ট্রাকমালিক সাহেব উল্লাহ গত মাসে বিআরটিএতে গিয়ে জানতে পারেন, আগে যে গাড়ির জন্য বছরে সাড়ে সাত হাজার টাকা আগাম আয়কর দিতেন, এখন থেকে ১৬ হাজার টাকা করে দিতে হবে। পরের দিন বাড়তি টাকা নিয়ে গিয়ে জানতে পারেন, আগের দুই বছরের আগাম কর বকেয়া রয়েছে! তাই একসঙ্গে ৩৩ হাজার টাকা দিতে হবে!
আগের দুই বছরে সাড়ে সাত হাজার টাকা করে কর দিয়েছেন সাহেব উল্লাহ। সেই রসিদও আছে তার কাছে। তার প্রশ্ন- তাহলে বকেয়া থাকল কীভাবে? আর করোনাকালে যেখানে পরিবহন খাত পাঁচ মাসের বেশি বন্ধ ছিল, এমন দুঃসময়ে কেনই বা কর দ্বিগুণের বেশি বাড়াল সরকার? এমন প্রশ্ন হাজারো বাস-ট্রাকসহ বাণিজ্যিক গাড়ির মালিকের।
সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা সমকালকে বলেছেন, আগাম আয়কর হঠাৎ বাড়েনি। ২০১৯ সালে গেজেট হলেও বর্ধিত কর আদায় করতে তখন চিঠি দেয়নি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ফলে বিআরটিএ সফটওয়্যার হালনাগাদ করা হয়নি। গেজেট জারির ২১ মাস পর এনবিআর চিঠি দিয়েছে। এরপর হালনাগাদের কাজ শুরু হয়। গত জুলাই থেকে বর্ধিত আয়কর নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আদায় করা হচ্ছে গেজেট জারির সময়, অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে। ফলে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের সঙ্গে বকেয়া ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরের বর্ধিত আয়করও নেওয়া হচ্ছে। ফলে দুই বছর আগে বাড়ানো আগাম আয়কর এখন 'বকেয়াসহ' দিতে হচ্ছে।
দুই বছর আগে আয়কর বৃদ্ধির গেজেট হলেও তখন সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতায় তা আদায় করেনি বিআরটিএ। ফলে এখন একসঙ্গে তিন বছরের আগাম আয়কর দিতে হচ্ছে। ১০ বছরের পুরোনো গাড়ির কর তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
মালিকরা বলছেন, করোনাকালে এমনিতেই তাদের অবস্থা করুণ। লকডাউনে প্রায় দেড়শ দিন গাড়ি বন্ধ ছিল। বর্ধিত আয়করের চাপ আরও কষ্ট বাড়িয়েছে। বর্ধিত কর প্রত্যাহারের দাবিতে মালিক-শ্রমিকদের নানা সংগঠন আন্দোলনে নেমেছে।
২০১৯ সালের ২৩ জুন বাণিজ্যিক পরিবহনে আগাম আয়কর বৃদ্ধি করে গেজেট জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। ৫২ সিটের বাসের আগাম আয়কর বছরে সাড়ে ১২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১৬ হাজার, এর চেয়ে কম সিটের বাসের কর ৯ হাজার থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ১১ হাজার টাকা করা হয়। এসি বাসের আয়কর ৩০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে।
পণ্য পরিবহনের গাড়িতে কর তুলনামূলক বেশি বেড়েছে। কনটেইনারবাহী প্রাইমমুভার প্রতি আয়কর ১৯ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার টাকা। পাঁচ টনের অধিক ট্রাকের আয়কর সাড়ে ১২ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা হয়েছে। পাঁচ টনের কম, অর্থাৎ মাঝারি ট্রাকে সাড়ে সাত হাজার টাকার আয়কর বেড়ে সাড়ে ৯ হাজার হয়েছে। ছোট ট্রাক-পিকআপের কর তিন হাজার থেকে বেড়ে সাড়ে চার হাজার টাকা হয়েছে।
আগের নিয়মে ১০ বছরের পুরোনো বাণিজ্যিক গাড়ির ক্ষেত্রে আগাম আয়কর দিতে হতো অর্ধেক বা তার কাছাকাছি। যেমন- ৫২ সিটের বাসের আয়কর সাড়ে ১২ হাজার হলেও ১০ বছরের পুরোনো গাড়ির ক্ষেত্রে দিতে হতো সাড়ে ছয় হাজার টাকা। প্রাইমমুভার ১০ বছরের পুরোনো হলে বছরে ১৯ হাজার টাকার পরিবর্তে ১০ হাজার টাকা দিতে হতো। নতুন নিয়মে এমন কোনো রেয়াত নেই। গাড়ি পুরোনো হলেও বছরে ২৪ হাজার টাকা করে
দিতে হবে। ফলে পুরোনো প্রাইমমুভার মালিকদের কর প্রকৃত অর্থে বেড়েছে আড়াই গুণ।
বড় ট্রাকেও একই হারে কর বেড়েছে। আগে ১০ বছরের পুরোনো পাঁচ টনের বেশি পণ্য বহনে সক্ষম ট্রাকে বছরে সাড়ে সাত হাজার টাকা কর দিতে হতো। এখন সময় যাই হোক না কেন, ১৬ হাজার টাকা কর দিতে হচ্ছে বড় ট্রাকপ্রতি। তাই মালিকরা বলছেন, একটি ট্রাকের আয়ুস্কাল অনায়াসে ২০ বছর। ২৫ বছরের ট্রাকও চলছে। অধিকাংশ মালিকের
ট্রাক ১০ বছরের বেশি পুরোনো। এমন ট্রাকে কর দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে।
তবে বিপরীত কথাও রয়েছে। সরকারি সংস্থার ভাষ্য, এতে মালিকদেরই লাভ হয়েছে। নতুন নিয়মে গাড়ির আগাম কর তাদের রিটার্নে যোগ হবে। প্রদর্শিত আয়ের কর থেকে আগাম আয়কর বেশি হলে মালিকদের আর বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে না। গাড়িতে যে আয়কর নেওয়া হচ্ছে, তা আগাম কর। বিষয়টি পরিস্কার করতে কর্মকর্তারা বলছেন, ধরুন- একজন পরিবহন ব্যবসায়ীর একটি ট্রাক রয়েছে। তা দিয়ে ব্যবসা করে বছরে তিনি যে পরিমাণ আয় করেন, তাতে তাকে ২০ হাজার টাকা আয়কর দিতে হবে। তিনি যদি অর্থবছরের শুরুতেই ট্রাকের জন্য ১৬ হাজার টাকা আগাম আয়কর দেন, তবে বছর শেষে রিটার্নে তাকে মাত্র চার হাজার টাকা কর দিতে হবে। আর যদি ব্যবসা থেকে আয়ের ওপর কর ১৬ হাজার টাকার কম হয়, তবে আর কোনো টাকা দিতে হবে না।
তবে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ সমকালকে বলেছেন, গত দেড় বছরের মধ্যে পাঁচ মাস গাড়ি বন্ধ থাকায় মালিকদের করযোগ্য আয়ই নেই। আগাম আয়করের সঙ্গে তা সমন্বয় হবে কীভাবে? করোনাকালে মালিকরা এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত। মালিকরা কোনো প্রণোদনা বা ক্ষতিপূরণ পাননি। চালক-শ্রমিকদের বেতনই দিতে পারছেন না। বাড়তি কর কোথা থেকে দেবেন?
পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক রুস্তম আলী সমকালকে বলেছেন, বর্ধিত আয়কর প্রত্যাহার এবং গত দুই মাসে যত টাকা নেওয়া হয়েছে, তা ফেরতের দাবি জানিয়ে তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিলেও কোনো সাড়া পাননি। আগামী রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হবে তাদের। আয়কর না কমালে কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য হবেন মালিক-শ্রমিকরা। সরকার কীভাবে এই করোনাকালে কর বাড়ায়! মালিক-শ্রমিকদের ডেকে তো অন্তত একবার কথা বলতে পারত।
১৫ দফা দাবি নিয়ে গতকাল বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে বৈঠক করে মালিক-শ্রমিকদের সংগঠন ঐক্য পরিষদ। তাদেরও প্রধান দাবি বর্ধিত আয়কর প্রত্যাহার। সরকারি পক্ষ অন্যান্য দাবি বিবেচনার প্রতিশ্রুতি দিলেও আগাম আয়কর কমানোর আশ্বাস দেয়নি।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার সমকালকে বলেছেন, আগাম আয়কর এনবিআরের বিষয়। বিআরটিএ আদায় করে মাত্র। সরকার যেভাবে গেজেট করেছে, সেভাবেই আদায় করছে। ২০১৯ সালে গেজেট হলেও সমন্বয় না হওয়ায় তখন আদায় করা যায়নি।