নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের প্রথম মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাসহ পলাতক দুই আসামি এক বছরেও গ্রেপ্তার হয়নি। তাদের মধ্যে পুলিশের এক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) কামরুজ্জামান মিন্টু বিদেশে পালিয়েছেন বলে তথ্য মিলেছে। রায়ের তিন মাস পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক ছবিতে তাকে সিঙ্গাপুরের মেরিলিয়ন মনুমেন্ট এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আর এ মামলায় দণ্ডাদেশ পাওয়া পুলিশের সোর্স মো. রাসেল এখনও মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীর পল্লবী থানার চাঞ্চল্যকর এই মামলায় দণ্ডিত দুই পুলিশসহ অন্য তিন আসামি কারাগারে রয়েছেন।

আইনজীবীরা বলছেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি করা উচিত। তাদের কেউ গোপনে দেশত্যাগ করে থাকলে তার অবস্থান শনাক্ত করে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা দরকার। আইনটির প্রথম মামলার রায়কে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সরকারের দায়িত্ব।

পল্লবী থানার ওসি পারভেজ ইসলাম সমকালকে বলেন, পলাতক দুই আসামিকে গ্রেপ্তারে আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। তাদের অবস্থানের ব্যাপারে কোনো তথ্য পেলে তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে এক আসামির গতিবিধি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। দ্রুতই তাকে গ্রেপ্তারের আশা করছে পুলিশ।

পল্লবী-১১ নম্বর সেকশনের ইরানি ক্যাম্পে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেন জনি ও তার ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকিকে আটক করে পুলিশ। তাদের পল্লবী থানায় নিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে জনি মারা যান। এ ঘটনায় ওই বছরের ৭ আগস্ট হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন রকি। বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মারুফ হোসেন ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেন। ২০১৬ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা এ মামলায় পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তারা হলেন- পল্লবী থানার তৎকালীন এসআই জাহিদুর রহমান জাহিদ, এএসআই রাশেদুল হাসান ও কামরুজ্জামান মিন্টু, পুলিশের সোর্স সুমন ও রাসেল।

পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েস এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। এতে তিন পুলিশ কর্মকর্তার যাবজ্জীবন এবং দুই সোর্স সুমন ও রাসেলকে সাত বছরের কারাদ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে দণ্ডিত প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তাকে ভুক্তভোগীর পরিবারকে দুই লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়।

এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষকে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। ব্লাস্টের আইনজীবী বদিউজ্জামান তপাদার সমকালকে বলেন, রায় ঘোষণার পর কারাগারে থাকা তিন আসামি আদালতে আপিল আবেদন করেছেন। তবে এর শুনানির জন্য আগে পেপারবুক প্রস্তুত হতে হবে। পাশাপাশি তারা জামিনের জন্যও আবেদন করেছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর শুনানির তারিখ নির্ধারিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। পলাতক দুই আসামিকে জামিন আবেদন করতে হলে আগে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

এই আইনজীবী আরও বলেন, পলাতক আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত। তবে যেহেতু তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরই সদস্য ছিল, তাই তাদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্টদের গড়িমসি থাকতে পারে।

নিহত জনির ছোট ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি সমকালকে বলেন, দণ্ডিত তিন পুলিশের মধ্যে এএসআই রাশেদুল রায়ের দিন পর্যন্ত চাকরিতে বহাল ছিলেন। রায়ে দণ্ডিত হলে তাকে আদালত থেকেই কারাগারে পাঠানো হয়। একইভাবে রায়ের কিছুদিন আগ পর্যন্ত চাকরি করেছেন এএসআই মিন্টু। পরে পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে তিনি পালিয়ে যান। অথচ আইন অনুযায়ী, অপরাধ সম্পৃক্ততার অভিযোগে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিচার শুরু হলে তিনি আর দায়িত্বে থাকতে পারেন না। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বরখাস্ত থাকার কথা।

রকি জানান, রায়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তিনি এখনও তা পাননি। কারাগারে থাকা দুই পুলিশ সদস্য টাকা জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তারা টাকা হস্তান্তর না করার জন্য আদালতে আবেদন করেন। তাদের বক্তব্য, আপিলে নির্দোষ প্রমাণিত হলে তারা কার কাছে ওই টাকা ফেরত চাইবেন? ফলে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত টাকা হস্তান্তর না করার সিদ্ধান্ত দেন আদালত।

এদিকে দণ্ডিত সোর্স রাসেল এখনও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এলাকায় না থাকলেও গভীর রাতে বা ভোরে এসে কামরান নামে তার এক সহযোগীর কাছে ইয়াবার চালান পৌঁছে দিয়ে যায় বলে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এস এম রেজাউল করিম সমকালকে বলেন, পুলিশ বলছে- পলাতক আসামিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এই আইনের প্রথম মামলার যুগান্তকারী রায়টি বাস্তবায়নের স্বার্থে তাদের গ্রেপ্তারে সংশ্নিষ্টদের আন্তরিক হওয়া দরকার।