জাতিসংঘের সালিশি আদালতে বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পরও দুই প্রতিবেশী দেশের এ নিয়ে টানাপোড়েনের শেষ হয়নি। ভারত দুই দেশের সমুদ্রসীমায় যে বেসলাইন বা ভিত্তিরেখা টেনেছে, সে বিষয়ে বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের মহীসোপানের দাবির বিপরীতে আপত্তি দিয়েছে ভারত। বিষয়টি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা ও ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে কোনো প্রভাব না ফেললেও বারবার আলোচনায় আসছে।
এই টানাপোড়েনের শেষ কোথায়? এ প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট) অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম সমকালকে জানিয়েছেন, মহীসোপানের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের কমিশন অন দ্য লিমিটস অব দ্য কন্টিনেন্টাল শেলফ-এর (সিএলসিএস) সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হবে।
আর ভারত যে বেসলাইন টেনেছে, সেটা 'ইউনাইটেড নেশন কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি' বা সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদের ৭ নম্বর আর্টিকেলের পরিপন্থিভাবে করা হয়েছে। এ কারণে সেটা এমনিতেই জাতিসংঘে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া ২০১৪ সালে জাতিসংঘের সালিশি আদালতের রায়ে মহীসোপানসহ সমুদ্রসীমার বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এরপর অন্য কোনো দাবি বা আপত্তি জাতিসংঘের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়।
তবে দুই দেশের ভেতরে সমুদ্রসীমা নিয়ে এই টানাপোড়েন কত দিন চলবে, তা এখনও সুনির্দিষ্ট নয়। কারণ, জাতিসংঘের সিএলসিএস ওয়েবসাইটে জমা দেওয়া অন্যান্য দেশের আপত্তির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের বিষয় নিয়ে টানাপোড়েন, আপত্তি-পাল্টা আপত্তি চলেছে। বর্তমানে সিএলসিএসের ওয়েবসাইটে ৮৮টি আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে ৪৯টির বিষয়ে সিদ্ধান্ত এসেছে। বাংলাদেশের জমা দেওয়ার ক্রমিক নম্বর ৫৫। এই ক্রমিক নম্বরের কথা উল্লেখ করে অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম জানান, বাংলাদেশের ক্রমিক নম্বর আর খুব বেশি দূরে নেই। আশা করা যায়, মহীসোপানের বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য সিএলসিএসের বৈঠকে বিষয়টি উঠতে আর খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্নেষক হুমায়ুন কবীর সমকালকে বলেন, সমুদ্রসীমা নিয়ে ইস্যুটিকে কূটনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকে না দেখে টেকনিক্যাল ইস্যু বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত। প্রকৃতপক্ষে যে আপত্তি-পাল্টা আপত্তির বিষয়, সেটা সমুদ্রসীমায় ভিত্তিরেখা এবং মহীসোপান দাবির টেকনিক্যাল দিককে নিয়েই। এটা দুই দেশের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হলে সেটাই সবচেয়ে সুন্দর হয়। দ্বিপক্ষীয় আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান না হলে এটি সিএলসিএসের সিদ্ধান্তেই সমাধান হবে। তিনি আরও বলেন, সমুদ্রসীমায় মহীসোপান বাংলাদেশের জন্য 'লাইফলাইন'। অতএব, বাংলাদেশের এ বিষয়ে নিজেদের দাবির পক্ষে জোরালো অবস্থানের কোনো বিকল্প নেই।
মতানৈক্য যেখানে :সিএলসিএসের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ ও ভারতের জমা দেওয়া চিঠিগুলো থেকে দেখা যায়, ভারত ১৯৭৬ সালে সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করে। এর প্রায় ৩৩ বছর পর ২০০৯ সালে ভারত সমুদ্রসীমায় নিজেদের ভিত্তিরেখা নির্ধারণের জন্য সংশোধনী আনে। এই সংশোধনী অনুযায়ী ভারত সমুদ্রতীরের পরিবর্তে সমুদ্রের ভেতর থেকে ভিত্তিরেখা ধরেছে। ভারত যে ভিত্তিরেখা ধরেছে, তার ৮৭ নম্বর পয়েন্টটি সমুদ্র থেকে শুরু হয়েছে; যেখান থেকে ভারতীয় উপকূল প্রায় ১০ নটিক্যাল মাইল দূরে। আবার ৮৯ নম্বর ভিত্তি পয়েন্টের অবস্থান বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার প্রায় ২ দশমিক ৩ মাইল ভেতরে। সর্বশেষ গত ১৩ সেপ্টেম্বর সিএলসিএসে জমা দেওয়া চিঠিতে বাংলাদেশ এই ৮৯ নম্বর পয়েন্টের উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদের ৭ নম্বর আর্টিকেলের ৩ ও ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে কীভাবে ভিত্তিরেখা বা স্ট্রেইট বেসলাইন টানতে হবে, তা সুস্পষ্ট করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই ভিত্তিরেখা অবশ্যই সমুদ্রতীর থেকে শুরু করে আঁকতে হবে। এটি কোনোভাবেই সমুদ্রের ভেতর থেকে টানা যাবে না। আইনের এ বিষয়টি উল্লেখ করেই ভারতের ভিত্তিরেখা জাতিসংঘ আইনের পরিপন্থি উল্লেখ করে এর বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ- জানান অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম।
অন্যদিকে, মহীসোপানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিএলসিএসে দাবি জমা দেয় ২০১১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। এরপর এর বিপরীতে ভারত আপত্তি দিলে বিষয়টি জাতিসংঘের সালিশি আদালতে যায়। এরপর ২০১৪ সালে সালিশি আদালতের রায়ে বাংলাদেশের দাবীকৃত মহীসোপান মানচিত্রের কিছুটা পরিবর্তন করে রায় দেন আদালত। সেই রায় অনুযায়ী বাংলাদেশ সংশোধিত মহীসোপান দাবি জমা দেয় ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে। পরে ভারত বাংলাদেশের সংশোধিত মহীসোপান দাবির বিপরীতেও আপত্তি জানায়। চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল জমা দেওয়া আপত্তিতে ভারত উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ যে ভিত্তিরেখার ভিত্তিতে মহীসোপান দাবি করেছে, তা ভারতের মহীসোপানের অংশ। বিশেষভাবে সাগরাভিমুখে বাংলাদেশের এই মহীসোপান দাবিতে সমুদ্রে এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের পরিবর্তন ঘটেছে এবং তা ভারতের এক্সক্লুসিভ জোনের সীমা অতিক্রম করেছে উল্লেখ করে ভারত বাংলাদেশের মহীসোপান দাবি মেনে না নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে সিএলসিএসকে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ গত ১৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া চিঠিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বাংলাদেশ ২০১৪ সালে ঘোষিত রায়ের আলোকেই মহীসোপান নির্ধারণ করেছে এবং এ নিয়ে আপত্তির কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। এখন সিএলসিএসের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের মহীসোপান দাবি।
এ ছাড়া বাংলাদেশের মহীসোপান দাবি নিয়ে অপর প্রতিবেশী দেশ একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, তবে কোনো আপত্তি দেয়নি। মিয়ানমারের পর্যবেক্ষণেও ২০১৪ সালে জাতিসংঘের সালিশি আদালতের রায়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্নিষ্ট একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, মূল সমস্যা ২০১৪ সালের রায়ের পর দুই দেশের সমুদ্রসীমার ভিত্তিরেখা নির্ধারণকে কেন্দ্র করে। ভিত্তিরেখা নির্ধারণ নিয়ে মতানৈক্য না থাকলে আর কোনো বিষয়ে সমস্যা থাকবে না। ২০১৪ সালের পর থেকেই বাংলাদেশ দু'দেশের দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি করতে চেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। ফলে আদালতের রায়ের পরও মহীসোপান দাবি চূড়ান্ত করার বিষয়টি সিএলসিএসের সিদ্ধান্তের দিকে গড়িয়েছে।
মহীসোপান কী :সমুদ্রতীরের দেশগুলোর ভূখণ্ড থেকে যে অংশ ক্রমাগত ঢালু হয়ে সমুদ্রের জলরাশির গভীরে এগিয়ে যায়, সেই অংশটিকে মহীসোপান বা কন্টিনেন্টাল শেলফ বলা হয়। এটাকে উপকূলীয় ভূখণ্ড বা সংশ্নিষ্ট দেশের বর্ধিতাংশও বলা হয়। জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদ অনুযায়ী সমুদ্রসীমার মূল ভিত্তিরেখা থেকে সাড়ে তিনশ মাইলকে মহীসোপান বলা হয়। এই মহীসোপানের প্রথম ২০০ মাইল হচ্ছে এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন, যেখানে মৎস্যসম্পদ আহরণ এবং সমুদ্রের তলদেশে খনিজ সম্পদের একচ্ছত্র অধিকার থাকবে সংশ্নিষ্ট দেশের। অর্থাৎ, বাংলাদেশের মহীসোপানের প্রথম ২০০ মাইলের মধ্যে সমুদ্রের জলের ওপরে-নিচে যত সম্পদ আছে, তার মালিক হবে বাংলাদেশ। এ সীমায় অন্য দেশের জেলেরা মাছও ধরতে পারবে না। প্রথম ২০০ মাইলের পর পরবর্তী ১৫০ মাইল সীমায় জলের নিচের প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক হবে বাংলাদেশ; কিন্তু এই জলসীমায় প্রতিবেশী বা পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের জেলেরাও মাছ ধরতে পারবে। ভিত্তিরেখা নির্ধারণ এবং ভিত্তিরেখা থেকে এই সাড়ে তিনশ মাইল নির্ধারণের দাবি নিয়েই এখন টানাপোড়েন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে।


বিষয় : সমুদ্রসীমা

মন্তব্য করুন