দীর্ঘ লকডাউনে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়া দেশের পর্যটন খাত আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। মানুষ আবার ভ্রমণে বের হওয়ায় হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন। তবে ট্যুর অপারেটরদের ব্যবসা জমছে না। তারা বলছেন, ভ্রমণ ভিসা বন্ধ থাকাসহ নানা সমস্যায় অন্য সময়ের চেয়ে ৭৫ শতাংশ ব্যবসা কমে গেছে।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত ১৯ আগস্ট থেকে খুলেছে পর্যটনের দুয়ার। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, করোনাকালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে পর্যটন খাত। তবে বিদেশ ভ্রমণে বিধিনিষেধের কড়াকড়ি থাকায় ভ্রমণপিপাসুরা এখন দেশের ভেতরেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এতে অভ্যন্তরীণ কিছু পর্যটন ব্যবসা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

পর্যটন-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, পর্যটন খাত স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে। করোনার ধাক্কা ছাড়াও অবকাঠামোগত সমস্যা, নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতার অভাব, আন্তর্জাতিক প্রচার না থাকায় সম্ভাবনাময় এ খাতটি পিছিয়ে যাচ্ছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে নতুন উদ্যোগ দরকার। সরকার বলছে, জনপ্রিয় পর্যটন স্থানগুলো নিয়ে তাদের রয়েছে আলাদা পরিকল্পনা। পর্যটকদের অন-অ্যারাইভাল ভিসা সহজ করতে নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে পর্যটন খাত বাংলাদেশের জিডিপিতে ৫৫ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা অবদান রেখেছে, যা ২০১৯ সালে ছিল ৮০ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে ২৬ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। অর্থনীতিতে খাতটির অবদান কমেছে ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৯ সালে এ খাতে ১৮ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান ছিল। ২০২০ সালে তা কমে ১৪ লাখে দাঁড়িয়েছে। এ সময় কর্মসংস্থান কমেছে ২১ দশমিক ৯ শতাংশ। দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার, সিলেট ও বান্দরবানের পাঁচতারকাসহ উন্নতমানের হোটেল-রিসোর্টগুলো এখন পর্যটকদের পদচারণায় সরগরম। বিশেষ করে ছুটির দিনে বেড়েছে ভিড়। তবে পুরোপুরি গতি হারিয়েছে ট্যুর অপারেটররা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে ঘুরতে যায় ১৫ লাখ মানুষ। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান সমকালকে বলেন, সারা বিশ্ব স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্তপর্যটন শিল্প খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে। ২০২৩ সালে সারা বিশ্ব খুলে গেলে পর্যটন খাত চাঙ্গা হতে পারে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপ্লোরার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সহিদুল ইসলাম সাগর সমকালকে বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ছয় হাজার ট্যুর অপারেট আছে। সবার ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। করোনার আগে অন্যান্য বছরের এ সময়ে সবচেয়ে ছোট ট্যুর অপারেটর কোম্পানিরও দৈনিক কমপক্ষে ২০ জন পর্যটক থাকত। কিন্তু এবার নাম করা প্রতিষ্ঠান মাসে একটি ট্যুরও করতে পারছে না। ছুটির দিন ছাড়া অন্য সময়ে সব হোটেল-মোটেলে ৭০ শতাংশ রুম খালি পড়ে আছে। বিদেশে আসা এবং যাওয়া বন্ধ হয়ে আছে। দেশে যেসব পর্যটক ঘুরছেন, তারা নিজ উদ্যোগে ঘুরছেন। ফলে ট্যুর অপারেটরা চরম দুর্দিনে আছে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) জাবেদ আহমেদ সমকালকে বলেন, পর্যটনের তিনটি অনুষঙ্গ। ডমেস্টিক (অভ্যন্তরীণ), ইনবাউন্ড (বিদেশি পর্যটক) ও আউটবাউন্ডের (বিদেশগামী) মধ্যে এখন শুধু ডমেস্টিক ট্যুরিজম চালু আছে। ট্যুর অপারেটররা লাভবান না হলেও অন্য খাতের ব্যবসায়ীদের আয় বেড়েছে।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, পর্যটকদের অন-অ্যারাইভাল ভিসা সহজ করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি তা হয়ে যাবে। সরকার দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। ভিসার ব্যাপারে আঞ্চলিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আসছে মাস্টারপ্ল্যান :পর্যটন-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কমতি না থাকলেও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার অভাবে এগোতে পারছে না দেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত। মহামারির কারণে লকডাউন এ খাতকে করেছে আরও বিপর্যস্ত। পর্যটন কর্মসংস্থানে পিছিয়ে থাকার নানা কারণের মধ্যে দক্ষ জনবলের অভাব, পর্যটনকে শিল্প হিসেবে ঘোষণার পরও যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া, পর্যটননীতিকে আইনে পরিণত না করা, পর্যটন পেশায় আগ্রহী ব্যক্তিদের সামাজিক প্রতিবন্ধকতাসহ নানা বিষয়কে দায়ী করছেন সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিরা।

পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান তথা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইপিই গ্লোবাল লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল এ বছর জুনে। তবে মহামারির কারণে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বাংলাদেশ ত্যাগ করায় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালের আগে তাই শেষ হচ্ছে না মাস্টারপ্ল্যানের কাজ।

এ অবস্থায় মহামারির ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি দেশের পর্যটন খাতকে আরও সমৃদ্ধ করতে নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে গতকাল রোববার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পর্যটন সচিব মোকাম্মেল হোসেন বলেন, তিনটি ধাপে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হবে। পর্যটন উদ্যোক্তাদের ঋণ কার্যক্রম নিয়ে এক প্রশ্নে সচিব বলেন, এই শিল্পের জন্য প্রধানমন্ত্রী দেড় হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। দ্রুত প্রণোদনা দেওয়ার জন্য কাজ চলছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হোটেল-মোটেলগুলোতে কীভাবে আধুনিক সুবিধা দেওয়া যায় সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে। তার আশা, পর্যটনকেন্দ্র আর বন্ধ করা না হলে দুই বছরের মধ্যে অভ্যন্তরীণ পর্যটন চাঙ্গা হবে। তখন কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে লাভের আশা করা যাবে।

পর্যটন দিবসে নানা কর্মসূচি :আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য 'অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে পর্যটন'। দিবসটি উপলক্ষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন ভবনে আলোচনা সভা, ঘোড়ার গাড়ির র‌্যালি, মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করা, গুলশান-বারিধারার কূটনৈতিক এলাকায় বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রচারণা চালানো হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগসহ দেশের অন্যান্য পর্যটন অংশীজন দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।