দুটি প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক প্রকাশনা কোম্পানি গত বছরে এবং সম্ভবত এর বছরখানেক আগে জেনেভার ওয়ার্ল্ড ট্রেড ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক মেধাস্বত্ব আইনের কয়েকটি পাঠ্যবইয়ের সৌজন্য কপি যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ড থেকে আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানায় পাঠান। বইগুলো পাঠাতে প্রকাশনা কোম্পানিগুলো দুটি জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক কুরিয়ার কোম্পানি এবং অধ্যাপক তার নিজের লেখা বইটির জন্য সাধারণ ডাক বিভাগের সেবা গ্রহণ করেন। বইগুলো পৌঁছানোর আগেই তারা ই-মেইলে পার্সেলগুলোর ইনভয়েস আমাকে পাঠিয়ে দেন। সে অনুযায়ী বইগুলো পেতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকি। এর আগে অবশ্য কয়েকবার ঢাকা জিপিওতে প্রতিনিধির মাধ্যমে শুল্ক্ক পরিশোধ সাপেক্ষে সৌজন্য কপি বই ও আমার লেখা সংবলিত জার্নালের সৌজন্য কপি সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম। এবার বাংলাদেশ ডাক বিভাগে কয়েকবার ই-মেইলে যোগাযোগ করেও ডাকে পাঠানো বইটির সন্ধান আজ অবধি পাইনি। তবে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই একটি প্রকাশনা কোম্পানি কর্তৃক পাঠানো বইয়ের পার্সেল গ্রহণের জন্য একটি কুরিয়ার কোম্পানির ফোন পাই। তারা আমাকে আমার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা ও বাংলাদেশ কাস্টম হাউসের শুল্ক্ক পরিশোধ সাপেক্ষে বইগুলোর ডেলিভারি নিতে বলে। এর পর বাংলাদেশ কাস্টমসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, ওই বইয়ের মূল্য বা ওজন অনুযায়ী কাস্টমস শুল্ক্ক পরিশোধ করতে হবে। এতে দেখা গেল, ইনভয়েসে মূল্য লেখা না থাকলেও কাস্টমস শুল্ক্কের পরিমাণ অ্যামাজন ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত বইয়ের মূল্যের চেয়ে বেশি। বিষয়টি নিয়ে আমার পরিচিত কাস্টমসের দু-একজন কর্মকর্তার সঙ্গেও যোগাযোগ করি; কিন্তু কোনো ফল হয়নি। এর পর প্রকাশনা কোম্পানিকে জানিয়ে দিই, শুল্ক্ক পরিশোধ করে বইগুলো গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।
শিক্ষকের কাছে পাঠানো সৌজন্য কপি পাঠ্যবইয়ের জন্য শুল্ক্ক পরিশোধ করতে হবে- এ কথা জেনে প্রকাশনা কোম্পানিটি খুবই আশ্চর্যান্বিত হয়; এমনটি বিশ্বের কোথাও হয়, তা তারা ভাবতেই পারেনি। বস্তুত পৃথিবীর সব দেশেই প্রকাশনা কোম্পানিগুলো বা সংশ্নিষ্ট লেখক তাদের প্রকাশিত বইয়ের বিক্রি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কোর্স শিক্ষকদের কাছে সেগুলোর সৌজন্য কপি পাঠান এবং শিক্ষকরা গুণাগুণের ভিত্তিতে বইগুলো ছাত্রদের কাছে সুপারিশ করেন। এ বইগুলো উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট এবং আমাদের মতো শিক্ষকদের কাছে
ভীষণ প্রয়োজনীয়।
বিদেশি উচ্চমূল্যের শ্রম, মেধাস্বত্ব ও বিনিয়োগ সহযোগে বিদেশে প্রকাশিত বই, জার্নাল, সাময়িকী ও রিপোর্টগুলো অনেক দামে বিক্রি হয়। এগুলো আমদানি করতে হলে এ দেশীয় আমদানিকারকদের পরিবহন ব্যয়, আমদানি শুল্ক্ক, বন্দরের নানাবিধ চার্জ, ক্লিয়ারিং ও ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট চার্জ, লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) চার্জসহ অনেক খরচ করতে হয়। এ ছাড়া আছে তাদের লাভ এবং মুদ্রা বিনিময় হারের তারতম্যের হিসাব। এসব চার্জ মিলিয়ে এ দেশে একটি বিদেশি বইয়ের অনেক দাম পড়ে। যেমন বইয়ের প্রাইস ট্যাগযুক্ত ভারতীয় ১০০ রুপির আমদানিকৃত একটি বই নীলক্ষেতের মতো খুচরা বইয়ের দোকানে এ দেশীয় মুদ্রায় প্রায়ই ১৮০-১৯০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। এর ফলে এ দেশের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যারা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে, তারা এসব দামি বই কিনে পড়তে পারে না। এ ছাড়া লাইব্রেরিগুলোও তাদের বাজেটস্বল্পতার কারণে এসবের অনেক বই সংগ্রহ করতে পারে না। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা উভয়ই ভালো বই পান না। আবার দু-একটি এমন বই কোথাও পাওয়া গেলে সেগুলো দেদার ফটোকপি করে সুলভ মূল্যে বিক্রি করতে দেখা যায়। এ ছাড়া কোনো কোনো সময় সেগুলো প্রকাশক, লেখক বা স্বত্বাধিকারীর বিনা অনুমতিতে এ দেশে প্রিন্ট হতে দেখা যায় এবং নকলকৃত বইগুলো মূল বইয়ের মতো বা কাছাকাছি মূল্যে বিক্রি হয়। মেধাস্বত্বের কপিরাইটবিষয়ক আইন যেটি বাংলাদেশে কপিরাইট আইন-২০০০ নামে পরিচিত, সেখানে বিদেশে প্রকাশিত বই, সাময়িকী ও রিপোর্টগুলো বাংলাদেশে শর্তসাপেক্ষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুরক্ষার আওতায় পড়বে, বলা হয়েছে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে বই, জার্নাল, সাময়িকী ও রিপোর্টগুলোর প্রকাশক, লেখক বা স্বত্বাধিকারী ১৮৮৬ সালের সাহিত্য ও শৈল্পিক কাজ সুরক্ষাবিষয়ক বার্ন কনভেনশন এবং ১৯৯৪ সালের মেধাস্বত্বের বাণিজ্য সম্পর্কিত দিকবিষয়ক চুক্তি ১৯৯৪ (ট্রিপস) এর সদস্যভুক্ত কোনো দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এবং সে দেশ বাংলাদেশে প্রকাশিত বই, সাময়িকী ও রিপোর্টগুলোকে অনুরূপভাবে সুরক্ষা দেয়।
বিদেশে প্রকাশিত বই, জার্নাল, সাময়িকী ও রিপোর্টগুলো যা বাংলাদেশে প্রকাশক, লেখক বা স্বত্বাধিকারীর বিনা অনুমতিতে প্রিন্ট বা ফটোকপি করে যত্রতত্র সুলভ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে, সেগুলো এ দেশে নিবন্ধন ছাড়া সুরক্ষাযোগ্য। ভারতে যদিও এ কাজগুলোকে সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে শিক্ষকের কোর্স নির্দেশিকার মধ্যে ফেলে কপিরাইট সুরক্ষায় ব্যতিক্রমের মধ্যে আনা হয়েছে। তবে প্রচ্ছদসহ প্রিন্ট বা ফটোকপি এ ব্যতিক্রমের মধ্যে পড়ে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক করার সুযোগ রয়েছে। আমাদের দেশে সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে এমন আদেশ আসেনি বিধায় বিদেশে প্রকাশিত বই, জার্নাল, সাময়িকী ও রিপোর্টগুলো সুরক্ষাযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ছাড়া ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হলে দেশটিকে পুরোপুরিভাবে ট্রিপস চুক্তি মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রকাশক, লেখক বা স্বত্বাধিকারীর বিনা অনুমতিতে প্রিন্ট বা ফটোকপিকে কপিরাইট আইনে শাস্তির আওতায় আনতে হবে; নচেৎ বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরোধ নিষ্পত্তি অঙ্গের সম্মুখীন হতে পারে। কাজেই বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে অন্য অনেক পদক্ষেপের মধ্যে বিশেষ করে আমদানিকৃত বইয়ের ওপর আরোপিত কাস্টমস শুল্ক্ক প্রত্যাহার করতে পারে। এর ফলে একদিকে যেমন বইয়ের কপিরাইট লঙ্ঘন দূর হবে, অন্যদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই বইগুলো সুলভ মূল্যে পাবেন।
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়