আশপাশে সুনসান নীরবতা। গাছের ছায়াঘেরা নির্মল আবহ। বুড়িগঙ্গা সেতু পার হলেই ঢাকার অদূরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে এমন পরিবেশে যাত্রা শুরু হলো মাদকাসক্তি নিরাময় ও মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ কেন্দ্র 'ওয়েসিস'। পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর আত্মপ্রকাশ ঘটল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এর উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে মাদক তৈরি হয় না। কিন্তু আমরা এর ভয়াবহতার শিকার। মাদক থেকে যদি যুবসমাজকে বিরত না রাখি, তাহলে এর পরিণতি কী হবে তা আমরা দেখেছি। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা সবাই জঙ্গি-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ করে সফল হয়েছি। এখন মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আমরা যদি মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শেষ হয়ে যাবে।
বর্তমানে কারাগারে বন্দি বেশিরভাগই মাদক মামলার আসামি বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, হেরোইন-ইয়াবার পরে আসছে ভয়ানক মাদক এলএসডি। এই এলএসডি যে কতটা ভয়ানক তা আপনারা ইতোমধ্যে দেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র নিজের গলা নিজে কেটে ফেলে।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আজিজুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম রব্বানী, ডা. অরূপ রতন চৌধুরী ও ডা. মোহিত কামাল, ঢাকার জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম প্রমুখ।
মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে না দেখে চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় নিয়ে নতুন এ প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাবে বলে বলছেন সংশ্নিষ্টরা। সমাজের যে কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, পুলিশ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমন এবং সমাজে নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষেত্রে বড় অবদান রাখছে। করোনা মোকাবিলায় সম্মুখযোদ্ধা হিসেবেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে পুলিশ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আমাদের কথা দিয়েছে, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরি করতে যা যা সাপোর্ট প্রয়োজন, তারা সেটা দেবে। এতে বাংলাদেশ ভ্যাকসিন তৈরির পর বিদেশেও রপ্তানি করতে পারবে। করোনাভাইরাসের টিকার জন্য সরকারের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যত টাকা লাগে লাগুক, দেশের প্রতিটি মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হবে, যাতে করে সারাদেশে মানুষ সুরক্ষিত থাকতে
পারে।'
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এবং স্থানীয় এমপি নসরুল হামিদ বিপু মাদকাসক্তদের চিকিৎসায় এ ধরনের একটি আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করায় আইজিপির গতিশীল নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, মাদকাসক্তদের রোগের নিরাময় করলেই হবে না। এর সঙ্গে সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আজিজুল ইসলাম বলেন, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা করা পুলিশের দায়িত্ব নয়। তবুও পুলিশ ওয়েসিসের মতো একটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে।
সভাপতির বক্তব্যে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ধনী-গরিব নির্বিশেষে মাদকাসক্ত সদস্যদের নিয়ে পরিবারের দুর্ভোগের ভয়াবহ করুণ চিত্র আমি দেখেছি। সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের গোপনে চোখের পানি ফেলতে দেখেছি। অনেকের মতে, বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৮০ লাখ। কেউ কেউ বলেন, এ সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় মাত্র সাত হাজারের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। তাহলে কত বছরে আমরা তাদের চিকিৎসা দিতে পারব? এসব দিক বিবেচনা করেই আমরা একটি আধুনিক মাদকাসক্তি নিরাময় ও মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। ভবিষ্যতে মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীতীরে বিশাল এলাকায় ৫০০ থেকে এক হাজার বেডের এ ধরনের হাসপাতাল করতে চাই। এ ক্ষেত্রে আমরা একটা রিজিওনাল হাব (আঞ্চলিক কেন্দ্র) করতে চাই।
আইজিপি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা অনেক ক্ষেত্রে 'মডেল' হতে পেরেছি। এ ক্ষেত্রেও আমরা 'মডেল' হতে পারব। এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রদানের জন্য তিনি বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
ড. বেনজীর বলেন, আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর হেলথ ট্যুরিজমে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যায়। আমরা যদি বিশেষায়িত হাসপাতাল করে বিদেশ থেকে এক্সপার্টদের নিয়ে আসতে পারি তাহলে আমাদের এই অর্থ দেশেই থাকবে। দেশে বিশেষজ্ঞ তৈরি হবে।
স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান বলেন, মাদক একটি বড় ধরনের সামাজিক সমস্যা। সামাজিকভাবে একে প্রতিরোধ করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে মাদকের অভিশাপ থেকে বাঁচাতে হবে।

বিষয় : মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি

মন্তব্য করুন