তার জীবনদর্শন, কথা কম বলে কাজ বেশি করা। ক্রিকেট মাঠেও এই নীতিতে চলেন। ব্যাটের ভাষায় বলতে চান নিজের না বলা কথা। টি২০ বিশ্বকাপ নিয়ে তাই তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল না লিটন কুমার দাসের কাছ থেকে। ছোট ছোট বাক্যে বললেন- 'সুযোগ পেলে ভালো খেলার চেষ্টা করব। শতভাগ দিয়ে চেষ্টা করব।' তবে এই কম বলার মধ্যেও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঠিকই দিয়েছেন লিটন- টি২০-তে ভালো দল হতে গেলে ভালো শুরু লাগে। বাংলাদেশ দলকে সেই ভালো শুরুটা দেওয়ার চেষ্টা করেন লিটন। স্ট্রাইক রেট উঁচুতে রেখে পাওয়ার প্লে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেন। আর এটা করতে গিয়ে কখনও সফল হন, কখনও বেশি দূর যেতে পারেন না। দলের স্বার্থে খেলেন বলেই ডট বল বেশি খেলতে দেখা যায় না তাকে। মিতভাষী লিটনের সঙ্গে ফোনালাপ থেকে অনেক কথাই তুলে এনেছেন আলী সেকান্দার


সমকাল: আমিরাতে এশিয়া কাপটা স্মরণীয় হয়ে আছে আপনার জন্য। সেই ভেন্যুতে এবার বিশ্বকাপ। ভালো কিছু আশা করছেন নিশ্চয়ই?\হলিটন :চেষ্টা তো থাকবেই ভালো কিছু করার। জানি না, ওই সময়টাই আসবে কিনা বা ওর থেকে খারাপ, ওর থেকে ভালো আসবে।

সমকাল: ভালোই আশা করতে তো দোষ নেই?

লিটন: আশা তো মানুষ ভালোর জন্যই করে। খারাপের আশা কে করে বলেন (হাসি)।

সমকাল: টি২০-তে আপনার শুরুটা খুব ভালো হয়; কিন্তু লম্বা ইনিংস হয় না কেন?

লিটন: আমি কভিডকালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শুধু দুটি টি২০ সিরিজ খেলেছি। কভিডের আগের সিরিজেই দুই ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরি করেছি। আসলে ওরকম কিছু না। উইকেটটাও বড় ইনিংস খেলার মতো ছিল না। খুব বেশি ব্যাটসম্যান কিন্তু শেষ সিরিজে হাফ সেঞ্চুরি করেনি। আমার মনে হয় না টি২০ খারাপ খেলছি।

সমকাল: তা হলে কি ফোকাসটা স্ট্রাইক রেটে বেশি থাকে?

লিটন: আমার ব্যক্তিগত মত হলো, টি২০ ক্রিকেটে ভালো দল হতে গেলে ওপরের শুরুটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পাওয়ার প্লেতে। আমি চেষ্টা করি, পাওয়ার প্লেতে ভালো একটা স্ট্রাইক রেট নিয়ে শেষ করতে, যাতে দলের উপকারে আসে।

সমকাল: ২০১৯ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলেছেন। এবার খেলবেন টি২০ বিশ্বকাপ। স্মরণীয় হয়ে থাকবে তো?

লিটন: আমি চেষ্টা করব আমার শতভাগ দেওয়ার জন্য। সুযোগ পেলে অবশ্যই শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করব।

সমকাল: ওপেনিংয়ে বোঝাপড়াটা কেমন থাকে, একজন আক্রমণাত্মক হলে অন্যজনকে কি ধরে খেলতে হয়?

লিটন: আমার স্কিলের ওপর যেটুকু আস্থা আছে, সেটুকু দিয়েই আমি চেষ্টা করি। নাঈম বা সৌম্য যাদের যে স্কিল আছে তারা সেটাকে ব্যাক করে। আমার কাছে মনে হয়, এখানে এমন কিছু নেই যে ধরে খেলা বা মেরে খেলতে হবে। যার যেটা স্কিল সে সেটার ওপর নির্ভর করে খেলে।

সমকাল: আনেকে বলেন, লিটনের অনেক প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও সব সংস্করণে ধারাবাহিক হতে পারছে না?

লিটন: বাংলাদেশ দলে খেলতে গেলে সবারই প্রতিভা থাকতে হয়। সবাই প্রতিভাবান খেলোয়াড়। আসলে প্রতিভার প্রমাণ হয় মাঠে। আমি চেষ্টা করি মাঠে প্রমাণ করতে। যেটা বললেন, তিন সংস্করণে এখনও ধারাবাহিক হতে পারিনি- আসলে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারই এমন। একটি সিরিজ ভালো যাবে, অন্যটি মোটামুটি বা খারাপ যায়। বিশ্বে খুব কম খেলোয়াড়ই আছে যাদের ধারাবাহিক সিরিজ ভালো যায়। আপনি দেখেন, হাতেগোনা ক'টা খেলোয়াড় আছে বিশ্বে যারা প্রতি সিরিজেই একশ-দেড়শ রান করে? খুব কম তাই না। এটাকে মেনে নিতে হবে। ধারাবাহিক অধারাবাহিক বলে কিছু নেই।

সমকাল: ভারতের বিপক্ষে দারুণ ইনিংস আছে। আরও কিছু বড় দলের বিপক্ষে রান আছে। এর পরও লোকে বলে আপনি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শুধু ভালো খেলেন। এসব শুনতে খারাপ লাগে?

লিটন: হাসি...। ভালো খেলা কি দোষ? আসলে একেক জনের পারসেপশন একেক রকম। আমি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ভালো খেলি, মানুষ বলতেই পারে ছোট দল তাই ভালো খেলে। আবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভালো খেলতে পারি না। তারা বড় দল তাই। এগুলো আসলে একেক জন মানুষ একেকভাবে চিন্তা করে। এগুলো নিয়ে আমার চিন্তা করার কিছু নেই।

সমকাল: কিপিংটা কতটা উপভোগ করেন?

লিটন: আমি গেম খেলতে উপভোগ করি। ব্যাটিং, ফিল্ডিং যেমন উপভোগ করি তেমনি কিপিংও উপভোগ করি। যখন যে রোল দেওয়া হয়, সেটাই চেষ্টা করি শতভাগ পালন করতে।

সমকাল: আপনার কি হোম সিকনেস আছে?

লিটন: আমার ওরকম লাগে না। বরং বিদেশের মাঠে খেলতে আমার বেশি ভালো লাগে।

সমকাল: টি২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কখনোই সেভাবে ভালো করেনি। কন্ডিশন এবং দলের সাম্প্রতিক সাফল্যের কারণে এবার প্রত্যাশা অনেক বেশি। আপনার কী বিশ্বাস?

লিটন: আমরা শেষ তিনটি সিরিজেই ভালো ক্রিকেট খেলেছি। তিনটিই বড় দল বলব। কারণ জিম্বাবুয়ে তাদের হোম কন্ডিশনে খুবই ভালো দল। আমার মনে হয়, তিনটি সিরিজ জেতার পর খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্তত একটুকু বিশ্বাস থাকবে, আমরা বড় দলকে হারিয়েছি। এখান থেকে আমরা একটা আস্থা বা বিশ্বাস নিয়ে যেতে পারছি। বিশ্বকাপে ওই বিশ্বাসটা নিয়ে যেতে পারব।

সমকাল: যে কন্ডিশনে খেলা হয়েছে তাতে কি ব্যাটসম্যানরা মোরালি একটু ডাউন থাকবে?

লিটন: এই কন্ডিশনে না হয় ভালো করেনি। উইকেট স্লো ছিল। কিন্তু জিম্বাবুয়েতে তো ভালো উইকেটে খেলা হয়েছে। ওখানে তো ব্যাটসম্যানরা ভালো করেছে। আসলে যেখানে রানের উইকেট থাকবে সেখানে রান হবে এবং ব্যাটসম্যানরা রান করবে। আমার বিশ্বাস, ভালো কন্ডিশনে ব্যাটসম্যানরা ঠিকই মানিয়ে নেবে এবং ভালো করবে।

সমকাল: মাহমুদুল্লাহ বলছিলেন- বড় মঞ্চে খেলতে হলে ক্রিকেটারদের ট্যাকটিক্যালি ও মেন্টালি কিছু জিনিস পরিবর্তন করতে হবে। সেটা করা গেলে ভালো করবে দল। আপনি কীভাবে সেই ফাইনটিউন করছেন?

লিটন: একেকজন খেলোয়াড়ের একেক রকম রোল। একেক ক্যাটাগরি। যে সাতে খেলে ওপেনিংয়ে তার জন্য কঠিন। আমি আবার সাতে ভালো খেলতে পারব না। যার যেটা রোল, সে সেখানেই ফোকাস করছে এবং চেষ্টা করছে যেন শতভাগ দিতে পারে দলকে।

সমকাল: দ্বিপক্ষীয় সিরিজ ও বিশ্বকাপের ম্যাচে বেসিক পার্থক্য কী?

লিটন: বিশ্বকাপও একটি গেম। সাধারণ সিরিজের গেমে যে চাপ থাকে বিশ্বকাপ গেমেও সে চাপই থাকবে। আমার কাছে ওইরকম পার্থক্য মনে হয় না। তবে একটা জিনিস হতে পারে সেটা হচ্ছে- দ্বিপক্ষীয় সিরিজে পারফর্ম করলে যেভাবে কাউন্ট করে বিশ্বকাপে সেই পারফরম্যান্স করলেই বেশি কাউন্ট করবে। কারণ সব দেশই বিশ্বকাপের খেলা দেখে। ১০-১২টি দেশের দর্শক খেলা দেখে বিশ্বকাপ চলাকালে। হোম সিরিজ হলে ওই ভাবে খুব একটা কেউ খেয়াল করে না। একজন খেলোয়াড় হিসেবে যদি বলি, প্রতিটি গেমই সমান গুরুত্বপূর্ণ। হোম সিরিজে যেমন চাপ থাকে বিশ্বকাপ ম্যাচেও একই চাপ থাকে। যদি সেটা সেমিফাইনাল বা ফাইনাল ম্যাচ না হয়।

সমকাল: নাজমুল আবেদীন ফাহিম স্যার বলছিলেন- বিশ্বকাপে ভালো করতে না পারলে দ্বিপক্ষীয় সিরিজে পাওয়া সাফল্যগুলোকে আড়াল করে দেবে। আপনি কি একমত?

লিটন: একটু উদাহরণ দিয়ে বলি- আমরা যখন শিক্ষাজীবন শুরু করি সবাই জানে, কেজি ওয়ান থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ি এসএসসি পরীক্ষার জন্য। আলটিমেট গোল সবারই এসএসসি। বিশ্বকাপ বড় মঞ্চ, কিন্তু হোম সিরিজেও তো পাস করতে হবে। এই জায়গায় পাস করলেই বড় পরীক্ষায় ভালো করার সুযোগ থাকবে। প্রতিটি দল সিরিজ খেলে কারণ বড় মঞ্চে গিয়ে যেন ভালো করতে পারে।

সমকাল: ওমানে কন্ডিশনিং ক্যাম্প আছে। প্রস্তুতি ম্যাচ আছে চারটি। বিশ্বকাপের জন্য তৈরি হতে যথেষ্ট মনে করেন?

লিটন: টি২০ সংস্করণে খেলা। এখানে খুব বেশি প্র্যাকটিসের প্রয়োজন নেই। আমি যেটা জানি, দেশ দুটিতে হিউমিডিটি অনেক বেশি থাকে। অনেক দ্রুত ক্লান্ত হয়। আমার কাছে মনে হয়, যে ক'দিনের ক্যাম্প আছে বিশ্বকাপের জন্য তৈরি হতে যথেষ্ট সময়। কারণ প্রত্যেক খেলোয়াড় খেলার ওপরই আছে। যদি ওখানে বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক কারণে অনুশীলন বাধাগ্রস্ত না হয় তাহলে ভালোই হবে। যে ক'দিন প্র্যাকটিস থাকবে আমরা কাজে লাগাতে পারব।

সমকাল: এ পর্যন্ত যেটুকু অর্জন করতে পেরেছেন তাতে কি খুশি?

লিটন: নো কমেন্ট।

সমকাল: আপনাকে ভবিষ্যতের তারকা বলা হচ্ছে। এটা কি চাপ তৈরি করে?

লিটন: না এমন কিছু না। আপাতত যে কাজ সামনে আছে সেটা নিয়েই থাকতে চাই। অন্য কিছু নিয়ে ভাবছি না। ভাবতে চাইও না। খেলাটা ভালোভাবে খেলতে পারলেই খুশি।