বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিরোধী ঐক্যে বিভক্তি আনতে সরকার তার এজেন্সিগুলোকে সক্রিয় করেছে। সাংবাদিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন সব জায়গায় বিভক্তি এসে গেছে এবং বিভক্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমরা যারা গণতন্ত্র চাই, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব চাই-তাদের মধ্যে বিভিন্নভাবে ঐক্যের বিনষ্ট ঘটাচ্ছে সরকার।’

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে (একাংশ) বার্ষিক সাধারণ সভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশ ভয়াবহ দুঃসময় অতিক্রম করছে। এই দুঃসময় শুধু সংবাদমাধ্যমে নয়, এই দুঃসময় শুধু বিএনপিতে নয়, এই দুঃসময় পুরো জাতির জন্য। আওয়ামী লীগ সরকার জবরদখল করে ক্ষমতা ধরে রেখেছে। এ বিষয়ে আমাদের সকলকে সজাগ থাকতে হবে, সচেতন থাকতে হবে। আমরা যারা গণতন্ত্রের জন্য কাজ করছি, লড়াই করছি, সংগ্রাম করছি আমাদের বিভক্তির কোনো অবকাশ নেই। এই সরকারকে যদি সরাতে চাই, জনগণের একটা দৃঢ় ঐক্যের প্রয়োজন আছে, জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন আছে, সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের প্রয়োজন আছে। একইসঙ্গে সমস্ত সংগঠনগুলো যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে তাদের ঐক্যের প্রয়োজন আছে।’

তিনি বলেন, ‘সকলের প্রতি আমার আবদন থাকবে- বিভেদ নয়, আপনাদের ঐক্য, জনগণের ঐক্য দিয়ে এদেশের মুক্তি হবে, গনতন্ত্র মুক্তি পাবে, খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন।’

রাজনীতিবিদরা দেশ চালাচ্ছেন না, অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘১/১১ এর চক্রান্ত থেকে আমরা এখনও মুক্তি পাইনি। ২০০৮ সালের নির্বাচন, পরবর্তী নির্বাচন সবই এক লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আজ রাজনীতিবিদরা দেশ পরিচালনা করে না। একজন রাজনীতিবিদকে তারা দাঁড় করিয়ে রেখেছে। তাকে দিয়ে যত অরাজনৈতিক, গণবিরোধী, গণতন্ত্র বিরোধী সমস্ত কাজগুলো করিয়ে নিচ্ছে এবং রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠাগুলোকে তারা সুপরিকল্পিতভাবে ধবংস করে দিচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদে জনগণের কোনো প্রতিনিধিত্বই নেই। ২০১৪ সালে তারা ১৫৪ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করে একটা সংসদ গঠন করেছিলো এবং ২০১৮ সালে আগের রাতেই নির্বাচন করে। সেই নির্বাচনেও জনগণের কোনো অংশগ্রহণ ছিলো না, তারাই জালিয়াতি করে ভোট দিয়ে বিভিন্নভাবে তাদের নির্বাচিত করেছে এবং স্বঘোষিত প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের সঙ্গে মুক্তচিন্তা ও মুক্ত সাংবাদিকতা একত্রে যায় না। বিচারব্যবস্থায় দলীয়করণ করা হয়েছে। প্রশাসনে দলীয়করণ করা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদমাধ্যমকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। বেশিরভাগ সাংবাদিক এখন সেলফ সেন্সরশিপে ভুগছেন।’

নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিককে নির্যাতন করা হয়েছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এটাই আওয়ামী লীগের চরিত্র। যখনই তাদের মতের বিরুদ্ধে বলবেন, তখনই নির্যাতন করা হবে।’

নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এই কমিশন একটি আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন করে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে। আমাদের ৪২ জন বুদ্ধিজীবী নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য একটি আইন প্রণয়নের কথা বলেছেন। এটা ভালো কথা, কিন্তু এই আইনটা করবে কে? যে সংসদ করবে, সেখানে আওয়ামী লীগ ছাড়া কিছু নেই। যারা এ দেশের গণতন্ত্র হরণ করেছে, জনগণের সমস্ত অধিকার হরণ করেছে, তারাই এই আইন পাস করবে।’

নির্বাচন কমিশন আইন যারা চান, সবার আগে তাদের এই বিষয় লক্ষ্য রাখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ফখরুল বলেন, ‘আজ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার জন্য সংবিধান সংশোধন করেছে। দুর্ভাগ্য একটাই, আমাদের বিশিষ্ট নাগরিকেরা মাঝেমধ্যে কথা বলেন। কিন্তু এসব বিষয়ে তাদের যে একটা শক্তিশালী বক্তব্য দরকার, সেটা আমরা দেখছি না।’

বিএফইউজের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, ‘এই জালেম সরকারের পতন ঘটলে বাংলাদেশ সব ধরনের সাংবিধানিক অধিকার ফিরে পাবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সামনে রেখে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ডাক দিতে হবে এবং বিএনপি এই সংগ্রামের নেতৃত্ব দেবে।’

ডিইউজে সভাপতি কাদের গণি চৌধুরী সভাপতিত্বে সভায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, বিএফইউজের সভাপতি এম আবদুল্লাহ, মহাসচিব নুরুল আমিন রোকন, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক নেতা এমএ আজিজ, আবদুল হাই শিকদার, কামাল উদ্দিন সবুজ, সৈয়দ আবদাল আহমেদ, বাকের হোসাইন, জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মুরসালিন নোমানী, ডিইউজে সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, সহ-সভাপতি শাহীন হাসনাত, বাসির জামাল ও রাশেদুল হক বক্তব্য রাখেন।