দেশে ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি হচ্ছে। তবে এখনও অনেক কিছু করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় বিধিবিধান সহজ করতে হবে। আরও সংস্কার করতে হবে। সহজে ঋণ পাওয়া, কারখানার জন্য জমি পাওয়া, প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং নিয়ম-কানুনের তথ্য সহজে পাওয়ার ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, শ্রম আইন, সীমান্ত ব্যবসা (ক্রস বর্ডার ট্রেড) ও কর পরিশোধ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে 'বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশ সূচক-২০২১' প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে এমসিসিআই। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। এমসিসিআই সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ।
ব্যবসা পরিবেশ নিয়ে দেশি সংস্থার পক্ষ থেকে প্রথম এ ধরনের সূচক প্রকাশ করা হলো। বিশ্বব্যাংক ডুয়িং বিজনেস নামে সারা বিশ্বের ওপর ব্যবসা পরিবেশের সূচক ও দেশভিত্তিক অবস্থান প্রকাশ করে আসছিল। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ঘোষণা দিয়েছে, তারা আপাতত এ প্রতিবেদন প্রকাশ করবে না।
এমসিসিআই ও পলিসি এক্সচেঞ্জ সারাদেশের এক হাজার প্রতিষ্ঠানের কাছে ১০টি বিষয়ে মতামত চায়। এর মধ্যে ৪৫১টি প্রতিষ্ঠান মতামত জানিয়েছে। ব্যবসা শুরু, জমি পাওয়া, ব্যবসা বাণিজ্যের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জানার সুযোগ, অবকাঠামো সুবিধা ভোগ, শ্রম আইন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, অন্য দেশের সঙ্গে ব্যবসা, কর পরিশোধ, প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়া- এই ১০টি নির্দেশকের ওপর মতামত নেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের মতামতের ভিত্তিতে ১০টি বিষয়কে আলাদা করে নম্বর দেওয়া হয়েছে।
জরিপের মাধ্যমে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে প্রত্যেক নির্দেশকের ওপর পরিস্থিতি বিচার করা হয়েছে। শূন্য থেকে ২০ নম্বরের অর্থ হচ্ছে ব্যবসার জন্য কঠিন পরিবেশ। ২১ থেকে ৪০ নম্বরের অর্থ হচ্ছে ব্যবসার জন্য উল্লেখযোগ্য বাধা রয়েছে। ৪১ থেকে ৬০ নম্বরের অর্থ হচ্ছে জটিল ব্যবসায়িক পরিবেশ। বিধিবিধান উন্নত ও সহজ করা প্রয়োজন। ৬১ থেকে ৮০ নম্বর বলতে ব্যবসা পরিবেশের উন্নতি হচ্ছে। তবে আরও উন্নয়নের জন্য উদ্যোগ দরকার। আর ৮১ থেকে ১০০ নম্বরের অর্থ হচ্ছে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বিরাজ করছে এবং তা ধরে রাখতে হবে। সামগ্রিকভাবে ব্যবসা পরিবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেয়েছে ৬১ নম্বর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণ বা উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের জন্য যথেষ্ট অগ্রগতি আছে। তবে অনেক নীতি উদ্যোগ অসমাপ্ত রয়েছে। বিশেষত বাণিজ্য সুযোগ, অর্থায়ন বাধা ও প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে আরও উদ্যোগ দরকার। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিধিবিধান ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে উন্নতি দরকার।
ব্যবসা শুরুর বিষয়ে বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে পরিবেশের উন্নতি হচ্ছে। তবে লাইসেন্স ও নৌ খাতের বিধিবিধানে জটিলতা রয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি পাওয়ার বিষয়টি এখনও দেশে জটিল। এ সূচকে চামড়া বা ট্যানারি খাতের পরিস্থিতি বেশি খারাপ। ৯০ ভাগের বেশি উত্তরদাতা মনে করেন ব্যবসার বিধিবিধান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন। এর কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আলাদা আলাদা নিয়ম এবং ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় অবস্থান। তবে বাংলাদেশের অবকাঠামো পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছেন উত্তরদাতারা। তারা জানিয়েছেন, সড়ক অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে সরকারের বিনিয়োগের সুফল পাচ্ছেন তারা। এ সূচক সবচেয়ে বেশি ৭২ নম্বর পেয়েছে। শ্রম বিধিমালারও উন্নয়ন হয়েছে। তবে দক্ষ শ্রমিক ও শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ নিয়ে বেশ জটিলতা রয়েছে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ও অন্য দেশের সঙ্গে ব্যবসার সূচকে আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে উন্নতি হচ্ছে। তবে আরও দরকার। এজন্য দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে কঠিন বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ব্যাংক ঋণ পাওয়াকে। তারা বলছেন, ব্যাংক ঋণ পাওয়ায় অনেকেরই বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সালমান এফ রহমান বলেন, বেশকিছু ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে উন্নতি হয়েছে। বেশকিছু কাজ চলছে। আশা করা যায়, আরও উন্নতি হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও উদ্যোগী হতে হবে। তবে লজিস্টিকসে আরও কাজ করা দরকার। তিনি বলেন, দেশীয় ব্যবস্থায় এ রকম একটি সূচক প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, গত বছরে অনেক সূচকে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স প্রকাশ না করায় তার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে আসেনি। ব্যবসায়ীরা কাজ করতে গিয়ে নিশ্চয় সুবিধা পাচ্ছেন। বিডা আরও কিছু কাজ করছে। আগামীতে এর সুবিধা ব্যবসায়ীরা পাবেন।
ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেন, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। বিনিয়োগের জন্য শিল্পাঞ্চল হচ্ছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সুবিধার পার্থক্য রয়েছে। এগুলো দূর করা দরকার।
এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ব্যবসার পরিবেশের ওপর নির্ভর করে দেশের অগ্রগতি কতটা হবে। ইতোমধ্যে অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যে ধরনের পরিবেশ দরকার, তার জন্য আরও উদ্যোগ নিতে হবে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, ব্যাংক ঋণ পাওয়া সহজ করতে হবে। ব্যাংকগুলো এখনও জামানতের বিপরীতে ঋণ দেয়। কিন্তু অধিকাংশ ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তার জামানত দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এ ব্যবস্থা থেকে বেরোতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এমসিসিআইর সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, বিল্ডের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম খান, ফিকির সভাপতি রূপালী চৌধুরী প্রমুখ।



বিষয় : এমসিসিআই ও পলিসি এক্সচেঞ্জের সূচক

মন্তব্য করুন