বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১১তম ব্যাচের কর্মকর্তারা চলতি মাসেই সচিব পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন। প্রথমবারের মতো ১১তম ব্যাচের ২৩ জন এবং দশম ব্যাচের একজন অতিরিক্ত সচিবকে পদোন্নতির জন্য বিশেষ কর্মশালা আয়োজন করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজন কর্মকর্তার জন্য কর্মশালা আয়োজন করা হবে। বর্তমানে সচিবের পাঁচটি পদ শূন্য আছে, শিগগির আরও দুটি শূন্য হবে।
এদিকে, সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে কর্মকর্তারা কমপক্ষে দুই বছর সচিব পদে চাকরি করতে পারবেন তাদেরই পদোন্নতি দেওয়া হবে। সেই শর্ত শিথিল করে কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ কর্মকর্তা এক বছরের মধ্যে অবসরে যাবেন।
জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে আজ শুক্রবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ কর্মশালা চলবে। বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ সময় সচিব বা প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টিং কর্মকর্তার কার্যক্রম সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা করা হবে। একজন সচিবের কী কাজ সে বিষয়ে ধারণা দেওয়া হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে তাদের সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) রেক্টর মনজুর হোসেন বলেন, ২৪ অতিরিক্ত সচিবের কর্মশালা চলছে। তবে এ বিষয়ে বিপিএটিসি কিছুই জানে না। কারণ, এ কর্মশালা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আয়োজন করেছে। তারাই পরিচালনা করছে। আমরা শুধু থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সচিব জানিয়েছেন, প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে আগের তুলনায় কাজের পরিধি বেড়েছে অনেক। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন করতে হয় সচিবদের। সচিব পদে নিয়োগ পেয়ে তাই কোনো মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাজ বুঝতেই বছর চলে যায়। এরপর কাজ শুরু করতে না করতেই একজন সচিব অবসরে গেলে থমকে যায় উন্নয়নের গতি। এ জন্য যে কর্মকর্তারা কমপক্ষে দুই বছর সচিব পদে চাকরি করতে পারবেন তাদেরই পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ কারণে সচিব হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা বেশিরভাগ কর্মকর্তাই বাদ পড়ছেন। ফলে এ শর্ত শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সমকালকে বলেন, সরকার প্রত্যেকটা পদে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা করছে। যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে পদায়ন করা হচ্ছে। তাদের প্রশিক্ষণের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। পদোন্নতি দেওয়ার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
জানা যায়, দুই বছর চাকরি না থাকলে সচিব হওয়া যাবে না- দশম ব্যাচের কর্মকর্তাদের সচিব করার ক্ষেত্রে এ নিয়ম অনুসরণ করেছে এসএসবি। এরপর ১১তম ব্যাচের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা সচিব হওয়ার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে যোগাযোগ শুরু করেন। তারা এসএসবির সদস্য ও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে বিলম্বে পদোন্নতির জন্য তারা সচিব হওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছেন। এ জন্য তাদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ জানান। এরপর বিষয়টি আমলে নিয়ে তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাদশ ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, দুই বছর সময় থাকলে সচিব করা হয়, এটা কোনো লিখিত বিধান নেই। তবে বর্তমান এসএসবি এটা অনুসরণ করে। আর লিখিত নেই কারণ হচ্ছে, লিখিত থাকলে এটা চ্যালেঞ্জ হবে। আদালতে গেলে সবার পদোন্নতি আটকে যেতে পারে। এ কারণে এটা লিখিত রাখা হয়নি। এটা বিধিমালার পরিপন্থি।
এসএসবির একজন সদস্য বলেন, দুই বছরের কম সময় সচিব থাকলে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারেন না। কাজ বুঝে শুরু করতেই অবসরে চলে যান। তিনি মন্ত্রণালয়ের জন্য কোনো নতুনত্ব আনতে পারবেন না। চাকরির বয়স যাদের কমপক্ষে দু'বছর আছে তাদেরই সচিব করলে রাষ্ট্রের লাভ বেশি।
২০০২ সালের সচিব পদে পদোন্নতির বিধিমালায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত সচিব পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এক বছরের অভিজ্ঞ হওয়ার পর দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তার অবসরের বয়স হয়ে গেলে ওপরের শর্ত শিথিল করার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সচিবালয়ে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্ম সচিব পদে অনূ্যন দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে তার ক্ষেত্রে এ শর্ত শিথিল হবে। মূল্যায়নের ৮৫ শতাংশ নম্বর থাকতে হবে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে কর্মকর্তা সম্পর্কে জানেন তাকেই সাধারণত সচিব করা হয়। যার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর ধারণা নেই তাকে সচিব করা হয় না।
১১তম ব্যাচের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৯১ সালে। এরপর চাকরিতে যোগদান করেন ১৯৯৩ সালের এপ্রিলে। এ ব্যাচের মোট কর্মকর্তা ২২২ জন। ১০ বছর পর ২০০৩ সালে উপসচিব পদে পদোন্নতি পাওয়ার কথা থাকলেও পদোন্নতি পেয়েছেন ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর। যুগ্ম সচিব হন ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর। অতিরিক্ত সচিব হন ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর।