নির্বাচন কমিশন গঠন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে এ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও আইন প্রণয়নের কাজটি এড়িয়ে চলা 'রহস্যজনক'। বর্তমানে ও অতীতে যেসব দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিল, তারা সকলেই এই কাজটি সযতনে এড়িয়ে চলছে।
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, শর্টকাট মেথডে একটি সার্চ কমিটি তৈরি করে দায় এড়ানোর প্রবণতা চলছে। এই সার্চ কমিটি গঠন করে এমন লোকদের খুঁজে বের করা হচ্ছে, যাদের কেউ চেনে না। নির্বাচনী কাজের সঙ্গে আগে যাদের কোনো অভিজ্ঞতা বা সম্পৃক্ততা নেই, এমন লোকদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভালো নির্বাচন আয়োজনে তাদের কোনো ভূমিকা রাখতে দেখা যাচ্ছে না বা তারা কোনো ভূমিকা রাখতে পারছেন না। গত দুটি কমিশনের কার্যক্রমে সবার এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে।
একটি নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সরকার তার দায় এড়াতে পারে। কারণ, বর্তমান সংসদে তাদের মেজরিটি রয়েছে। যদিও নতুন আইন প্রণয়নের বিষয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দল ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপিও তাদের অবস্থান পরিস্কার করছে না। এ জন্য বিষয়টি 'রহস্যজনক'।
আইন করলেই যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে- এমনটা বলার সুযোগ নেই। তবে একটা সিস্টেম হয়তো এর মাধ্যমে শুরু করা যেতে পারে। আইন প্রণয়নের পরও যারা সরকারে থাকবে, তাদের পছন্দের লোক বসানোর সুযোগ বন্ধ হবে না। তারপরও এ আইন প্রণয়নে সরকার কেন আগ্রহী নয়, সেটা বোধগম্য হচ্ছে না। নতুন আইন প্রণয়নের একটা খসড়া তৈরি করে সেটা নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে। এ বিষয়ে বিএনপির বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। তারা বলছেন, বেআইনি সংসদের কাছে তারা কোনো দাবি করবেন না। দেশের অন্য সব কাজ চলছে, শুধু এ আইন প্রণয়নের জন্য এ কথা বলা যুক্তিযুক্ত হতে পারে না।
আইনের মাধ্যমে কমিশনারদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণ করতে হবে। সবাই চায় ভালো ইসি হোক। প্রতিবেশী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল এমনকি পাকিস্তানেও নির্বাচন ব্যবস্থা একটা সিস্টেমে দাঁড়িয়েছে। অথচ আমরা পারছি না। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। আবার এমনও হতে পারে, গোঁ ধরে বসে থাকব, যা করছি তা-ই করব- এটাও কারণ হতে পারে।
এখানে রাষ্ট্রপতি একটি বাছাই কমিটি গঠন করতে পারেন। এ নিয়ে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে গণশুনানির আয়োজন করা যেতে পারে। যাতে নিয়োগের আগে কারা নিয়োগ পাচ্ছেন, তাদের বিষয়ে সবাই আগে থেকেই জানতে পারেন।
বর্তমান পদ্ধতিতে পেশাভিত্তিক বা কোটাভিত্তিক কমিশনার নিয়োগের একটা প্রবণতা রয়েছে। এটাও সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। একজন বিচারক, একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা, একজন নারী সদস্য- এমন কোটা সংরক্ষণ সঠিক নয়। পেশাকে প্রাধান্য না দিয়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন কীভাবে সিভিল প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করবে- তা আইনে স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে।
শুধু ভালো আইন বা একটা ভালো নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে। 'সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, সুজন পতি যদি থাকে তার সনে।' একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে ইসি 'রমণীর' ভূমিকায় থাকলেও 'সুজন পতি' হিসেবে সরকারকে আচরণ ও ভূমিকা রাখতে হবে। অন্যথায় সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই।

বিষয় : আইন প্রণয়ন ড. তোফায়েল আহমেদ

মন্তব্য করুন