শালবনে এই লতা কতবার যে দেখেছি, হিসাব নেই। ভালোভাবে চোখে পড়ল ফুল ফোটার পর। এমন অনেক লতাই শালবনের বাসিন্দা। বিভিন্ন মৌসুমে এসব লতা নিজেদের বদলে ফেলে। নতুন পাতা আর ফুলের প্রাচুর্যে নিজেদের সাজিয়ে নিতে পছন্দ করে। এর কোনো কোনোটির ফুলের রং এতটাই চটকদারি যে, অনেক দূর থেকেই আমাদের আকৃষ্ট করে। তবে শাল লতার জৌলুস ঠিক ততটা না হলেও প্রাচুর্যের কারণে খুব সহজেই চোখে পড়ে।

শরতে কাশ-শিউলির রেশ কমতে শুরু করলে প্রকৃতি প্রায় হতশ্রী হয়ে ওঠে। ততদিনে শাপলা-পদ্মের বিলও জৌলুস হারাতে থাকে। তখন চারপাশে দুই-একটি করে শুভ্র কেওফুল ফুটতে শুরু করে। দূরের বনে ফোটে এই ফুল। এরা স্থানীয়ভাবে গোয়ালিয়া লতা বা পান লতা নামেও পরিচিত। 

শাল লতা নামকরণের প্রধান কারণ, এরা মূলত শালবনের স্থায়ী বাসিন্দা। বৈজ্ঞানিক নাম Spatholobus parviflorus। শরৎ বা হেমন্ত ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময়ই জংলি লতা হিসেবে আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। তবে শরতে ফুলের দৈন্য ঘোচাতে নগর উদ্যানেও এ ফুল থিতু হতে পারে। ২০১৪ সালের দিকে গাজীপুরের হাতিয়াবো'য় আরণ্যক লাগোয়া শালবনে ফুলটি প্রথম দেখি। তারপর অবশ্য শালবনের বিভিন্ন অংশে আরও কয়েকবার দেখেছি।

চিরসবুজ লতানো গাছ। কাণ্ড বাঁশির মতো, মূল বেশ বড় কন্দযুক্ত, ৩ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। শাখা-প্রশাখা ধূসর, রোমশ ও গুটিকাযুক্ত। কাণ্ডে লেন্‌টিসেল আছে। তাই লাল আঠা নিঃসৃত হয়। আবার কচি ডগা কাটলেও লাল আঠা বের হয়। পুষ্পবিন্যাস এবং পাতার নিম্নতল ধূসর মখমলের মতো। পত্রফলক ৩টি। পাতা ত্রিপত্রিক, ১৫ থেকে ২২ সেন্টিমিটার লম্বা। ফুল ক্রিমের মতো ঘিয়ে-সাদা বা গোলাপি রঙের, ০.৮ থেকে ১.২ সেন্টিমিটার লম্বা। পুংকেশর ১০টি, দ্বিগুচ্ছক, পরাগধানী সমরূপ। 

ফল শিমের মতো, ৭ থেকে ১২ সেন্টিমিটার লম্বা এবং তির্যকভাবে আয়তাকার। ফুল ও ফলের মৌসুম আশ্বিন থেকে চৈত্র। এ গাছের কাঠ থেকে আঠা পাওয়া যায়, বীজ থেকে তেল হয়। বাকল তন্তু হিসেবে ব্যবহার্য। বাকলের ক্বাথ শোথরোগ, অণুজীব ও সর্পদংশনের প্রতিষেধক। বীজ থেকে চারা হয়। চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং সিলেটের বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাওয়া যায়। গাছটি বিপন্ন নয়।