর আগে ই-অরেঞ্জের অন্যতম পরিচালক পুলিশ পরিদর্শক সোহেল রানা প্রায় ১১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে দেশের বাইরে পালাতে গিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে ধরা পড়েন।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল কে এম আজাদ সমকালকে বলেন, ই-কমার্সের নামে যাতে কেউ প্রতারণার ফাঁদ পাততে না পারে, সে ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা জরুরি।

আর যারা ইভ্যালির মতো প্রতারণা করে হাজার হাজার মানুষকে নিঃস্ব করেছে তাদেরও একটা বার্তা দেওয়া দরকার। তবে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতারকদের শাস্তির আওতায় এনে ই-কমার্সের এই প্ল্যাটফর্ম যাতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সে ব্যাপারে সহায়তা করা।

এদিকে, সিআইডির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ধামাকা ও এসপিসি ওয়ার্ল্ডের প্ল্যাটফর্মের আড়ালে অর্থ পাচারের প্রমাণ পেয়েছেন তারা। তদন্তের পর অর্থ পাচারের বিষয়টি প্রমাণ হওয়ায় দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সিআইডি মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করেছে। বনানী থানায় ধামাকার প্রধান চিশতিসহ ছয়জনকে আসামি করে মামলা হয়। আর কলাবাগান থানায় মামলা হয় এসপিসির কর্ণধার আলামিনের বিরুদ্ধে।

এ ব্যাপারে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির সমকালকে বলেন, ধামাকা ও এসপিসির বিরুদ্ধে অর্থ পাচার করার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। দুই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে যারা রয়েছে, তারা পলাতক। আমরা তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। ধামাকা ও এসপিসি ছাড়াও আরও কয়েকটি ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে ছায়া অনুসন্ধান করছে সিআইডি। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তাদের বিরুদ্ধেও মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হবে।

সমকালের কাছে আসা কিছু নথি বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, সিরাজগঞ্জ ডটকমের মালিক জুয়েল রানা এরই মধ্যে ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৬৩ টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন। এ বিষয়টি অবহিত করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে বনানী থানায় মামলা করা হয়। এজাহারে বলা হয়, সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ ডটকমের রিফান্ড রিকোয়েস্ট অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি 'নগদের' কাছে ধরা পড়ে। এ ছাড়া একই পরিমাণ টাকা একই হিসাব নম্বরে বারবার দেওয়ার জন্য রিকোয়েস্ট (অনুরোধ) করা হচ্ছিল। অদ্ভুত বিষয় হলো, সফলভাবে পণ্য ডেলিভারি হয়ে গেছে- এমন অর্ডারের বিপরীতেও রিফান্ড রিকোয়েস্ট আসছিল। এ ছাড়া অর্ডার অ্যামাউন্টের সঙ্গে রিফান্ড অ্যামাউন্টের গরমিল। গভীর রাতে রিফান্ড রিকোয়েস্ট আসতে থাকে প্রচুর। এ বিষয়টি ধরা পড়ার পর 'নগদ' সিরাজগঞ্জ ডটকমের সঙ্গে তাদের সব লেনদেন স্থগিত করে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে ই-মানি আকারের ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৬৩ টাকা প্রতারণামূলকভাবে নিয়ে যায়। এরপর নগদের পক্ষ থেকে সিরাজগঞ্জ ডটকমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে নগদকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এরপর থেকে সিরাজগঞ্জ ডটকমের মালিকের ফোন বন্ধ। এমনকি তাদের পক্ষ থেকে নগদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হচ্ছে না।

সিরাজগঞ্জ শহরের বাহিরগোলা ও এমএ মতিন সড়কে সিরাজগঞ্জশপ ডটকমের প্রধান ও আঞ্চলিক অফিস দুটি দুই সপ্তাহ ধরে তালাবদ্ধ। প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসহ আসবাব সরানো হয়েছে। কোম্পানির ডেলিভারি গাড়িগুলোও রহস্যজনকভাবে লাপাত্তা।

এদিকে, ধামাকা শপিংয়ের মালিক জসিম উদ্দিন চিশতি পলাতক থাকা অবস্থায় ৩১ আগস্ট ফেসবুক লাইভে এসে কথা বলেন। তিনি বলেন, 'আমাদের অ্যাকাউন্ট আনফ্রিজ করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। আশা করছি, কাজ শেষ হয়ে আসছে, আনফ্রিজ হয়ে যাবে।' তিনি বলেন, 'আপনারা শেষ মুহূর্তে কেন এমন করছেন? আমি তো আপনাদের ক্লিয়ার করে বলছি, অ্যাকাউন্ট আনফ্রিজ হলেই আপনাদের অর্ডার দিয়ে দেব।'

তিনি আরও বলেন, 'সেলাররা আমার সঙ্গে সমঝোতা করবেন বলে মিটিং করেছেন। কিন্তু তারা ২০-২৫ জন মারমুখী হয়ে আমার কর্মচারীদের আমারই অফিসে ৭-৮ ঘণ্টা আটকিয়ে রাখছেন। আপনারা নিজেরাও জানেন না এটা ক্রিমিনাল অপরাধ।'

জসিম উদ্দিন চিশতি বলেন, কিছু মানুষ বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আমাকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে। একজন মানুষ জেলে যাবে, মরে যাবে। তারপর কী করবেন? তাই এতদিন ধৈর্য ধরেছেন আর কিছুদিন ধৈর্য ধরেন, আমরা ডেলিভারি শুরু করব।'

জানা যায়, ধামাকার কাছ থেকে ৬০০ বিক্রেতা ২০০ কোটি টাকার বেশি পাবে। এ ছাড়া গ্রাহকদের কোনো অর্ডারই ডেলিভারি দিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। ধামাকা শপিংয়ের গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম আদায় করা ৫০ কোটি টাকা অন্য ব্যাংকের হিসাব নম্বরে পাচার করা হয়। এ ছাড়া আরও কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের অর্থ তাদের নিজস্ব বৈধ হিসাবে জমা না হয়ে অন্য হিসাব নম্বরে সরাসরি চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে অর্থ পাচারকারীরা কিছু মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে। একাধিক কর্মকর্তা জানান, ছায়াতদন্তের আওতায় রয়েছে আলেশা মার্ট, কিউকম, বুমবুম, আদিয়ান মার্ট, নিডস, নিরাপদ ডটকম, আলাদিনের প্রদীপ, এসকে ট্রেডার্স ও মোটরস।