কুমিল্লায় একটি মন্দিরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় হামলা-ভাঙচুরের পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ২২টি জেলায় এরই মধ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। প্রয়োজনে অন্যান্য জেলায়ও বিজিবি মোতায়েন করার প্রস্তুতি রয়েছে। 'যে কোনো মূল্যে' সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ-র‌্যাব।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে 'ধর্মকে ব্যবহার করে যারা সহিংসতা' সৃষ্টি করছে, তাদের অবশ্যই খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজামণ্ডপে ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় এই হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এদিকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে এ বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট প্রধান, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর বৈঠকের সবাই মনে করছেন, ঘটনাটি উদ্দেশ্যমূলক। কোনো স্বার্থান্বেষী মহল, ষড়যন্ত্রকারী বা চক্রান্তকারী এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

মন্ত্রী জানান, কুমিল্লার পূজামণ্ডপের ঘটনায় কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে। এরই মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কুমিল্লার ঘটনার জেরে দেশের আরও কিছু জায়গায় এমন ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে চারজন নিহত হয়েছেন। যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ উস্কানি দিলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। যারা এসব অপচেষ্টা করছে ও করবে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

তিনি বলেন, 'দুর্গাপূজা শুরুর আগে সভায় সিদ্ধান্ত ছিল, যেখানে পূজা হবে, সেখানে পূজা কমিটি সিসিটিভি ক্যামেরা বসাবে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদেরও ভলান্টিয়ার থাকবে। কিন্তু অনেক পূজামণ্ডপেই সেগুলো করা হয়নি।'

'সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে' বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার কথা জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বৃহস্পতিবার তিনি রাজধানীর গোপীবাগে রামকৃষ্ণ মিশন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের সময় বলেন, 'সারাদেশে প্রতিটি পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা হচ্ছে বলে যাদের গাত্রদাহ, তারা দেশকে পিছিয়ে দিতে চায়। তাদের অপকৌশলের একটি হচ্ছে হিন্দু-মুসলমানের বৈরিতা সৃষ্টি করা। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার এই অপশক্তিকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেবে না। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে প্রশাসনকে সব ধরনের সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বথ্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।'

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কেউ যাতে উস্কানি দিয়ে পরিবেশ আরও ঘোলাটে করতে না পারে, সে জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশ ও র‌্যাবের সাইবার ইউনিটগুলোও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে সাইবার টহল শুরু করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, কুমিল্লার ঘটনাকে পুঁজি করে কেউ যাতে 'পরিস্থিতি ঘোলাটে' করতে না পারে, সেজন্য সারাদেশে পুলিশের ইউনিটগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 'যে কোনো মূল্যে' আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বলা হয়েছে।

বুধবার সকালে কুমিল্লায় একটি মন্দিরের ঘটনা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এক পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করতে গেলে তারাও তোপের মুখে পড়ে। বিক্ষুব্ধ লোকজনের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন। ওই ঘটনা একটি চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে দেশের আরও অনেক এলাকায় পূজামণ্ডপ ঘিরে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন সমকালকে বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি বাঙালির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এটা কেউ বিনষ্ট করার চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাইবার নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি টহলও জোরদার করেছে র‌্যাব। দেশজুড়ে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। কেউ বিশৃঙ্খলা করলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, পুলিশ সারাদেশে তৎপর রয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের কঠোরভাবে মোকাবিলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দপ্তর জানিয়েছে, দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা রক্ষার্থে সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কুমিল্লা, নরসিংদী ও মুন্সীগঞ্জসহ ২২টি জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়জুর রহমান জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা রক্ষার্থে দেশব্যাপী বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চাহিদা থাকলে রাজধানী ঢাকায়ও বিজিবি মোতায়েন করা হবে।

কুমিল্লার মন্দিরের ঘটনা এবং এর জেরে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুরের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন মো. ফয়েজ নামে এক ব্যক্তিসহ সন্দেহভাজন অন্তত ৪৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ বাদী হয়ে ধর্মীয় অবমাননা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং ভাঙচুরের ঘটনায় পৃথক চারটি মামলা করেছে। ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

কুমিল্লা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। তারা স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

পরে আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, একটি চক্র অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে দেশ পিছিয়ে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে। এর অংশ হিসেবেই মন্দিরের ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে।

বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান ও জেলা পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন, জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় নেওয়ার কাজ চলছে। নগরজুড়ে বিজিবি টহল দিচ্ছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, উস্কানি দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কুমিল্লার ঘটনায় প্রথম যে ভিডিওটি ফেসবুকে প্রকাশ পেয়েছে, তাতে খুবই উস্কানিমূলকভাবে ধারাবর্ণনা দেওয়া হচ্ছিল।

পুলিশ ওই ভিডিও পোস্টকারী ফয়েজকে আটক করেছে। তার কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি মনে করেন, কুমিল্লার ঘটনাটি পরিকল্পিত। তা না হলে ওই ঘটনার পর দেশের অন্যান্য এলাকায় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটত না।

ডিআইজি আনোয়ার হোসেন জানান, প্রতিটি ঘটনাতেই মামলার প্রস্তুতি চলছে। এখন পর্যন্ত ৪৩ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

চাঁদপুর ও হাজীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লার ঘটনার জেরে হাজীগঞ্জ বাজারে মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ অন্তত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। চারজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এলাকায় বিজিবির টহল চলছে।

সমকালের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুযায়ী, সকালে বান্দরবানে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। সেখান থেকে স্লোগান দিয়ে লামা বাজারে পূজার মণ্ডপে হানা দেয়। পাশাপাশি দোকানপাট ও বাসাবাড়ি ভাঙচুর করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। ওই হামলার প্রতিবাদে বিকেলে শহরে শান্তি সমাবেশ হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জে ছয়টি উপজেলায় বিভিন্ন মণ্ডপে দুই প্লাটুন বিজিবি সদস্য টহল দিচ্ছে। এতে মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। খুলনা মহানগরীর রূপসা মহাশ্মশান মন্দিরের প্রধান গেট থেকে ১৮টি ককটেল উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এরপর থেকে খুলনার মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গাজীপুরের কাশিমপুর বাজার এলাকায় গতকাল সকাল ৭টার দিকে দুর্বৃত্তরা তিনটি মণ্ডপে হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে একটি মন্দিরে হামলার ঘটনায় পুলিশ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে মন্দিরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়। ওই ঘটনার পর সব মণ্ডপে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নোয়াখালীর হাতিয়া ও বেগমগঞ্জে হামলা ও ভাঙচুরের পর বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কুড়িগ্রামের উলিপুরে সাতটি মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অন্তত ১৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। কক্সবাজারের পেকুয়ায় মণ্ডপের বাইরে একটি তোরণ ভাঙার পর গোটা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে। দিনাজপুরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চট্টগ্রামজুড়ে ১০ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। এ ছাড়া পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরাও সতর্ক রয়েছেন।