করোনা মহামারির আগে দেশে দরিদ্রের হার ছিল ২০ শতাংশ। করোনাকালে সরকারি হিসাবেই তা বেড়ে হয়েছে ২৫ শতাংশ। সে অনুযায়ী দেশে এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। কিন্তু এর পরও ১০ টাকা কেজিতে চাল দেওয়ার জন্য মাত্র ৪৭ হাজার দরিদ্র পরিবার 'খুঁজে পাচ্ছেন না' সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা। তাই ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের তালিকা পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি। এখন পর্যন্ত ওই তালিকায় নাম উঠেছে ৪৯ লাখ ৫৩ হাজার ৩৮৫ পরিবারের।
খাদ্য অধিদপ্তরের ভাষ্য, নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার পরও মাঠ পর্যায় থেকে দরিদ্র ব্যক্তিদের তালিকা পাওয়া যাচ্ছে না। পছন্দের ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করতে জনপ্রতিনিধিরা এ কাজে বিলম্ব করছেন, আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ইউএনওরা অতিরিক্ত সময় পার করছেন। এর ফলে সরকারের অনুমোদন থাকার পরও সুবিধাবঞ্চিত রয়েছে ২২৪ উপজেলার ৪৬ হাজার ৬১৫টি দরিদ্র পরিবার।
১০ টাকা কেজিতে চাল দেওয়ার কর্মসূচিটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা করা কর্মসূচি। স্লোগান- 'শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ'। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী কুড়িগ্রামে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। কর্মসূচির জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে এবং ইউনিয়নে ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে কমিটি আছে। তারাই হতদরিদ্র পরিবারের তালিকা করে কার্ড দেন।
এ কর্মসূচির উপজেলা কমিটির সভাপতি ইউএনও। গত কয়েক দিনে সমকাল-এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রায় ৫০ জন ইউএনওর সঙ্গে কথা বলা হয়। এর মধ্যে ২০ জন বলেন, তালিকাভুক্ত করতে কতজন বাকি আছে, বিষয়টি তাদের জানা নেই।
যে ২২৪ উপজেলায় দরিদ্র পরিবার 'খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না', তার মধ্যে রয়েছে জামালপুরের নদীভাঙনপ্রবণ উপজেলা বকশীগঞ্জ, মাদারগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ। মাদারগঞ্জের ইউএনও ইলিশায় রিছিল সমকালকে জানান, নতুন করে দরিদ্রদের তালিকাভুক্ত করতে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, মে মাসের ১৮ তারিখে তিনি যোগদান করেছেন।
এর আগের কর্মকর্তারা হয়তো নিয়মিত হালনাগাদ করেননি।
বকশীগঞ্জের ইউএনও মুনমুন জাহান লিজা বলেন, 'কিছু দরিদ্রকে নতুন করে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। তবে কতজন তালিকাভুক্ত করা বাকি; এ বিষয়টি আমার জানা নেই।' একইভাবে দেওয়ানগঞ্জের ইউএনও এ.কে.এম. আব্দুল্লাহ বিন রশিদ বলেন, তালিকাভুক্ত করা কতজন বাকি; তা জানা নেই।
বকশীগঞ্জের মেরুরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গাজী মো. জাহিদুল ইসলাম জেহাদ সমকালকে বলেন, তার ইউনিয়নে ১১৯ জন দরিদ্র তালিকাভুক্ত হওয়া বাকি। এ জন্য নতুন তালিকা তৈরির বিষয়ে ১৫ দিন আগে তিনি ইউএনও অফিস থেকে চিঠি পেয়েছেন। তবে তার নদীভাঙন এলাকায় কার্ড পাওয়ার মতো প্রায় তিন হাজার মানুষ আছে। অনেক বেশি দরিদ্র থাকায় তালিকা যাচাই-বাছাই করতে সময় লাগছে।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সন্ধ্যানী স্কুলপাড়া গ্রামের জামেলা খাতুন সমকালকে জানান, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর পাঁচজনের সংসার তাকে পরিচালনা করতে হচ্ছে। বড় সংসার নিয়ে তিনি চরম কষ্টে দিন পার করছেন। সরকারের খাদ্য সহায়তা পাওয়ার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বহুবার যোগাযোগ করার পরও তিনি কোনো সহায়তা পাননি।
গাংনী উপজেলায় তালিকাভুক্ত হওয়া বাকি ৮৬৩টি দরিদ্র পরিবার। কুড়িগ্রামের চর রাজীবপুর উপজেলার করাতিপাড়া গ্রামের ভূমিহীন দিনমজুর মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, চার সন্তান, বৃদ্ধ মাসহ আটজনের সংসার নিয়ে চরম কষ্টে দিন পার করছেন। তার পরও করোনাকালে সরকারের সহায়তা পাইনি। এ উপজেলায় তালিকাভুক্তির অনুমোদন আছে ৫৬৫টি দরিদ্র পরিবারের।
বছরের মার্চ, এপ্রিল, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর- এই পাঁচ মাস ১০ টাকা কেজিতে দরিদ্রদের চাল দেওয়া হয়। এই পাঁচ মাস পরিবারপ্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। এতে প্রতি মাসে দেড় লাখ টন চাল বিক্রি করা হয়। এ হিসাবে গত পাঁচ বছরে ২৫ মাস এ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। চাল বিতরণ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩৭ লাখ টন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম সমকালকে বলেন, গত বছর করোনার শুরুতে যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে অনেক মানুষের নাম বাদ পড়েছে। তাদের স্থলে নতুন দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়েছে। এ জন্য সেপ্টম্বরের মধ্যে তালিকাভুক্ত করে চাল বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তালিকা থেকে কেউ বাদ গেলে সঙ্গে সঙ্গে নতুন ব্যক্তিকে তালিকাভুক্ত করার কথা বলা আছে নীতিমালায় এ বিষয়ে সচিব বলেন, দরিদ্রদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনেক কঠিন কাজ। প্রকৃত দরিদ্ররা তালিকাভুক্ত না হলে আবার সমালোচনা হবে। এ জন্য হয়তো সময় লাগছে।
সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২২৪ উপজেলার ৪৬ হাজার ৬১৫ উপকারভোগীকে ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তালিকাভুক্ত করতে গত ১৯ আগস্ট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের চিঠি দিয়েছিল খাদ্য অধিদপ্তর। এর পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা ইউপি চেয়ারম্যানদের চিঠি দেন। কিন্তু তালিকাভুক্তির কাজ বেশিরভাগ উপজেলায় শুরুই হয়নি। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। এর পরও খাদ্য অধিদপ্তরে তালিকা পাঠানো হয়নি। এখন পুরো সেপ্টেম্বর জুড়ে এ কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছে অধিদপ্তর।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ সমকালকে বলেন, সারাদেশে দরিদ্রদের ইউনিয়নভিত্তিক তালিকা তৈরি করতে হবে। এর পর কোনো কর্মসূচি চালু হলে তালিকা অনুযায়ী সুবিধা পাবে। ডিজিটাল তালিকা করলে প্রতি মুহূর্তে উপকারভোগীদের যোজন-বিয়োজন করা সম্ভব। এতে কোটি কোটি গরিব মানুষের দেশে সরকারি সুবিধার অনুমোদন থাকার পরও আর কেউ বঞ্চিত হবে না। কিন্তু ইউনিয়ন পর্যায়ে দরিদ্রদের তালিকা না থাকায় যখন কোনো কর্মসূচি শুরু হয় তখন দরিদ্র মানুষ খুঁজতে হয়। এতে অনেক সময় একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা পাচ্ছে। যারা পাওয়ার যোগ্য নয় তারাও কম টাকায় চাল পাচ্ছে। এতে প্রকৃত দরিদ্ররা সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছে।
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির নীতিমালায় দরিদ্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে- 'গ্রামে বসবাসরত সবচেয়ে হতদরিদ্র পরিবার :যেমন- ভূমিহীন, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, ভিক্ষুকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নারীপ্রধান পরিবার ও যেসব পরিবারে শিশু বা প্রতিবন্ধী রয়েছে তারা অগ্রাধিকার পাবে।'
এ রকম দরিদ্রদের তালিকা করার উদ্দেশ্যে 'ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ পভার্টি ডাটাবেজ' নামে একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন করা হয় ২০১৩ সালে। পরে প্রকল্পের নতুন নামকরণ হয় এনএইচডি-'ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডাটা'। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ৪ গুণ। সময় গেছে আট বছর। তারপরও দেশে দরিদ্রের চূড়ান্ত তালিকা করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান বলেন, দরিদ্রদের তালিকা চূড়ান্ত করার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত চাপ দেওয়া হচ্ছে। যারা তালিকা দিতে পারেননি তারা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়েছেন। খাদ্য বিভাগও সেপ্টেম্বরের মধ্যে তালিকা চূড়ান্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এর মধ্যে না হলে বুঝতে হবে, অন্য কোনো সমস্যা আছে। তখন সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক তপন কুমার দাস সমকালকে বলেন, দরিদ্রদের তালিকা করে ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটি। তারা খাদ্য বিভাগের নিয়ন্ত্রণে বাইরে। তাই তালিকা তৈরির জন্য তাদের চাপ দেওয়া যায় না। তারা তালিকা দেওয়ার পরই চাল সরবরাহ করা হয়।

বিষয় : দরিদ্রদের তালিকা

মন্তব্য করুন