ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি নামল। তাই আর বেরোনো হলো না। কথাবার্তা যদিও শেষ হয়েছে ততক্ষণে। বৃষ্টিটাকে আশীর্বাদই বলতে হবে, তখনই ওখান থেকে ফিরে এলে অনেক কথা অজানা রয়ে যেত। খোলা আকাশের নিচ থেকে সরে আসতে হলো ঘরের বারান্দায় এবং কথাও প্রাণ পেল ততক্ষণে।
বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ছাউনির নিচে নিতে হলো অনেক কিছু। আমি ক্যামেরাটা ধরেই গ্লাসের বাকি জলটুকু এক চুমুকে গিলে নিলাম। উহ্‌! এটা বেশি ঘন ছিল। কোচরা মেরাটাকে মান্দিদের চুয়ের মতো ফং দিয়ে মেশায় না। তারা এটাকে হাত দিয়ে মেশায় বলে কড়া হয় বেশি। রংটা চুয়ের মতো সাদাটে, যদিও একটু হলুদাভ। মেরা হলো কোচদের পানীয়। মান্দিরা তাদের পানীয়কে বলে চু।
বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বারান্দায় উঠে যাওয়ার পর নতুন করে কথাবার্তা শুরু হলো। সেই কথা 'কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো-/ আকুল করিল মোর প্রাণ।' গৃহকর্তা জাগেন্দ্র কোচ অতিথিদের রাতে থেকে যাওয়ার অনুরোধ জানালেন। বৃষ্টি ঝরছে জোরেশোরেই। বৃষ্টিতে মাছ ধরার গল্প চলে এলো স্বাভাবিকভাবে। আমাকে দেখাতে মাছ রাখার পাত্র গিলিং আর মাছ ধরার জাখাই নিয়ে এলেন আওয়াই। কোচ ভাষায় জজ হলো দাদা বা নানা, আওয়াই অর্থ দাদি বা নানি। উচ্চারণটা 'জ-জ'। এতক্ষণে জজ পোশাকি কথাবার্তার বাইরে গিয়ে মন খুলে বলতে শুরু করলেন। বললেন, এই সবই তো বন ছিল, এখন আর বন নেই। সবকিছু বন বিভাগের। বাড়ির গাছ কাটলেও তারা নিয়ে যায়। আমরা শত বছর ধরে বসবাস করছি, কিন্তু জমির অধিকার আমাদের নেই।
কোচদের অনেক ভাগের একটি তিনটিকিয়া। ভাগগুলো হলো- মারগান, হারগিয়া, তিনটিকিয়া, চাপড়া, রাভা ইত্যাদি। তিনটিকিয়াদের মধ্যেই নিকিনি আছে ২৬টি। নিকিনি মানে গোত্র। ধারণা করা হয়- তিন টুকরো কাপড়কে পরিধেয় করে নিত বলে এমন নামকরণ হয়েছে তাদের। তিনটিকিয়ারা কোচদের মধ্যে নিম্নবর্গীয় বলে পরিচিত ছিল। যদিও তারাই নিজেদের ঐতিহ্য ভালোভাবে ধরে রেখেছে বলে ধারণা করা হয়। লোকমুখে প্রচলিত ইতিহাস থেকে শোনা যায়, কোচদের কোনো এক রাজা হিন্দু ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন। রাজা চেয়েছিলেন, কোচরা সবাই হিন্দু হয়ে যাক। তখন এই তিনটিকিয়ারা প্রতিরোধ করে। শেরপুরের কোচরা প্রায় সকলেই তিনটিকিয়া। প্রতিরোধের ইতিহাস তো পৃথিবীজুড়েই মূলত নিম্নবর্গের, নিম্নবিত্ত এবং বিত্তহীনের ইতিহাস। আমি গল্পের মতো প্রচলিত ওই ইতিহাসকে যাচাই করতে যাইনি। তবে কোচ, মান্দি ও মণিপুরিদের মধ্যে বৈষ্ণব মতাবলম্বী হিন্দু ধর্মের প্রচার-প্রসার ঘটেছিল, সে বিষয়ে সংশয়ের খুব অবকাশ নেই। কোচ রাজা যদিও শৈব মতের অনুসারী হয়েছিলেন। রাজার ধর্মান্তরিত করার চাপ এড়ানোর জন্য তিনটিকিয়ারা গভীর বনে আশ্রয় নিয়েছিল। শেরপুর তো পুরোই বন ছিল একসময়। এখানকার দাওধারা, সমশচূড়া, শালচূড়া, ডেফলাই, হালচাটি, গান্দিগাঁও (উত্তর ও দক্ষিণ), বাঁকাকুড়া, পানবর (উত্তর ও দক্ষিণ), জোকাকুড়া, হাতিবর, খলচান্দা, বড় রাংটিয়া, নয়া রাংটিয়া, খাড়ামোড়া, বাবেলাকোনা, নকশি গ্রামে তাদের বসতি রয়েছে এখনও। এ ছাড়া নেত্রকোনার দুর্গাপুর এবং টাঙ্গাইলের মধুপুর ও ঘাটাইলে কোচরা রয়েছে। গাজীপুরেও আছে তাদের কিছু মানুষ। এই সব এলাকার সর্বত্রই বন ছিল। এখনও আছে, বিপন্ন অবস্থায়। বনের মতোই বিপন্ন কোচসহ অন্য আদিবাসী বনজীবীরা।
বন না থাকা, খাজনা দিতে না পেরে জমির মালিকানা হারানোর আক্ষেপ শুনেছি জজর কণ্ঠে। তিনি জানান, ১৯৬৪ সালের রায়টের সময়ে প্রথম শ তিনেক বাঙালি পরিবার আসে তাদের এলাকায়। রায়টের সময় কোচদের বেশিরভাগই ওপারে ভারতীয় অংশে আশ্রয় নিয়েছিল। পরে ফিরে এসে অধিকাংশ কোচ পরিবার তাদের ঘরবাড়িটা পর্যন্ত ফিরে পায়নি। কোচরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রতিবাদ জানাতে গিয়েও দেশত্যাগে বাধ্য হয়ে বাস্তুহারা হয়েছে। পরে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার এসে জমি রেকর্ড করা বন্ধ করে দিল তাদের। বন বিভাগ খাজনা নেওয়া বন্ধ করে কোচদের অস্তিত্বকে এক রকম অস্বীকার করার বন্দোবস্ত করল।
প্রসঙ্গত বলি, জাগেন্দ্র জজর বাড়িতে যাওয়ার আগের দিন তাদের গ্রাম রাংটিয়ার কাছের আরেকটি গ্রাম বালিজুড়ি গিয়েছিলাম আমরা। সেখানে গিয়ে অনেক মর্মান্তিক ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সেগুলো এই লেখাতে বলব না। কিন্তু সবচেয়ে বেশি স্তম্ভিত হয়েছিলাম, যখন একজন বন কর্মকর্তা বললেন, আদিবাসীরা চাষ করতে গিয়ে মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে ঐতিহ্যবাহী গারো পাহাড়কে সমান করে ফেলেছে। প্রায় একই কথা জেলা প্রশাসকও শোনালেন আমাদের। আমার মনে পড়ল, জুম চাষ নিয়েও এমন প্রচারণা আছে, যেটা মিথ্যা এবং উল্টো। যিনি চুরি করেন, তিনিই গৃহস্থকে চোর অপবাদ দেন, এমনটাই হলো। আমি বন কর্মকর্তাকে বললাম, আদিবাসীরা তো আজকাল মাটি খুঁড়ে চাষ করছে, আধুনিক কৃষিপদ্ধতি অনুসরণ করে, যা আমরা শিখিয়েছি। তারা তো গাছ পুঁতে দিত, নয়তো বনের গাছ থেকে খাবার সংগ্রহ করত; বরং আপনারা তিন দশকের বেশি সময় ধরে আকাশমণি লাগিয়ে মাটিকে বালু করে দিয়েছেন, সেই বালু বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাচ্ছে, ফলে পাহাড় সমতলে রূপান্তরিত হচ্ছে। আমি যা ছিটেফোঁটা পরিবেশবিদ্যা পড়েছিলাম, তাই দিয়ে প্রতিবাদ জানালাম। কিন্তু কয়টি অপবাদকে প্রতিবাদ দিয়ে প্রতিহত করা যায় আসলে? যেখানে দখল ও লুটতরাজই মূলমন্ত্র, সেখানে বৈচিত্র্য রক্ষার চিন্তা তো বিলাসিতা।
জজ প্রথম আলাপচারিতায় কিছুই বলেননি এসব। বাইরের লোককে কি আমরা আমাদের গভীর দুঃখের কথাগুলো বলি? বলি না। কখনও তেমন সময় এলে বলি। জজও বলতে শুরু করলেন। কারণ, তখন বৃষ্টি পড়ে মাটি ভিজে গেল। বারান্দা ভিজে যাচ্ছিল। আর গলাটাও ভিজেছিল, সেটা আগেই বলেছি।
কোচদের ইতিহাস সুপ্রাচীন। কোচরা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত তিব্বতীয় বা বোডো মহাগোষ্ঠীর আওতাভুক্ত বলে ভিন্ন ভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী মত দিয়েছেন। তবে টলেমির উদ্ধৃতি দিয়ে খ্রিষ্টের জন্মের দুইশ বছর পরে উত্তর ভারতের কামরূপ অঞ্চলে বোডো, কোচ, মান্দি, হাজং, মেছ, ডিমাসা, লালুং, রাভা, কাছারি- এই রকম ৯টি জনজাতির বসবাসের কথা উল্লেখ করেছেন আদিবাসী লেখক খগেন্দ্র হাজং। মানুষের এই দলগুলো সময়ে সময়ে নানা রকম সংকটে বারবার স্থানবদল করেছে। তবে ভারতবর্ষে তারা দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে। মেঘালয়ের উত্তরে কোচবিহারে তাদের রাজ্য ছিল। মান্দি বা গারোরাও এই রাজ্যে বসবাস করেছে। এই রাজত্ব দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে শোনা যায়। সিলেটের খাসি পাহাড়েও কোচরা ছিল। এখনও মান্দি, কোচ আর খাসিদের পাশাপাশি বসবাস করতে দেখা যায় বিভিন্ন এলাকায়। কেউ কেউ কোচ আর রাজবংশীকে একই জাত বলে ভুল করেন। কোচ আর রাজবংশীরা যে এক জাতি নয়, সেটা ১৮৮১ সালের জনগণনায় দু'পক্ষের প্রতিবাদ থেকেই বোঝা যায়। তবে কোচ, মান্দি, খাসিদের মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। হয়তো মিলগুলোর কারণে তারা পাশাপাশি বসবাস করতে পেরেছে। পাশাপাশি বসবাস করতে গিয়ে তাদের মধ্যে মিল তৈরি হয়েছে বলা যাবে কিনা, তা নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। মাতৃসূত্রীয় হওয়ার মিলটাই আমার চোখে সবচেয়ে বড় মিল। কোচরা মায়ের নিকিনি অনুযায়ী পদবি পায়। তবে রাংটিয়ার আওয়াই যখন মেরা খেতে দিলেন, তখন আমার মনে হলো কোচ আর মান্দি জাতির উদ্ভব হয়তো একই নানির ঘরে। ধরা যাক, মা আর মাসিমা বিয়ের পরে দুই অঞ্চলে ঘর করলেন। অথবা দুই অঞ্চল থেকে তাদের জন্য বর আনা হলো। সংসারের পুরুষটির সংস্কৃতি আলাদা, নারী দু'জনের এক। এমন ক্ষেত্রে দুই বোনের সন্তানদের কিছু শিক্ষার মিল থাকবে, থাকবে অমিলও। আওয়াইয়ের মেরা বানানোর রীতি মান্দিদের থেকে অল্পই আলাদা ছিল। জজ যদিও বললেন, তাদের পরিবার পুরুষপ্রধান। কোচদের বংশপরিচয় তো মায়ের পরিচয়ে হয়। আজকাল অবশ্য কেউ কেউ বাবার পদবিও ব্যবহার করছে। সত্তর বছর আগেও শেরপুরের তিনটিকিয়ারা জামাই ঘরে আনত। সম্পত্তি পুরুষরা পায়, পরিচয় মায়ের। মান্দিরা মায়ের পরিচয় পায়, সম্পদও মেয়েরা পায়। এক গোত্রে বা নিকিনিতে বিয়ে করা কোচদেরও বারণ। কোচ ও মান্দিদের ভাষা আলাদা, যদিও কিছু শব্দ প্রায় একই রকম। কিছু গোত্রের নামেও মিল রয়েছে। নৃবিজ্ঞানীরা তো জানিয়েছেন, তাদের সবার ভাষা বোডো ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। তাই বলে কোচরা মান্দি না, বাঙালি তো নয়ই। আমার বোন তো আর আমি নই।